মার্কিন বিচার বিভাগ নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রতিশোধমূলক অভিযানের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জেমস ব্যাংক জালিয়াতি ও মিথ্যা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বিভ্রান্ত করেছেন।
গ্রীষ্মকালেই জেমসের অফিসে ট্রাম্প সম্পর্কিত তার দীর্ঘদিনের দেওয়ানি তদন্তের নথি চেয়ে একটি অপরাধমূলক সমন পাঠানো হয়েছিল। এরপর অক্টোবর মাসে ভার্জিনিয়ার একটি গ্র্যান্ড জুরি তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনে। শুক্রবার তাকে ভার্জিনিয়ার আদালতে অভিযুক্ত হিসেবে হাজির হতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধুমাত্র কোনো ফৌজদারি মামলা নয়; বরং ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বল করার একটি কৌশল। মামলার জটিলতা, খরচ ও জনসমালোচনা — সবকিছুই প্রতিপক্ষকে বিপর্যস্ত করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে বিচার বিভাগ এখন এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যা রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বলে সমালোচকরা মনে করছেন। এটি প্রতিপক্ষকে হেয় করা, মনোযোগ সরানো এবং প্রশাসনের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করার কার্যকর উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
লেটিশিয়া জেমস ট্রাম্পের অন্যতম দৃঢ় বিরোধী। তিনি ডেমোক্র্যাট অ্যাটর্নি জেনারেলদের একটি জোটের নেতৃত্ব দেন, যারা ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বিরোধী ৪০টিরও বেশি মামলা করেছেন। তার নেতৃত্বে দায়ের করা নাগরিক প্রতারণা মামলায় ট্রাম্পকে অর্ধ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছিল, যদিও আপিল আদালত তা পরবর্তীতে বাতিল করেছে।
তবু ট্রাম্প সংগঠনের ওপর একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষকের নিয়োগ বহাল রয়েছে। এখন এই নতুন ফৌজদারি মামলা জেমসের পূর্ববর্তী মামলাগুলোর কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ও সাবেক মার্কিন অ্যাটর্নি বারবারা ম্যাককোয়েড বলেন, “যখন একজন প্রেসিডেন্ট অভিযোগ দায়েরের আগেই বলেন ‘তারা দোষী’, তখন বোঝা যায় প্রক্রিয়াটি উল্টোভাবে চলছে। এখানে লক্ষ্য বিচার নয়, বরং অপমান সৃষ্টি করা।”
বিচার বিভাগ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে কয়েকজন কর্মকর্তা জেমসের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। পূর্বের এক ফেডারেল প্রসিকিউটর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অযৌক্তিক মনে করায় তাকে অপসারণ করে ট্রাম্পের সাবেক আইনজীবী লিন্ডসি হ্যালিগানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি নিজেই মামলাটি গ্র্যান্ড জুরিতে উপস্থাপন করেন।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভার্জিনিয়ার একটি বাড়ি, যেখানে জেমসের আত্মীয় নাকিয়া থম্পসন বসবাস করেন। থম্পসনের পুরনো অপরাধমূলক রেকর্ড ট্রাম্পপন্থী গণমাধ্যমগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার করছে, যদিও এর সঙ্গে মামলার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। জানা গেছে, থম্পসন কখনও ওই বাড়ির জন্য ভাড়া পরিশোধ করেননি, যা সরকারের অভিযোগকে দুর্বল করে দেয়।
সাবেক ফেডারেল প্রসিকিউটর এলিয়ট জ্যাকবসন বলেন, জেমসের বিরুদ্ধে অভিযোগের আইনি ভিত্তি দুর্বল। “এই মামলা টেকার মতো নয়,” তিনি মন্তব্য করেন।
আইনগতভাবে মামলাটি কতটা শক্ত, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে রাজনৈতিক দিক থেকে এটি স্পষ্টভাবে এক ধরনের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ, যা ট্রাম্পের প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহারে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করছে।
২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদকালে লেটিশিয়া জেমস নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি ট্রাম্প ও তার কোম্পানির তদন্ত করবেন। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন এবং ২০২২ সালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আর্থিক জালিয়াতির মামলা করেন।
ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের বিচারবিভাগীয় অভিজ্ঞতা তাকে বুঝিয়েছে—কিভাবে অপরাধের অভিযোগকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। প্রথম মেয়াদকালে তিনি বারবার অভিযোগ করেছেন, কেন বিচার বিভাগ তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তদন্ত করছে না। এখন দ্বিতীয় মেয়াদে সেই একই সংস্থা হয়ে উঠেছে তার প্রতিশোধের হাতিয়ার।
তথ্যসূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস