এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:২১ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ট্রাম্পের নতুন অভিবাসন নীতির কবলে আর্থিক খাত

ট্রাম্পের নতুন অভিবাসন নীতির কবলে আর্থিক খাত

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এবং অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করতে এবার দেশটির ব্যাংকিং খাতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। সিএনএন ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি নির্বাহী আদেশ জারির কথা বিবেচনা করছে যার মাধ্যমে মার্কিন ব্যাংকগুলো তাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ গ্রাহকদের নাগরিকত্ব যাচাই করতে বাধ্য হবে।

এই সম্ভাব্য পদক্ষেপটি কার্যকর হলে ব্যাংকগুলোকে তাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে পাসপোর্ট বা নাগরিকত্ব প্রমাণের নথিপত্র সংগ্রহ করতে হবে, যা মার্কিন আর্থিক খাতের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তবে হোয়াইট হাউস এখন পর্যন্ত এই পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।

ব্যাংকিং খাতে উদ্বেগের ঢেউ

আর্থিক খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এই সম্ভাব্য পদক্ষেপে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শিল্প খাতের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “এটি একটি অত্যন্ত ভয়াবহ আইডিয়া। আমরা এতে চরমভাবে আতঙ্কিত।”

ব্যাংক নির্বাহীদের আশঙ্কা, এই আদেশের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকগুলোকে ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে অনিবন্ধিত অভিবাসীদের খুঁজে বের করা এবং তাদের দেশান্তরের (Deportation) প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা। ব্যাংকগুলো বর্তমানে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ (AML) এবং ‘নো ইওর কাস্টমার’ (KYC) নিয়মের অধীনে গ্রাহকের ঠিকানা ও পরিচয় যাচাই করলেও নাগরিকত্ব বা ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস যাচাই করে না।

পূর্ববর্তী নজির ও আইনি লড়াই

ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে করদাতা বা সাধারণ নাগরিকদের তথ্য ব্যবহারের চেষ্টা এবারই প্রথম নয়। এর আগে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব পরিষেবা (IRS) থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টার সময় প্রায় ৫০ জন আইটি বিশেষজ্ঞকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। যদিও সেই উদ্যোগটি পরবর্তীতে আদালতের হস্তক্ষেপে স্থগিত হয়ে যায়।

এছাড়া, ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে ‘ডি-ব্যাংকিং’ বা রক্ষণশীলদের ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার বিরুদ্ধে নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। এমনকি গত ৬ জানুয়ারির ঘটনার পর জেপি মরগান চেজ (JPMorgan Chase) ট্রাম্পের একাউন্ট বন্ধ করে দিলে তিনি তাদের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করেছেন।

আর্থিক নজরদারি বনাম মানবাধিকার

ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন পদক্ষেপটি কেবল একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর একটি বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা দিচ্ছে। নিচে এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিশ্লেষণ করা হলো:

১. ব্যাংকিং খাতের ওপর প্রশাসনিক চাপ

ব্যাংকগুলো মূলত লাভজনক প্রতিষ্ঠান যারা গ্রাহকদের আস্থার ওপর ভিত্তি করে চলে। যদি কোনো গ্রাহক মনে করেন যে ব্যাংকে তথ্য দিলে তিনি আইনি ঝুঁকিতে পড়বেন, তবে বিশাল একটি জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে যাবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ইকোনমি’ বা অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আরও বড় করে তুলবে।

২. লজিস্টিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতা

যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল একটি দেশে কোটি কোটি গ্রাহকের নাগরিকত্ব তথ্য ‘রেট্রোঅ্যাক্টিভলি’ বা পেছন ফিরে যাচাই করা কার্যত অসম্ভব। ছোট ও মাঝারি ব্যাংকগুলোর জন্য এই প্রযুক্তিগত এবং জনবল সংক্রান্ত ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়বে। ব্যাংকিং খাতের এক বিশেষজ্ঞের মতে, “প্রত্যেক গ্রাহকের নাগরিকত্ব যাচাই করা কর্মক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।”

৩. সামাজিক বৈষম্য ও ভয়ের সংস্কৃতি

এই আদেশ কার্যকর হলে কেবল অনিবন্ধিত অভিবাসীরাই নয়, বরং বৈধ অভিবাসী এবং সাধারণ নাগরিকরাও হয়রানির শিকার হতে পারেন। ব্যাংকগুলো যদি পুলিশি বা গোয়েন্দা সংস্থার মতো আচরণ শুরু করে, তবে তা নাগরিক স্বাধীনতার পরিপন্থী হবে। ট্রাম্পের এই ‘অ্যাগ্রেসিভ ইমিগ্রেশন ক্র্যাকডাউন’ মূলত অভিবাসীদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি কৌশল।

৪. আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

২০২৫-২৬ মেয়াদে ট্রাম্পের এই ধরনের কট্টরপন্থী সিদ্ধান্তগুলো বারবার আদালতের বাধার মুখে পড়ছে। নাগরিকত্ব যাচাইয়ের এই আদেশও যে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে তা নিশ্চিত। গ্রাহক এবং ব্যাংক উভয় পক্ষ থেকেই এর বিরুদ্ধে পিটিশন দাখিল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই এই রিপোর্টগুলোকে ‘ভিত্তিহীন জল্পনা’ হিসেবে অভিহিত করলেও, প্রশাসনের পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ড ইঙ্গিত দেয় যে তারা অভিবাসন ইস্যুতে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। যদি এই নির্বাহী আদেশ সত্যিই স্বাক্ষরিত হয়, তবে তা কেবল অভিবাসন নীতি নয়, বরং মার্কিন পুঁজিবাদের মৌলিক কাঠামোকেও নাড়িয়ে দিতে পারে।

আর্থিক খাত এখন তাকিয়ে আছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরবর্তী কলমের খোঁচায় কী ঘটে, সেদিকে।