ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর আকাশ থেকে বোমা পড়া থেমেছে কিন্তু মানুষের ওপর থেকে অনিশ্চয়তার কুয়াশা নামেনি। বন্দি বিনিময় ও লাশ ফেরত আনার শর্তে যে সমঝোতা হয়েছে, সেটি বাস্তবায়নের গতি ও পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি প্রতিদিনই নতুন টানাপোড়েন তৈরি করছে। ইসরায়েল বলছে, হামাস জীবিতদের ছাড়লেও মৃত জিম্মিদের সবার দেহাবশেষ এখনো ফেরত দেয়নি। ফলে তারা ঘোষণা করা সাহায্যের মাত্রা অর্ধেকে নামিয়ে ৩০০ ট্রাকে নামাতে চেয়েছিল এবং রাফা সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ রাখার হুমকিও দিয়েছিল। যা পরবর্তী ঘণ্টাগুলোতে আংশিকভাবে শিথিল হয়। ১৫ অক্টোবর পুনরায় রাফা খোলার প্রস্তুতির খবর এলেও সেটিও “নিরাপত্তা যাচাই” সাপেক্ষে, অর্থাৎ দরজা খোলে বন্ধ হয় রাজনৈতিক সংকেতের সুইচ টিপে।
এদিকে সংখ্যার ভাষায় দেখা যায়, যুদ্ধবিরতির পর প্রত্যাশিত প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক, যা ন্যূনতম প্রয়োজন বলে জাতিসংঘ পরিবার ও মানবিক সংস্থাগুলো বলে আসছে। তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি সরবরাহ। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, সপ্তাহের শুরু থেকে মাত্র ১৩৭ - ১৮৬ ট্রাক ঢুকতে পেরেছে। তাতে ময়দা ও কিছু চিকিৎসা সামগ্রী থাকলেও জ্বালানি নেই। পানি অপ্রতুল, অর্থাৎ বেকারি চালু রাখা ও হাসপাতাল টিকিয়ে রাখার মতো মৌলিক সক্ষমতাই অর্ধেক পঙ্গু। ফলে মানুষের ভিড়ে ট্রাক আটকে যাওয়া, বিতরণব্যবস্থা ভেঙে পড়া, সব মিলিয়ে ত্রাণও হয়ে উঠছে আরেকটি অস্থিরতার উৎস।
রাজনীতির অঙ্ক আরও কঠিন। দুই বছরের বিধ্বস্ততার পর এই যুদ্ধবিরতি শান্তির সেতু হবে, এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বন্দি, লাশ ফেরত, সীমান্ত খোলা, বন্ধ, সাহায্যের কোটার ওঠানামা- সবই দেখাচ্ছে, মাটির নীচে রয়ে গেছে আস্থার ক্রমশ: নি:শেষ। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা বলছেন, সহায়তা “ম্যাস স্কেলে” না গেলে লুটপাট ও বিশৃঙ্খলা থামানো যাবে না। বাজার সচল না হলে ত্রাণ নির্ভরতা কেবল হতাশা বাড়াবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিন্যাসকে শাসন করবে, পুনর্গঠন কিভাবে হবে, নিরাপত্তা ও বিচারকাঠামো কেমন দাঁড়াবে, এসব প্রশ্নের কোনো স্বচ্ছ মানচিত্র এখনো হাজির করা যায়নি।
তাই শান্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা এখন এই তিন বৃত্তে আবদ্ধ: এক, প্রতিদিন অন্তত ৬০০ ট্রাকের ধারাবাহিক ও বাধাহীন প্রবেশ নিশ্চিত করা, খাদ্য, পানি, জ্বালানি, চিকিৎসা একসঙ্গে। দুই, বন্দিলাশ ফেরতের ফাইল রাজনীতি থেকে সরিয়ে একটি নিরপেক্ষ, সময়বদ্ধ ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়ায় নেওয়া। তিন, গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও পুনর্গঠনের রোডম্যাপ দ্রুত প্রকাশ ও বাস্তবায়ন শুরু করা- যাতে পক্ষগুলো ‘গ্যারান্টি’অনুভব করে। এই তিনটি শর্ত একযোগে না নড়লে যুদ্ধবিরতি কেবল গোলাবারুদ নিষ্ক্রিয়তার বিরতি হয়ে থাকবে। মানুষের জীবনে শান্তি নামে এমন কোনো নিশ্চয়তার নাম এখনো লেখা হয়নি।