যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির বহুল আলোচিত চরিত্র মের্জোরি টেলর গ্রিন ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করবেন। জর্জিয়ার অতি-ডানপন্থী এই রিপাবলিকান নেত্রীর সিদ্ধান্ত শুধু তাঁর রাজনৈতিক পথচলার একটি অপ্রত্যাশিত সমাপ্তিই নয়—এটি রিপাবলিকান পার্টি ও ট্রাম্প–মিত্র জোটের ভেতরের গভীর বিভাজনকেও স্পষ্ট করে তুলেছে।
গ্রিনের এই ঘোষণা আসে এমন সময়ে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাঁকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যায়িত করেন। কারণ, গ্রিন সম্প্রতি ট্রাম্পের অবস্থানের বিরোধিতা করে জেফরি এপস্টিন–সংক্রান্ত নথি প্রকাশে ন্যায় বিভাগকে চাপ দিতে সহায়তা করেছিলেন—যা নিয়ে ট্রাম্প আগেই প্রকাশ্যে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন।
ট্রাম্প থেকে দূরত্ব, গ্রিনের রাজনৈতিক রূপান্তর
২০২০ সালে কংগ্রেসে নির্বাচিত হওয়ার পর গ্রিন নিজেকে ট্রাম্প রাজনীতির অন্যতম আক্রমণাত্মক কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে গত কয়েক মাস ধরে তাঁর অবস্থান নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। গাজা যুদ্ধ, ইরান–ইউক্রেন নীতি, এআই নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যব্যয়—সবই তাঁকে ধীরে ধীরে ট্রাম্পের বিপরীত দিকে ঠেলে দেয়।
ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমালোচনা শুরুর পর থেকেই গ্রিনকে দেখা যাচ্ছে এমন সব অপ্রত্যাশিত পরিসরে—যেখানে তিনি আগে কখনও আমন্ত্রিত হতেন না। তিনি অংশ নিয়েছেন ‘দ্য ভিউ’-এর মতো টকশোতে এবং নিয়মিত মুখ হিসেবে হাজির হচ্ছেন সেই সিএনএনে, যাকে একসময় তিনি “ভুয়া সংবাদমাধ্যম” বলে আক্রমণ করতেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নিজের ভূমিকা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তিনি নিজেও বিভাজন সৃষ্টিতে অংশ নিয়েছিলেন।
চাপ, হুমকি ও রাজনৈতিক একাকীত্ব
গ্রিন জানিয়েছেন, কংগ্রেসে তাঁর সময়টা কেটেছে অবিরাম আক্রমণ, আইনি ঝামেলা, প্রাণনাশের হুমকি ও অবমাননাকর প্রচারণার মধ্য দিয়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। তিনি লেখেন, “ম্যাগা ইনক যদি আমাকে ছুঁড়ে ফেলে, তবে এর অর্থ সাধারণ আমেরিকানদেরও একপাশে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
গ্রিনের ভাষায়, ট্রাম্প তাঁকে নিজ দলের ভেতরেই “ক্ষতিকর ও অপমানজনক” প্রাইমারি লড়াইয়ে ঠেলে দিচ্ছিলেন—যে লড়াই জিতলেও তিনি মনে করেন রিপাবলিকানরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। তাই সে পথ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত তাঁর কাছে ছিল “আত্মরক্ষামূলক এবং প্রয়োজনীয়”।
রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর সরাসরি প্রভাব
গ্রিনের প্রস্থান রিপাবলিকানদের ঝুঁকিপূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে আরও নড়বড়ে করবে। যদিও তাঁর আসনটি গভীর রিপাবলিকান এলাকা, নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দলের সদস্য সংখ্যা নেমে যাবে ২১৮-এ, যা আইন পাসে রিপাবলিকানদের জন্য বাড়তি চাপে পরিণত হবে।
রিপাবলিকান স্পিকার মাইক জনসন এই ঘোষণায় প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রিনকে একদিকে অস্বস্তিকর মনে করলেও অন্যদিকে তাঁর কণ্ঠস্বর ও সামাজিকমাধ্যমের প্রভাব উপেক্ষা করা কঠিন।
গ্রিন–ট্রাম্প সংঘাতের কেন্দ্র: এপস্টিন নথি
গ্রিনের রাজনৈতিক বিপর্যয় কেন্দ্রবিন্দুতে আসে, যখন তিনি এপস্টিন ফাইল উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান। গ্রিন দাবি করেন, বিষয়টি এলিট শ্রেণির অন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত, আর সাধারণ নারী ও শিশুদের ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তিনি সমঝোতা করবেন না।
হাউসের ডেমোক্র্যাটিক দলের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি যখন বক্তৃতা দেন, তা ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, “আমেরিকানদের দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা হয়েছে। তারা এখন পরিবর্তন চায়।”
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া: সম্পর্কের একদম শেষ বিন্দু
অল্প কিছুদিন আগে ট্রাম্প লেখেন, “মার্জোরি এখন শুধু অভিযোগ করে, করে, করে!” যা ছিল তাঁদের রাজনৈতিক সম্পর্কের চূড়ান্ত ভাঙনের সংকেত। আর পদত্যাগ ঘোষণার পর ট্রাম্প মন্তব্য করেন—এটি নাকি “দেশের জন্য সুসংবাদ।”
গ্রিনের পরবর্তী অধ্যায় কী?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেস ছাড়লেও গ্রিনের প্রভাব শেষ হবে না। সাবেক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা স্টিভ ব্যানন বলেন, “হাউস তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা সামলাতে পারে না। আমরা গ্রিনের শেষ দেখিনি।”
যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী রাজনীতিতে গ্রিন এমন এক চরিত্র, যিনি আক্ষরিক অর্থে নিজস্ব রাজনৈতিক ধাঁচ তৈরি করেছেন—যেখানে জনপ্রিয়তা, সামাজিকমাধ্যম, ও প্রান্তিকীকরণের গল্প একত্রে মিশে আছে। তাঁর পদত্যাগ শুধু একটি রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের মোড়ফেরানো মুহূর্তই নয়—এটি ম্যাগা আন্দোলনের ভেতরকার মতপার্থক্যের বিস্তারও তুলে ধরা এক গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। আগামী দিনে এই সংঘাত রিপাবলিকান রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।