এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ১৬ নভেম্বার ২০২৫, ০৫:১১ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ট্রাম্প নীতি নিয়ে অস্থিরতা—অনিশ্চয়তায় নাগরিকত্বপ্রাপ্ত মার্কিনরা

ট্রাম্প নীতি নিয়ে অস্থিরতা—অনিশ্চয়তায় নাগরিকত্বপ্রাপ্ত মার্কিনরা

সিয়েরা লিওনের গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে দেশ ছাড়ার পর প্রায় এক দশক শরণার্থী শিবিরে কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছিলেন দাউদা সিসে। তখন তিনি জানতেনই না যে একসময় মার্কিন নাগরিকও হতে পারেন। পরে তাকে জানানো হয়—নিয়ম মেনে চললে এবং কোনো জটিলতায় না পড়লে কয়েক বছর পর নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যাবে। নাগরিক হলে মিলবে সুরক্ষা ও অধিকার।

এই ধারণাই তাকে আবেদন করতে উৎসাহিত করে। সিসের কাছে নাগরিকত্ব মানে ছিল—দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত হওয়া।

 “যেদিন শপথ নিলাম, সেদিনই অনুভব করেছিলাম যে আমি এ দেশের অংশ হয়ে গেলাম,” বলেন ৪৮ বছর বয়সী সিসে, যিনি ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে শরণার্থীদের অধিকার ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের অভিবাসন নীতি বদলের প্রবল ঝড়ে নাগরিকত্বপ্রাপ্ত মার্কিন অনেকের সেই নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসও নড়ে গেছে। কঠোর দেশছাড়া অভিযান, নাগরিকত্ব নীতি পুনর্গঠন এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার বিতর্ক—সব মিলিয়ে তাদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন ভাসছে—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই তাদের নিজের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করছে?

অনেকেই আশঙ্কায় রয়েছেন—দেশের বাইরে গেলে ফিরে আসার সময় অসুবিধায় পড়তে হতে পারে। সীমান্তে জিজ্ঞাসাবাদ বা আটক হওয়ার ঘটনাও কয়েকজন নাগরিকত্বপ্রাপ্ত মার্কিনের মনে ভীতি বাড়িয়েছে। অনেকে এখন অভ্যন্তরীণ ভ্রমণেও পাসপোর্ট সঙ্গে রাখছেন। এমনকি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় ফোনেও বাড়তি সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করছেন।

ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত অভিযানেও দেখা গেছে, ভুলবশত মার্কিন নাগরিকদের আটকের মতো ঘটনা ঘটেছে। কিছু নাগরিক মামলা করতেও বাধ্য হয়েছেন। পরিস্থিতি আরও উত্তেজিত হয় যখন বিচার বিভাগ ঘোষণা দেয়—অপরাধে জড়িত বা নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচিত অভিবাসীদের নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া জোরদার করা হবে। একই সময় নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানীর নাগরিকত্ব নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্যও উদ্বেগ বাড়ায়।

এমন পরিবেশে অনেক নাগরিকত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রকাশ্যে মত দিতে ভয় পাচ্ছেন। নানা সংগঠনের মাধ্যমে চেষ্টা করেও প্রায় কেউই মন্তব্যে রাজি হননি—শুধু দাউদা সিসে ব্যতিক্রম।

নিউ মেক্সিকোর সিনেটর সিন্ডি নাভা বলেন, দীর্ঘ সময় অনথিভুক্ত থাকার ভয় তিনি নিজে বুঝতে পারেন, কিন্তু এখন তিনি দেখছেন—যারা নাগরিকত্ব পেয়েছেন তারাও অনিশ্চয়তায় আক্রান্ত।

 “যারা আগে কখনো ভয় পেতেন না, তারাই এখন নিজেদের অবস্থান নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ছেন,” বলেন নাভা।

ইতিহাসবিদ স্টিফেন ক্যান্ট্রোভিৎস জানান, যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্বের ধারণা সব সময় স্পষ্ট ছিল না—সময়ের সঙ্গে তা বদলেছে। সংবিধানে শব্দটি থাকলেও সংজ্ঞা নেই। শুরুতে নাগরিকত্ব শুধু ‘উত্তম চরিত্রসম্পন্ন শ্বেতাঙ্গদের’ জন্যই ছিল। পরে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এশীয়দের নাগরিকত্বের পথে আইনগত বাধা ছিল। ১৯৬৫ সালের আইন তা বাতিল করে।

ইতিহাসে এমন সময়ও এসেছে যখন বৈধ নাগরিকত্বও কেড়ে নেওয়া হয়েছে—যেমন ১৯২৩ সালের ভগত সিং ঠিনদ মামলার পর বহু এশীয়কে নাগরিকত্ব হারাতে হয়। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের আটক শিবিরে পাঠানো হয়েছিল।

দাউদা সিসের ভাষায়, বর্তমান বাস্তবতা যেন এক ধরনের বিশ্বাস ভাঙার মতো।

 “আমি এই দেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছি। এখন নিজের দেশেই যে পরিবর্তন দেখছি, তা কষ্ট দেয়। এটা সেই আমেরিকা নয়, যাকে আমি আমার দেশ বলে গ্রহণ করেছিলাম।”