ম্যানহাটনের সেভেন্থ অ্যাভিনিউর ভিড়ভাট্টায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়—জোহরান মামদানীর সঙ্গে পথচলা যেন এক ধরনের শহুরে অভিযাত্রা। কেউ সেলফি তুলতে চায়, কেউ শুভেচ্ছা জানায়, আবার কেউ তাঁর ‘সাশ্রয়ী জীবন’-কেন্দ্রিক প্রচারণায় স্বেচ্ছাসেবী হতে আগ্রহী। এমনই এক সকালে দক্ষিণ আফ্রিকার কৌতুকশিল্পী ট্রেভর নোয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়; তিনি হাসিমুখে বলেন, “আমার পডকাস্টে তোমায় চাই।”
৩৩ বছর বয়সী এই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট এখন নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। গত জুনের প্রাইমারিতে সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোকে ১২.৮ পয়েন্টে হারিয়ে মামদানি সাড়া ফেলে দেন সারা দেশে। বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামস প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।
শ্রোতা নেতা থেকে শহরের সম্ভাব্য মেয়র
প্রাইমারির পর মামদানি শুরু করেন নীরব কূটনীতি—ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, প্রশাসনিক অভিজ্ঞ ও সংশয়ী ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে বৈঠক করে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন “শ্রোতা নেতা” হিসেবে। তিনি খোলাখুলি স্বীকার করেন প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং শেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
ব্যবসায়ী স্যালি সাসম্যানের ভাষায়, “মামদানি এমন এক প্রগ্রেসিভ নেতা, যিনি সমতা চান, কিন্তু ব্যবসার সঙ্গে সংঘাত নয়—সহযোগিতা চান।” ফলে ধীরে ধীরে নিউইয়র্কের প্রভাবশালী অংশও তাঁর প্রতি আস্থা রাখতে শুরু করেছে।
‘মামদানি ২.০’—সহনশীল রাজনীতির বার্তা
রাজনৈতিক ভাষায় বদল এনেছেন মামদানি। তিনি বলেন,“আমি ভাড়াটিয়াদের পক্ষে, কিন্তু বাড়িওয়ালাদের শত্রু নই; শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে, কিন্তু বিশেষায়িত স্কুল ভাঙতে চাই না; ফিলিস্তিনের অধিকারের পক্ষে, কিন্তু ইহুদিবিদ্বেষী নই।”
এখন তাঁর লক্ষ্য—সবার জন্য ফ্রি বাস সার্ভিস, শিশু যত্নে সরকারি সহায়তা, ও চার বছরের ভাড়া স্থগিতনীতি।
গাজা ইস্যু: বিশ্বাসের পরীক্ষায় রাজনীতি
ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা প্যাট্রিক গ্যাসপার্ড বলেন, “গাজা নিয়ে মুখ না খুললে মামদানির এই উত্থান সম্ভব হতো না।” তাঁর মতে, গাজা নিউইয়র্কবাসীর কাছে এখন এক নৈতিক প্রশ্ন—আপনি কাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
গ্যাসপার্ড আরও বলেন, “যেভাবে ওবামা ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা করে উঠে এসেছিলেন, মামদানি গাজা ইস্যুতে তেমন এক নৈতিক অবস্থান নিয়েছেন।”
বহুসংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি
মামদানি জন্মসূত্রে নিউইয়র্কবাসী, শিকড় ভারত ও উগান্ডায়। মুসলিম পরিচয় ও প্রবাসী বাস্তবতার মিশেলে তাঁর রাজনীতি গড়ে উঠেছে মানবিকতা ও ন্যায়বোধে।
তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাসই গঠন করেছে আমি পৃথিবীকে কীভাবে দেখি—এবং পৃথিবী আমাকে কীভাবে দেখে।”
ডিজিটাল তারকা ও তরুণ প্রজন্মের প্রতীক
সোশ্যাল মিডিয়া ও পডকাস্ট জগতে জনপ্রিয় মামদানি আধুনিক প্রজন্মের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন। তিনি বলেন, “রাজনীতি মানে শুধু থাকা নয়, কাজ করা—আর সেই কাজের শুরু হয় মানুষের গল্প শোনা দিয়ে।”
তাঁর “halalflation” ভিডিও ইউটিউবে ৩ লাখের বেশি ভিউ পেয়েছে, যা তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সংযোগের নতুন ধারা তৈরি করেছে।
নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক প্রতীক
ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অফ আমেরিকা (ডিএসএ)-র ঐতিহ্যবাহী কাঠামোকে ছাড়িয়ে মামদানি গড়ে তুলেছেন এক নতুন, বহুসাংস্কৃতিক রাজনৈতিক জোট। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়—গাজা ইস্যুতে সমালোচনা, পুলিশ সংস্কার নিয়ে মতভেদ, এবং প্রগতিশীলদের মধ্যে বিভাজনও রয়েছে।
তবু তাঁর অবস্থান দৃঢ়: “আমি ডেমোক্র্যাট—কিন্তু প্রগতির স্বার্থে যাদের প্রয়োজন, তাদের সঙ্গেই কাজ করব।”
শেষ কথা
নিউইয়র্কের তরুণ, মুসলিম, দক্ষিণ এশীয় ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী এখন তাঁর পেছনে। জয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “এই নেতৃত্ব শুধু আমার নয়; এটি নিউইয়র্কের নতুন আত্মপরিচয়ের প্রতীক।”
যদি তিনি মেয়র নির্বাচিত হন, তবে তিনি হবেন শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম উদার বামপন্থী প্রশাসক।
একই সঙ্গে তাঁর জয় প্রমাণ করবে—শাসন ও ন্যায়বোধ একসঙ্গে চলতে পারে।
তথ্যসূত্র: The New York Times