এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৪৪ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

তুষারঝড়ের কবলে নিউইয়র্ক: স্থবির হওয়ার পথে ট্রাই-স্টেট

তুষারঝড়ের কবলে নিউইয়র্ক: স্থবির হওয়ার পথে ট্রাই-স্টেট

আমেরিকার পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের জনপদগুলোতে এখন এক অজানা আতঙ্ক আর প্রস্তুতির ব্যস্ততা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় স্টেট নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি এবং কানেকটিকাট—যাকে ভৌগোলিক ও প্রশাসনিকভাবে ট্রাই-স্টেট এলাকা বলা হয়, সেখানে আছড়ে পড়তে যাচ্ছে বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এক তুষারঝড়। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ঝড়ে নিউইয়র্ক সিটির ওপর ১৬ ইঞ্চি পর্যন্ত তুষারের আস্তরণ জমতে পারে। একই সাথে উত্তর মেরু থেকে ধেয়ে আসা হাড়কাঁপানো বাতাস বা পোলার ভটেক্সের প্রভাবে জনজীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জাতীয় আবহাওয়া বিভাগ বা এনডব্লিউএস তাদের সর্বশেষ বুলেটিনে জানিয়েছে, শনিবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া এই তুষারপাত সোমবার পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। আবহাওয়া মানচিত্র পর্যবেক্ষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই অঞ্চলে তুষারের যে স্তূপ দেখা যাবে, তা ২০২১ সালের ঐতিহাসিক তুষারঝড়কেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যেই পুরো ট্রাই-স্টেট এলাকায় উইন্টার স্টর্ম ওয়ার্নিং বা তুষারঝড়ের সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ মাইক উডস এই পরিস্থিতিকে বেশ জটিল বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, শনিবার মধ্যরাত অর্থাৎ রাত ১টার পর থেকে আকাশ থেকে সাদা তুলোর মতো বরফ ঝরতে শুরু করবে। রবিবার ভোরের মধ্যে নিউইয়র্ক সিটির রাস্তায় অন্তত ১ থেকে ৩ ইঞ্চি বরফ জমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি কেবল শুরু মাত্র। ঝড়ের আসল তাণ্ডব দেখা যাবে রবিবার দুপুর থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে তুষারপাতের গতিবেগ এতটাই বৃদ্ধি পাবে যে প্রতি ঘণ্টায় ১ থেকে ২ ইঞ্চি করে নতুন বরফ জমা হবে। এতে রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা প্রশাসনের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

পরিসংখ্যান বলছে, এই তুষারঝড়টি অন্তত ৮৫ শতাংশ নিশ্চিতভাবে ৬ ইঞ্চির বেশি তুষারপাত ঘটাবে। এমনকি ১২ ইঞ্চির বেশি তুষারপাত হওয়ার সম্ভাবনাও প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। আবহাওয়া দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, যদি ঝড়ের গতিপথ সামান্য উত্তরে সরে আসে তবে উপকূলে বরফের সাথে বৃষ্টির সংমিশ্রণ বা উইন্ট্রি মিক্স দেখা দিতে পারে। কিন্তু ঝড়ের মূল কেন্দ্র যদি বর্তমান গতিপথ ধরে এগোয়, তবে নিউইয়র্কবাসী এক ভয়াবহ তুষার-দানবের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো তীব্র বাতাস এবং হিমাঙ্কের অনেক নিচে নেমে যাওয়া তাপমাত্রা। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন যে, উত্তর মেরুর বায়ুপ্রবাহ বা পোলার ভটেক্সের প্রভাবে তাপমাত্রা ১১ ডিগ্রি ফারেনহাইটে নেমে আসবে। বাতাসের ঝাপটার কারণে খোলা জায়গায় এই শীত অনুভূত হবে মাইনাস ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মতো। এমন পরিস্থিতিতে ফ্রস্টবাইট বা শরীরের চামড়া জমে যাওয়ার ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

নিউইয়র্ক সিটির প্রশাসন ও আবহাওয়া দপ্তরের পক্ষ থেকে বাসিন্দাদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। জরুরি অবস্থা বা স্টেট অফ ইমার্জেন্সি ঘোষণার মাধ্যমে গভর্নর ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জনগণকে ঘরে থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন। বিশেষ করে রবিবার এবং সোমবার অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের না হতে কঠোরভাবে বলা হয়েছে। তুষারঝড়ের কারণে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ার ফলে মহাসড়কগুলোতে গাড়ি চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে পড়বে। ট্র্যাফিক পুলিশ ও যোগাযোগ দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, তুষারের স্তূপের কারণে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে মহাবিপদ। নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি, লাগার্ডিয়া এবং নিউ জার্সি রাজ্যের নেওয়ার্ক বিমানবন্দর থেকে ইতোমধ্যে শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের সতর্ক করে জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিমানের সময়সূচী ঠিক হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। হাজার হাজার যাত্রী বিমানবন্দরে আটকা পড়ার উপক্রম হয়েছে। অন্যদিকে, ট্রেন ও বাসের মতো গণপরিবহনগুলোও সীমিত পরিসরে চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের প্রস্তুতির কোনো কমতি নেই। সুপারমার্কেটগুলোতে গত দুই দিন ধরে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। রুটি, দুধ, ডিম এবং পানীয় জলের সেলফগুলো দ্রুত খালি হয়ে যাচ্ছে। মানুষ অন্তত এক সপ্তাহের রসদ মজুদ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কারণ তুষারঝড়ের ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিলে এবং রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে। ভারি তুষারের চাপে গাছের ডাল ভেঙে বিদ্যুৎ লাইনের ওপর পড়লে হাজার হাজার ঘরবাড়ি অন্ধকারচ্ছন্ন হয়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও একটি বিষয়ে সতর্ক করেছেন, আর তা হলো জমে যাওয়া পানির পাইপ। তীব্র শীতের কারণে অনেক পুরনো ভবনের জলের পাইপ ফেটে যেতে পারে, যা বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণ হবে। বাড়িওয়ালা ও বাসিন্দাদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যেন তারা কলের মুখ সামান্য খুলে রাখেন এবং ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা পর্যাপ্ত পর্যায়ে ধরে রাখেন।

শহরের স্কুলগুলো বন্ধ রাখার ব্যাপারেও আলোচনা চলছে। যদিও বর্তমানে রিমোট লার্নিং বা অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা রয়েছে, তবুও ইন্টারনেটে গোলযোগ বা বিদ্যুৎ না থাকার আশঙ্কায় স্কুল পুরোপুরি ছুটি দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সোমবার সকালে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে সিটি কর্তৃপক্ষ।

আবহাওয়াবিদরা এখন তীক্ষ্ণ নজরে রাখছেন পোলার ভটেক্সের গতিবিধির ওপর। এটি হলো সুমেরু অঞ্চলের একটি অত্যন্ত শীতল নিম্নচাপ অঞ্চল। সাধারণত এটি উত্তর মেরুতেই সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু মাঝে মাঝে এর বলয় দুর্বল হয়ে গেলে শীতল বাতাস দক্ষিণের জনবসতির দিকে নেমে আসে। এবারের ঝড়ের পেছনে এই পোলার ভটেক্সের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যার ফলে সোমবার তুষারপাত কমে গেলেও হাড়কাঁপানো এই শৈত্যপ্রবাহ আগামী সপ্তাহের বুধবার বা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বজায় থাকবে।

এতসব বিপদের মাঝেও আবহাওয়া দপ্তর কিছুটা অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছে। ঝড়ের ট্র্যাক বা গতিপথ যদি সামান্য দক্ষিণে সরে যায়, তবে তুষারপাতের পরিমাণ কিছুটা কমে যেতে পারে। কিন্তু প্রশাসন কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। কারণ আমেরিকার ইতিহাসে দেখা গেছে, ছোট কোনো বিচ্যুতিও অনেক সময় বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শেষ পর্যন্ত এই তুষারঝড় নিউইয়র্কবাসীকে কতটুকু ভোগান্তিতে ফেলবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত চারদিকে কেবল বরফ সরানোর কোদাল, লবন ছিটানোর গাড়ি আর ঘরবন্দী মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষা। তুষার শুভ্র এই শহরটি কি তার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পাবে দ্রুত, নাকি বরফের সাদা চাদরের নিচে ঢাকা পড়ে থাকবে কয়েক দিন—সেই উত্তর খুঁজছে এখন কয়েক কোটি মানুষ। পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে প্রশাসন এবং প্রতি মুহূর্তের আপডেট প্রচার করা হচ্ছে বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে।