চীনের নতুন “রেয়ার আর্থ” রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা ঘিরে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়েছে ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের অঙ্গনে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চীন যদি এই পদক্ষেপে অনড় থাকে, তবে আমেরিকা ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে এবং গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার রপ্তানিতেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আনবে।
বেইজিং গত সপ্তাহে জানায়, তারা এমন সব পণ্য রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আনবে যেগুলোতে সামান্য পরিমাণেও চীনা “রেয়ার আর্থ” বা বিরল খনিজ ব্যবহৃত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত কার্যত দুই দেশের মধ্যে চলমান সাময়িক বাণিজ্যবিরতি ভেঙে দিয়েছে এবং নতুন অর্থনৈতিক সংঘাতের সূচনা করেছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এবার তারা শুধু কাঁচামাল নয়, বরং সেইসব যন্ত্রপাতিও নিয়ন্ত্রণ করবে যেগুলিতে এসব উপাদান সংযুক্ত। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশই প্রভাবিত হতে পারে, কারণ আইফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, এমনকি যুদ্ধবিমানের সেন্সরেও এসব উপাদান ব্যবহৃত হয়।
হোয়াইট হাউসের সাবেক উপদেষ্টা এভারেট আইসেনস্ট্যাট বলেন, “চীন দেখাতে চাইছে, তারা চাইলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গলা চেপে ধরতে পারে।”
এই উত্তেজনার প্রভাব ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে পড়েছে। ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক ঘোষণার পর এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক দুই শতাংশের বেশি পড়ে যায়, যা এপ্রিলের পর সবচেয়ে বড় পতন।
বিভিন্ন বিশ্লেষক মনে করছেন, চীন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে এগোচ্ছে, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট। সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা লিজা টোবিন বলেন, “আমরা এখনো দুই-ডাইমেনশনাল দাবা খেলছি, আর চীন চার-ডাইমেনশনাল।”
হোয়াইট হাউস অবশ্য দাবি করছে, তাদের সরল ও প্রেসিডেন্ট-নির্ভর নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া বরং আরও কার্যকর। এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রেসিডেন্ট নিজেই বিদেশনীতি পরিচালনা করেন—এটাই আমাদের কাঠামো। বেশি লোক মানেই ভালো ফল নয়।”
চীনের এই পদক্ষেপ এমন এক সময় এলো, যখন ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আসন্ন এশিয়া-প্যাসিফিক সম্মেলনের পাশে বৈঠকের পরিকল্পনা করছিলেন। এখন সেই সাক্ষাৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষক ক্রেইগ সিঙ্গলটন বলেন, “বেইজিংয়ের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আর ওয়াশিংটনের অস্থিরতার সংঘাতই এখন সামনে আসছে।”
এদিকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কৃষি খাতেও চাপ সৃষ্টি করেছে—তারা সয়াবিনসহ কিছু কৃষিপণ্য আমদানি বন্ধ রেখেছে, যা ট্রাম্প-সমর্থক অঙ্গরাজ্যগুলোতে প্রভাব ফেলতে পারে। একইসঙ্গে উভয় দেশ একে অপরের জাহাজে বন্দর ফি বসানোর পরিকল্পনাও নিয়েছে।
কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন অতিরিক্তভাবে বাণিজ্য চুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়েছে, অথচ বৃহত্তর নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার দিকটি উপেক্ষিত হচ্ছে।
চীনের নতুন রপ্তানি আইন শুধু পণ্যে নয়, বরং রেয়ার আর্থ উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রযুক্তি শেয়ারিংয়েও কড়াকড়ি আরোপ করছে। এতে বিদেশে এসব কাজের সহায়তায় যুক্ত চীনা নাগরিকদেরও বাধা দেওয়া হবে।
সাবেক মার্কিন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা জিওফ্রি গার্টজ বলেন, “চীন জানিয়ে দিচ্ছে—তারা চাইলে এক নিমিষে রপ্তানি বন্ধ করতে পারে, আর সেটাই আলোচনায় তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।”
ট্রাম্প এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নিজস্ব খনিজ উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লাগবে।
শিল্প সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি বলেন, “আমরা এতটাই বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি যে এখন নিজেরাই ‘রিহ্যাবে’ যেতে হবে। এই অভ্যাস না ছাড়লে কোনো সমাধান আসবে না।”
চীন যদিও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, তবুও একসঙ্গে সংলাপের প্রস্তাবও দিয়েছে। তারা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে “রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ সংলাপ প্রক্রিয়া” শুরু করতে আগ্রহী, যাতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
বিশ্লেষক মার্ক বুশ বলেন, “চীন ইঙ্গিত দিচ্ছে—চলো, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ শৃঙ্খলা স্থিতিশীলতার চুক্তি করি, খণ্ড খণ্ড প্রতিক্রিয়া নয়।”
ট্রাম্প শুক্রবার সাংবাদিকদের জানান, তিনি এখনো শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছেন না। তিনি বলেন, নভেম্বরের ১ তারিখে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন শুল্ক হয়তো আলোচনার সুযোগ রাখতেই নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, উত্তেজনা না কমলে এর ধাক্কা সরাসরি পড়বে মার্কিন অর্থনীতিতে, যা এখনো চীনা শিল্প উপকরণ ও ভোক্তা পণ্যের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।
শাংহাইভিত্তিক পরামর্শক ক্যামেরন জনসন সতর্ক করে বলেন, “চীন এখনো ওষুধ বা বায়োটেক খাতে নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। কিন্তু তারা যদি চায়, আগামীকাল থেকেই আমাদের অর্থনীতি থেমে যেতে পারে—আর আমাদের হাতে কিছুই করার থাকবে না।”