তুরস্ক এবং এই অঞ্চলের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের সমীকরণটি বর্তমানে এক নতুন মোড় নিয়েছে। আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্র এবং তার পূর্বসূরি অটোমান সাম্রাজ্য—উভয়ই দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারে দীর্ঘকাল ধরে আগ্রহী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঙ্কারার এই তৎপরতা পুনরায় দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তুরস্ক ঐতিহাসিকভাবে নিজেকে এই অঞ্চলের মুসলিম স্বার্থের অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করে আসছে, আর দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রগুলোও বিভিন্ন যুগে তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সন্ধান করেছে।
গত এক বছরে ভারত ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে তুরস্কের ভূমিকার বেশ কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ভারতীয় গোয়েন্দারা ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লাল কেল্লায় হওয়া একটি বিস্ফোরণে তুরস্কের যোগসূত্রের সম্ভাবনা নিয়ে তদন্ত করছেন। অন্যদিকে তুরস্ক, পাকিস্তান ও আজারবাইজান মিলে ‘থ্রি ব্রাদার্স’ নামক একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলেছে। মে ২০২৫-এ ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় তুরস্ক পাকিস্তানকে সামরিক সরঞ্জাম ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে বলে জানা যায়।
তুরস্কের সাথে দক্ষিণ এশিয়ার এই গভীর সম্পর্কের মূলে রয়েছে গত পাঁচশ বছরের আদর্শিক এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। প্রাচীনকালে ভারতের সাথে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সরাসরি বাণিজ্য থাকলেও আরব বিজয়ের পর সেই পথে ছেদ পড়ে। পরবর্তীতে আনাতোলিয়া তুর্কিদের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং অটোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মধ্য এশিয়া থেকে আসা তুর্কিরা দীর্ঘকাল দক্ষিণ এশিয়া শাসন করেছে এবং দিল্লির সুলতানাত ও মুঘল সাম্রাজ্যও তুর্কি বংশোদ্ভূত ছিল।
ষোড়শ শতাব্দীতে অটোমান সাম্রাজ্যের বিস্তারের সময় তাদের প্রধান শত্রু ছিল ইরানের শিয়া সফাভি সাম্রাজ্য এবং উদীয়মান পর্তুগিজ শক্তি। তখন অটোমান সুলতান নিজেকে খলিফা হিসেবে দাবি করে মধ্য এশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। সেই লক্ষ্যে তারা গুজরাট সুলতানাতকে পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে সহায়তা করেন। এমনকি মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় বাবরকে কামান ও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিলেন সুলতান প্রথম সেলিম।
আঠারো শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতীয় মুসলিম রাষ্ট্রগুলো সুরক্ষার জন্য অটোমান খিলাফতের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯১৯ থেকে ১৯২২ সালের খিলাফত আন্দোলন ছিল তুরস্কের সুলতানের প্রতি ভারতীয় মুসলমানদের সমর্থনের এক বড় দৃষ্টান্ত। এমনকি ১৯৩১ সালে হায়দ্রাবাদের নিজাম তার নাতিদের পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করার জন্য অটোমান সুলতানের কাছ থেকে একটি দলিলও সংগ্রহ করেছিলেন, যদিও ১৯৪৮ সালে হায়দ্রাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি।
বর্তমানে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্ক একটি ‘নব্য-অটোমান’ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছে। এরদোয়ান অটোমান ও মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখেন এবং সেই গৌরব পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট। এই আদর্শিক মিল পাকিস্তান ও তুরস্ককে আরও কাছাকাছি এনেছে। পাকিস্তানে বর্তমানে তুর্কি সংস্কৃতি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং দেশটির মানুষ তুরস্ককে একটি রোল মডেল হিসেবে দেখে।
তুরস্কের এই আগ্রহের পেছনে দুটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে সংযোগ তুরস্কের বিশ্বজনীন ইমেজ বা মর্যাদা বৃদ্ধি করে। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের সাথে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক তুরস্ককে তাদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ করে দেয় এবং এই অঞ্চলে আরব দেশগুলোর প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করে। পাশাপাশি এটি তুরস্কের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইরানকে চাপে রাখার একটি কৌশলও বটে। ভারতের সাথে তুরস্কের বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুব একটা জোরালো নয় এবং কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের প্রতি তুর্কি সমর্থন ভারতের সাথে তাদের এক ধরনের টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে।
ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও ধর্ম এবং ভূ-রাজনীতির টানে তুরস্ক বারবার দক্ষিণ এশিয়ায় ফিরে এসেছে। ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজ ও পারস্য বিরোধী লড়াই থেকে শুরু করে বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—সব ক্ষেত্রেই তুরস্কের ভূমিকা অপরিবর্তিত। মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তুরস্কের এই সক্রিয় অবস্থান আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।