সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গন এক চরম অস্থিরতা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, যার মূলে রয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা একটি আপত্তিকর ভিডিও ক্লিপ। এই ভিডিওটিতে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাকে অত্যন্ত অবমাননাকর ও বর্ণবাদী আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়েছে। যদিও প্রতিবাদের মুখে ভিডিওটি মুছে ফেলা হয়েছে, কিন্তু এই ঘটনাটি মার্কিন সমাজে বিদ্যমান গভীর বর্ণবাদী ক্ষতকে নতুন করে প্রকাশ্যে এনেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল একটি সাধারণ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট নয়, বরং দীর্ঘদিনের একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক কৌশলের অংশ, যেখানে নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অমানবিক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, কৃষ্ণাঙ্গদের প্রাণীর সাথে তুলনা করার এই প্রবণতা কয়েক শতাব্দী পুরনো, যা মূলত দাসপ্রথা এবং বর্ণবৈষম্যকে বৈধতা দিতে ব্যবহার করা হতো। এই আধুনিক যুগে এসে দেশের সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন ব্যক্তির কাছ থেকে এমন আচরণ কেবল দুঃখজনকই নয়, বরং গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ভিডিও শেয়ার করার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ছিল আরও অদ্ভুত। তিনি সরাসরি ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেছেন এবং দায়ভার এড়িয়ে গিয়েছেন এই বলে যে, তিনি ভিডিওটির পুরো অংশ দেখেননি। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় তিনি দাবি করেন, তিনি কেবল ভিডিওর প্রথম অংশ দেখেছিলেন যা জর্জিয়ার ভোটার জালিয়াতি সংক্রান্ত ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই অজুহাতকে মানতে নারাজ। তাদের মতে, যখন একজন জননেতা কোনো বিষয় তার লক্ষ লক্ষ অনুসারীর সামনে তুলে ধরেন, তখন তার বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবগত থাকা বাধ্যতামূলক। ট্রাম্পের এই আচরণটি তার দীর্ঘদিনের ‘ডিফ্লেকশন’ বা দায় এড়ানোর কৌশলের সাথে মিলে যায়। হোয়াইট হাউসের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াও ছিল উদ্ধত। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বিষয়টিকে কেবল একটি ‘ইন্টারনেট মিম’ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকেই যখন তীব্র সমালোচনা আসতে শুরু করে, তখন প্রশাসনের সুর কিছুটা নরম হতে দেখা যায়। সিনেটর টিম স্কট থেকে শুরু করে মাইক ললার এবং মাইকেল টার্নারের মতো জ্যেষ্ঠ নেতারা এই চিত্রায়নকে সরাসরি ‘বর্ণবাদী’ এবং ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, বর্ণবাদের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে দলের অভ্যন্তরেও একটি নৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই পুরো পরিস্থিতির গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অবমাননাকর চিত্র ব্যবহার করার উদ্দেশ্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। কুয়েন্টিন জেমসের মতো সমাজকর্মীরা একে ‘ডিজিটাল মিনস্ট্রেল শো’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। উনিশ শতকে যেভাবে কৃষ্ণাঙ্গদের বিদ্রূপ করতে মঞ্চ নাটক সাজানো হতো, আজ এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সেই একই কাজ করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ডগলাস ব্রিংকলির মতো ইতিহাসবিদদের মতে, এটি কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে অমানবিক করার একটি পুরনো পদ্ধতি, যা চরমপন্থী গোষ্ঠীকে উসকে দিতে সাহায্য করে। ওবামা দম্পতির বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এই আক্রমণ অবশ্য নতুন কিছু নয়। ২০১১ সালের সেই ‘বার্থার’ বিতর্ক থেকে শুরু করে ওবামার গ্রেফতারের ভুয়া এআই ভিডিও শেয়ার করা পর্যন্ত ট্রাম্প ক্রমাগত ওবামাকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন। মিশেল ওবামা ২০২৪ সালের ডেমোক্রেটিক কনভেনশনে সঠিকভাবেই বলেছিলেন যে, ট্রাম্পের এই ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ বিশ্বদর্শন সফল ও শিক্ষিত কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের প্রতি এক ধরনের ভীতি থেকে জন্ম নেয়। এই ভীতি থেকেই তিনি রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে বর্ণবাদী মিথ্যাচারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।
বর্তমানে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার রাজনৈতিক প্রচারণাকে এক বিপজ্জনক স্তরে নিয়ে গেছে। ট্রাম্পের ফিড এখন নীতি বা আদর্শের চেয়ে বেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি মিম এবং ডিপফেক ভিডিওতে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। যখন হাইতিয়ান বা মেক্সিকান অভিবাসীদের নিয়ে আপত্তিকর মিম তৈরি করা হয় কিংবা হাশিম জেফরিসের মতো নেতাদের সোমব্রেরো টুপি পরিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়, তখন তা কেবল কৌতুক হিসেবে থাকে না; বরং তা একটি নির্দিষ্ট জাতি বা বর্ণের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়। এই ধরনের কন্টেন্ট যখন মূলধারার রাজনীতিতে জায়গা পায়, তখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আরও বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। রিপাবলিকান স্ট্র্যাটেজিস্ট ডগ হেয়ে মনে করেন, এবার রিপাবলিকান নেতাদের কঠোর অবস্থান নেওয়ার মূল কারণ হলো আসন্ন নির্বাচন। তারা বুঝতে পারছেন যে, এই ধরনের চরম বর্ণবাদী অবস্থান সাধারণ ভোটারদের বিশেষ করে তরুণ ও সংখ্যালঘু ভোটারদের দল থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
পরিশেষে, এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির চরম উন্নতির যুগেও মানুষের আদিম সংকীর্ণ মানসিকতা এখনো রয়ে গেছে। একটি ভিডিও মুছে ফেলা হয়তো সহজ, কিন্তু তার মাধ্যমে যে ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তা সমাজ থেকে মুছে ফেলা অনেক কঠিন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই কৌশল—প্রথমে আগ্রাসন, পরে দায় অস্বীকার এবং শেষে বিষয়টিকে মিম বলে হালকা করা—আসলে গণতন্ত্রের স্তম্ভগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বারাক ওবামা এবং মিশেল ওবামার মতো ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে এই ধরনের নগ্ন আক্রমণ কেবল তাদের ব্যক্তিগত অপমান নয়, বরং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর আঘাত। যদি রাজনৈতিক নেতারা দায়িত্বশীলতার পরিচয় না দেন এবং বর্ণবাদের এই বিষবৃক্ষ উপড়ে না ফেলেন, তবে সামাজিক সংহতি চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আগামীর রাজনীতিতে ব্যক্তিগত কুৎসা এবং বর্ণবাদী ট্রোপের পরিবর্তে প্রকৃত আদর্শ ও সমাধানের লড়াই হওয়া উচিত, অন্যথায় ডিজিটাল বিপ্লব কেবল বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবেই ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।