বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ঘোষিত বোর্ড অব পিস উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। এই প্রেক্ষাপটে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা কঠোর সমালোচনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের। লুলার মতে, ট্রাম্প বিদ্যমান জাতিসংঘকে সংস্কার করার বদলে নিজের একক মালিকানাধীন একটি নতুন জাতিসংঘ তৈরি করতে চাইছেন।
লুলার আক্রমণাত্মক বক্তব্য
শুক্রবার ব্রাজিলের রিও গ্রান্দে দো সুল অঞ্চলে এক জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় লুলা দা সিলভা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘকে মেরামত করার কোনো সদিচ্ছা ট্রাম্পের নেই। বরং তিনি এমন একটি সমান্তরাল বিশ্ব সংস্থা গড়তে চাইছেন যার একচ্ছত্র মালিক হবেন তিনি নিজেই। লুলা বিদ্রুপ করে বলেন, ট্রাম্প এখন টুইটারের মাধ্যমে পুরো বিশ্ব চালাতে চান। এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর যে তিনি প্রতিদিন কিছু একটা বলেন আর পুরো বিশ্বকে তা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়।
লুলার এই বক্তব্যের আগে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে টেলিফোনে কথা বলেন। দুই নেতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় ভূমিকা বজায় রাখার ব্যাপারে একমত হন। লুলা সতর্ক করে দেন যে বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জঙ্গল আইন বা যার জোর তার মুলুক নীতি কায়েম হচ্ছে এবং জাতিসংঘের সনদ ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে।
বোর্ড অব পিস বনাম জাতিসংঘ
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে এই বোর্ড অব পিস বা শান্তি বোর্ডের উদ্বোধন করেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে প্রথমে বলা হয়েছিল, এই বোর্ড গাজা পুনর্গঠন তদারকি করবে। কিন্তু বোর্ডের ১১ পৃষ্ঠার যে সনদ প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে গাজার কোনো উল্লেখ নেই। এটি ইঙ্গিত দেয় যে ট্রাম্পের এই উদ্যোগের পরিধি আরও ব্যাপক এবং এটি বিশ্ব সংস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর একটি মাধ্যম হতে পারে।
বোর্ড অব পিসের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। উল্লেখ্য যে, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে এবং গাজায় ইসরায়েলি হামলায় জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা আনরোয়ার ৩০০ জনেরও বেশি কর্মী নিহত হয়েছেন।
আর্থিক কাঠামোর বৈষম্য
জাতিসংঘ বর্তমানে মারাত্মক অর্থ সংকটে ভুগছে। বিশ্ব সংস্থাটির বার্ষিক নিয়মিত বাজেট প্রায় ৩.৭২ বিলিয়ন ডলার, যেখানে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়ার কথা ছিল ৮২০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এই বকেয়া পরিশোধে অনীহা দেখাচ্ছে। উল্টো দিকে, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বোর্ড অব পিসের সদস্য হতে হলে দেশগুলোকে তিন বছর পর ১ বিলিয়ন ডলার করে ফি দিতে হবে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে ট্রাম্প একটি ব্যয়বহুল এবং নির্দিষ্ট দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা সমান্তরাল ব্যবস্থা গড়তে চাইছেন।
মার্কিন আধিপত্য ও মিত্রদের সন্দেহ
ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতি এবং বিভিন্ন দেশ থেকে শুল্ক ও সামরিক হুমকির কারণে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের মিত্ররাও এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে জাতিসংঘের কয়েক ডজন সংস্থা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। লুলা মনে করেন, এটি বহুপাক্ষিক বিশ্ব ব্যবস্থার জন্য এক বড় হুমকি।
বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্প যদি সফলভাবে এই বোর্ড অব পিস পরিচালনা করতে পারেন, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব কাঠামো ভেঙে পড়বে। জাতিসংঘ যেভাবে মানবিক সহায়তা এবং মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করে, ট্রাম্পের এই বাণিজ্যিক ও সামরিক ভিত্তিক বোর্ড তা করবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো যখন মানবিক সহায়তা কমিয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে, তখন জাতিসংঘের মতো সংস্থার অস্তিত্ব সংকটে পড়া বিশ্ব শান্তির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
ব্রাজিল ও চীনসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো এখন এই মার্কিন একাধিপত্য ঠেকাতে জাতিসংঘকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছে। লুলার এই বক্তব্য কেবল ট্রাম্পের সমালোচনা নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান বলে মনে করা হচ্ছে।