বিশ্ববিখ্যাত সংগীতশিল্পী ইউসুফ ইসলাম, যিনি একসময় 'ক্যাট স্টিভেন্স' নামে বিশ্ব জয় করেছিলেন, তার জীবন কোনো এক রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। সত্তরোর্ধ্ব এই শিল্পী এখন তার বর্ণাঢ্য এবং বিতর্কিত জীবনের পরিক্রমা নিয়ে লিখেছেন আত্মজীবনী 'ক্যাট অন দ্য রোড টু ফাইন্ডআউট'। আগামী ৭ অক্টোবর প্রকাশিতব্য এই বইটিতে তিনি তার আধ্যাত্মিক রূপান্তর, সংগীত ত্যাগ এবং দীর্ঘ ৩০ বছর পর পুনরায় গিটারে সুর তোলার নেপথ্য গল্পগুলো অত্যন্ত অকপটে তুলে ধরেছেন। লন্ডনের এক ভাড়া বাসায় বসে ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, তার এই জীবন সফর আসলে এক 'সরল পথ' বা 'সিরাত' খোঁজার গল্প।
তিনবার মৃত্যুর মুখোমুখি: জীবন দর্শনের পরিবর্তন
ইউসুফ ইসলামের জীবনে মৃত্যু তিনবার কড়া নেড়েছে। প্রথমবার কৈশোরে লন্ডনের ছাদে লাফানোর সময় বন্ধু তাকে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচান। দ্বিতীয়বার ২০ বছর বয়সে যখন তিনি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, তখন যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে পিয়ানোর ওপর রক্তবমি করেছিলেন। কিন্তু তৃতীয়বার ১৯৭৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার মালিবু সৈকতে সাঁতার কাটতে গিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের প্রবল স্রোতে যখন তিনি তলিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। মৃত্যুর কয়েক সেকেন্ড আগে তিনি স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, "যদি তুমি আমাকে বাঁচিয়ে দাও, তবে আমি তোমার জন্য কাজ করব।" অলৌকিকভাবে একটি বিশাল ঢেউ তাকে তীরের দিকে ঠেলে দেয়। সেই দিনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষের দেহ নশ্বর, কেবল আত্মাই অবিনশ্বর।
কুরআনের আলো এবং ক্যাট স্টিভেন্সের অন্তর্ধান
সাগর থেকে বেঁচে ফেরার কয়েক মাস পর তার ভাই ডেভিড তাকে উপহার হিসেবে একটি কুরআন শরীফ দেন। জেরুজালেমের এক মসজিদে গিয়ে সেই গ্রন্থের পবিত্রতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন ডেভিড। ইউসুফ জানান, কুরআনের প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা পড়েই তিনি অনুভব করেছিলেন যে তিনি তার সেই প্রার্থনার প্রতিশ্রুতি পূরণের পথ খুঁজে পেয়েছেন। ১৯৭৭ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৮ সালে নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ইউসুফ ইসলাম। এরপরই ঘটে রক এন্ড রোলের ইতিহাসের অন্যতম বড় 'অন্তর্ধান'। তিনি তার পিয়ানো, গিটার এবং যাবতীয় বাদ্যযন্ত্র নিলামে বিক্রি করে দিয়ে প্রচারের আলো থেকে দূরে সরে যান। প্রায় ৩০ বছর তিনি ড্রামস ছাড়া অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র স্পর্শ করেননি।
পুত্রের হাত ধরে সংগীতের প্রত্যাবর্তন
ইউসুফ ইসলামের সংগীতে ফিরে আসা ছিল অনেকটা কাকতালীয়। ২০০২ সালে তার ছেলে মুহাম্মদ লন্ডন থেকে একটি গিটার কিনে আনেন। একদিন দুবাইতে পারিবারিক ছুটির সময় ছেলে গোপনে গিটারটি বাজাচ্ছিলেন। ইউসুফ ছেলের ঘরে ঢুকে সেটি হাতে তুলে নেন এবং দীর্ঘ বিরতির পর কিছু কর্ড বাজান। তার মেয়ে আমিনা তখন তার একটি পুরনো গান গাওয়ার অনুরোধ করেন। সেই রাতটি ছিল ঐতিহাসিক; ইউসুফ তার ছেলের গিটারটি নিজের ঘরে নিয়ে যান এবং পরদিনই একটি নতুন গান লিখে ফেলেন। এরপর থেকে তিনি একের পর এক অ্যালবাম উপহার দিয়ে যাচ্ছেন, এমনকি ডলি পার্টন এবং পল ম্যাককার্টনির মতো তারকাদের সাথেও কাজ করেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন, "বক্তৃতা দেওয়ার চেয়ে গেয়ে শোনানোই মনের ভাব প্রকাশের সেরা উপায়।"
মানবিকতা ও বিতর্কের দোলাচল
ইউসুফ ইসলামের দীর্ঘ নীরবতা এবং পরে সংগীতে ফিরে আসা নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিতর্ক কম হয়নি। অনেকে একে ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ মনে করলেও ইউসুফ তার 'হোয়াই আই স্টিল ক্যারি আ গিটার' বইতে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, শিল্প যদি আধ্যাত্মিক ও গভীর হয়, তবে তা স্রষ্টারই মহিমা প্রচার করে। তবে জীবনের এই দীর্ঘ পথে তিনি কিছু ভুলের কথাও স্বীকার করেছেন। ১৯৮৯ সালে সালমান রুশদির বিরুদ্ধে ফতোয়া নিয়ে তার বিতর্কিত মন্তব্য বা তার একরোখা স্বভাবের জন্য তিনি অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি ফিলিস্তিনি শিশুদের সহায়তা, ইংল্যান্ডে ইসলামি স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং শান্তির জন্য তার আজীবন সংগ্রামের কথাও বইটিতে উঠে এসেছে।
গাজা সংকট ও আগামীর পৃথিবী
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি, বিশেষ করে গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে ইউসুফ ইসলাম অত্যন্ত বিমর্ষ। ১৯৮৮ সাল থেকেই তার বিরুদ্ধে হামাসকে সমর্থনের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে, যার ফলে ২০০৪ সালে তাকে আমেরিকা থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। তিনি মনে করেন, গাজার এই পরিস্থিতি মানবতার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। নতুন প্রজন্ম যা দেখছে, তা তারা কখনো ভুলবে না। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ যখন সত্যকে খুঁজে পায়, তখন সে তা নিয়ে কথা বলতে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।
ইউসুফ ইসলাম এখন কেবল একজন সংগীতশিল্পী নন, তিনি একজন শান্তির দূত। তার পিয়ানোয় যে রক্তের দাগ লেগেছিল, তা আজ আধ্যাত্মিকতার সাদা রঙে ধুয়ে মুছে সাফ। 'ক্যাট স্টিভেন্স' মারা যায়নি, বরং সে 'ইউসুফ ইসলাম' রূপে পুনর্জন্ম লাভ করেছে, যিনি আজও গিটারে সুর তোলেন মানুষের আত্মার মুক্তির গান গাইতে।