এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবার ২০২৫, ০৬:৩৫ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী নেতৃত্ব নিতে চায় সৌদি আরব

গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী নেতৃত্ব নিতে চায় সৌদি আরব

গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। দেশটি হামাসকে নিরস্ত্র ও প্রভাবহীন করতে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে (পিএ) পুনরায় শক্তিশালী করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর হাতে আসা সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি গোপন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব গাজায় একটি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের উদ্যোগকে সমর্থন করবে। এমন বাহিনীতে সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ অংশ নিতে পারে বলে দলিলটিতে উল্লেখ রয়েছে।

দলিল অনুসারে, সৌদি আরব গাজা উপত্যকা ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে চায়। এর অংশ হিসেবে হামাসের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভূমিকা সীমিত করা হবে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে সংস্কারের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করা হবে। উদ্দেশ্য—১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন করা।

রিয়াদ মনে করে, হামাস শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং বিভাজনকে গভীর করছে; তাই তাকে প্রান্তিক করা অপরিহার্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, হামাসকে নিরস্ত্র করার প্রক্রিয়া হবে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক চুক্তির আওতায় ধাপে ধাপে, যাতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে।

সৌদি আরবের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধীরে ধীরে গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়াকে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করার কথাও উল্লেখ আছে। পুরো উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হবে মিসর, জর্ডান ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরামর্শে। এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মানাল বিনতে হাসান রাদওয়ান।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ২০০৭ সালের পর থেকে গাজায় কোনো উপস্থিতি রাখতে পারেনি। সে সময় হামাসের নির্বাচনী বিজয়ের পর ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং হামাস নিয়ন্ত্রণ নেয় গাজা উপত্যকার।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, সৌদি আরব ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার আনতে চায়—দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও সব ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে। এর মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ে তোলাই হবে মূল লক্ষ্য।

রাজত্বটি ফিলিস্তিনি জনগণের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও নির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ জানানো হয়নি। পাশাপাশি ‘ফিলিস্তিনি জাতীয় সংলাপের’ আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে সব গোষ্ঠী ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। সৌদি আরব এই সংলাপকে সহায়তা করতে আঞ্চলিক কর্মশালা ও সম্মেলনের আয়োজন করবে। তবে হামাসকে এই সংলাপে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি। উল্লেখযোগ্যভাবে, পুরো প্রতিবেদনে ইসরায়েলের নাম একবারও উল্লেখ করা হয়নি।

প্রতিবেদনটির তারিখ ২৯ সেপ্টেম্বর। এর এক দিন আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান গাজায় ইসরায়েলের ‘গণহত্যা বন্ধে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের’ আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এর আগে গ্রীষ্মকালে সৌদি আরব ও ফ্রান্স যৌথভাবে গাজার জন্য একটি শান্তি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিল, যেখানে যুদ্ধবিরতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন এবং ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংলাপ পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানানো হয়।

অক্টোবরের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজস্ব যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর করেন, যেখানে কয়েকটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সহযোগিতা করে। ওই চুক্তিতে সৌদি–ফরাসি প্রস্তাবের অনেক উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বন্দি বিনিময় ও আংশিক ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার ঘটে। এতে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের শর্তও ছিল, যা হামাস নেতারা প্রত্যাখ্যান করে জানান—ইসরায়েলি দখল শেষ না হওয়া এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত নিরস্ত্রীকরণ সম্ভব নয়।

জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে ট্রাম্প জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার ও মিসরসহ বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি গাজায় শান্তিরক্ষী বাহিনী গঠনে এসব দেশের সেনা পাঠানোর আহ্বান জানান।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর মিসরের শারম আল শেখে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান বৈঠকে অংশ নেননি।

মিসর, সৌদি ও আমিরাতি সূত্রগুলো জানায়, বৈঠকে প্রত্যাশিত প্রভাব ও ভূমিকা না পাওয়ায় তারা অনুপস্থিত ছিলেন। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অঞ্চলটির সবচেয়ে ধনী দেশ হিসেবে গাজার মানবিক ত্রাণ ও পুনর্গঠনের মূল ব্যয় বহনের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপরই পড়বে।

অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ বলেছেন, সৌদি আরব যদি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শর্তে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়, তবে ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করবে। তিনি মন্তব্য করেন, “যদি সৌদি আরব বলে, সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের বিনিময়ে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র চাই, তাহলে না ধন্যবাদ, বন্ধুরা। তোমরা তোমাদের মরুভূমিতে উট নিয়ে ঘুরো, আমরা আমাদের রাষ্ট্র ও অর্থনীতি আরও এগিয়ে নেব।”