ভারতের উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে বর্ণবাদী হামলার শিকার হয়ে ত্রিপুরার এক ছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। গত ৯ ডিসেম্বর অঞ্জল চাকমা ও মাইকেল চাকমা নামে দুই ভাই স্থানীয় একটি বাজারে গেলে একদল ব্যক্তি তাদের ওপর জাতিগত বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করে হামলা চালায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে দীর্ঘ ১৭ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর অঞ্জল চাকমা মারা যান। এই ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করলেও এটিকে বর্ণবাদী হামলা হিসেবে মানতে নারাজ প্রশাসন, যা নিহতের পরিবার ও অধিকার রক্ষা কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ভারতের বড় শহরগুলোতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে আসা মানুষের নিরাপত্তার সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের খোঁজে দিল্লি, ব্যাঙ্গালুরু বা পুনের মতো শহরে যাওয়া এই অঞ্চলের মানুষজন প্রতিনিয়ত তাদের শারীরিক গড়ন ও খাদ্যাভ্যাসের কারণে বর্ণবাদী বৈষম্যের শিকার হন। আবাসন ভাড়া নেওয়া থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র—সবখানেই তাদের নানা প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে হয়। অঞ্জল চাকমার মৃত্যুর প্রতিবাদে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে এবং এই ধরনের ঘৃণা ছড়ানো অপরাধ মোকাবিলায় একটি বিশেষ আইন প্রণয়নের দাবি জোরালো হচ্ছে।
২০১৪ সালে দিল্লিতে নিডো তানিয়া নামে অরুণাচল প্রদেশের এক ছাত্রের মৃত্যুর পর একই ধরনের প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। তখন একটি সরকারি কমিটি বর্ণবাদ দমনে নির্দিষ্ট কঠোর আইন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার সুপারিশ করলেও গত এক দশকে তার খুব একটা বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। এনসিআরবি বা জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মানুষের ওপর ঘটা অপরাধের জন্য আলাদা কোনো পরিসংখ্যান রাখা হয় না। তবে মানবাধিকার কর্মীদের মতে, গত এক দশকে এমন কয়েক ডজন বড় ঘটনা ঘটেছে যা জনসমক্ষে আসেনি।
বর্তমানে দেরাদুনের এই ঘটনার পর নিহত অঞ্জল চাকমার বাবা তরুণ চাকমা তার ছোট ছেলের শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে বর্ণবাদী আচরণকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে একে সামাজিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে বিচার করা জরুরি। তা না হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় শহরে আসা শিক্ষার্থীদের ট্রমা ও নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়বে।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ এই বর্ণবাদ বা জাতিগত বিদ্বেষ একটি গভীরতর সংকট। উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে মূলধারার অনেক মানুষ আজও সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। আইনি সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। একটি নির্দিষ্ট অ্যান্টি-রেসিজম আইন থাকলে আক্রান্ত ব্যক্তিরা আইনি সহায়তা পেতে আরও সাহসী হতেন এবং অপরাধীরা জবাবদিহিতার আওতায় আসত। দেরাদুনের ঘটনাটি কেবল একটি হত্যা মামলা নয়, এটি ভারতের জাতীয় সংহতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।