গাজায় গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এদিকে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি গ্রামগুলিতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে।
মঙ্গলবার গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানায়, তারা ৩৫টি অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ আল-শিফা হাসপাতালে নিয়ে গেছে, যেখানে তাদের পরিচয় নিশ্চিতের কাজ চলছে। অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৯ হাজার ১৮২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে।
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি বাহিনী অন্তত ২৪৫ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে চালানো হামলায় ১,১৩৯ জন নিহত হয় এবং প্রায় ২০০ জনকে বন্দি করা হয়। গাজার বিভিন্ন স্থানে এখনও হাজারো নিখোঁজ মানুষের দেহাবশেষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদক তারেক আবু আজজুম জানিয়েছেন, গাজার পরিবারগুলো এখনো হাসপাতাল ও মর্গে প্রিয়জনদের সন্ধানে ছুটছেন, কারও দেহাবশেষ চিহ্নিত করতে চেষ্টা করছেন পোশাক, দাগ বা ব্যক্তিগত সামগ্রী দেখে। মৃতদেহগুলোর পচন ও ডিএনএ পরীক্ষার সরঞ্জামের অভাবে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের কাজও অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ১০ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত অন্তত ২৮২ বার ইসরায়েল চুক্তি লঙ্ঘন করেছে—বিমান ও স্থল হামলা এবং সরাসরি গুলিবর্ষণের মাধ্যমে। আল জাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, গত ৩১ দিনের মধ্যে ২৫ দিনই গাজায় কোনো না কোনো আক্রমণ বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী গাজায় পূর্ণ মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর কথা থাকলেও জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, ইসরায়েল প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশেষ করে শিশুদের টিকাদানের জন্য ১৬ লাখ সিরিঞ্জ ও প্রায় ১০ লাখ শিশুখাদ্যের বোতল প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। ইউনিসেফের মুখপাত্র রিকার্ডো পিরেস বলেন, ইসরায়েল এগুলোকে ‘ডুয়াল-ইউজ’ অর্থাৎ সামরিক ব্যবহারের উপযোগী বলে বিবেচনা করছে, যার কারণে এগুলো সীমান্তে আটকে আছে। এর ফলে ৪০ হাজারেরও বেশি শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত গাজায় মাত্র ৩,৪৫১টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করতে পেরেছে, যা বাস্তব চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। দুই বছর ধরে বিদ্যুৎবিহীন গাজায় মানুষ অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছে। গাজার বিদ্যুৎ কোম্পানির কর্মকর্তা মোহাম্মদ থাবেত বলেন, বর্তমানে গাজায় বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ ‘শূন্য’।
এদিকে, দখলকৃত পশ্চিম তীরে মঙ্গলবার মুখোশধারী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা বেইত লিদ ও দেইর শরাফ নামের দুটি ফিলিস্তিনি গ্রামে হামলা চালিয়ে চারজনকে আহত করে এবং চারটি দুগ্ধবাহী ট্রাক, খামারঘর, টিনের ঘর ও তাঁবুতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা মুয়াইয়াদ শাবান জানান, এসব হামলার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের জমি থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা চলছে এবং ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বসতি স্থাপনকারীদের আশ্রয় দিচ্ছে।
ইসরায়েলি পুলিশ জানিয়েছে, হামলার ঘটনায় চারজন ইসরায়েলিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আল জাজিরার যাচাইকৃত এক ভিডিওতে দেখা গেছে, একাধিক গাড়ি জ্বলছে, আর ফিলিস্তিনিরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে।
ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ ঘটনাটিকে ‘গুরুতর ও লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং বলেন, “নাগরিক বা সেনাদের বিরুদ্ধে এই সহিংসতা লাল রেখা অতিক্রম করেছে।”
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের উপনিবেশ প্রতিরোধ কমিশনের তথ্যমতে, গত মাসে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা পশ্চিম তীরে ২,৩৫০টি হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ১,৫৮৪টি হামলা সরাসরি ইসরায়েলি সেনাদের, বাড়িঘর ধ্বংস ও জলপাইগাছ উপড়ে ফেলার সঙ্গে সম্পর্কিত। সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে রামাল্লাহ, নাবলুস ও হেবরন এলাকায়।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বিটসেলেম জানিয়েছে, বসতি স্থাপনকারীরা এখন প্রায় প্রতিদিন ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালাচ্ছে—গুলিবর্ষণ, মারধর, বাড়ি ও গাড়ি পোড়ানো, গাছপালা ধ্বংস ও ফসল চুরি করে। এসব হামলার জন্য তাদের প্রায়ই জবাবদিহি করতে হয় না, বরং অনেক সময় ইসরায়েলি সেনারা তাদের সঙ্গে থেকেই এসব হামলায় সহায়তা করে।