যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে ভোরে ফেডারেল এজেন্টদের ঝটিকা অভিযানে এক শিক্ষার্থীকে আটকের ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক ভবন (ডরমিটরি) থেকে এলমিনা আগায়েভা নামক ওই শিক্ষার্থীকে আটক করে ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (ডিএইচএস) এজেন্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সিটি কাউন্সিলের সদস্যদের অভিযোগ, ফেডারেল এজেন্টরা ‘মিথ্যা তথ্য’ দিয়ে এবং কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে এই আটক অভিযান চালিয়েছে। এই ঘটনাটি আইভি লিগ স্কুলগুলোতে অভিবাসী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং ফেডারেল এজেন্সিগুলোর কার্যপরিধি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার বিবরণ: ভোর সাড়ে ৬টার রুদ্ধশ্বাস অভিযান
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ক্লেয়ার শিপম্যান স্কুলের ওয়েবসাইটে দেওয়া এক বিবৃতিতে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, "আজ সকাল আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ফেডারেল এজেন্টরা কলম্বিয়া রেসিডেন্সিয়াল ভবনে প্রবেশ করে একজন শিক্ষার্থীকে আটক করেছে। আমরা আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি, শিক্ষার্থীর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করছি এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দিচ্ছি।"
সিটি কাউন্সিলের ক্ষোভ ও এজেন্টদের বিরুদ্ধে ‘প্রতারণা’র অভিযোগ
নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের স্পিকার জুলি মেনিন এবং মেজরিটি লিডার শন আব্রু এক যৌথ বিবৃতিতে এই ঘটনাকে ‘বিঘ্নিতকর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তারা অভিযোগ করেছেন যে, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) এর এজেন্টরা ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে মিথ্যা পরিচয় দিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, "এজেন্টরা একজন নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজছেন বলে নিরাপত্তা রক্ষীদের বিভ্রান্ত করেন এবং এভাবে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে ওই শিক্ষার্থীকে আটক করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আইস-এর কোনো স্থান নেই। এই ধরনের কর্মকাণ্ড আমাদের শহর বা দেশকে নিরাপদ করে না, বরং অবিশ্বাস ও বিপত্তি বাড়িয়ে দেয়।"
আটক শিক্ষার্থীর পরিচয় ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আর্তি
আটক এলমিনা আগায়েভা একজন জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। ইনস্টাগ্রামে তার ১ লাখেরও বেশি অনুসারী রয়েছে। তিনি প্রায়ই একজন অভিবাসী হিসেবে আইভি লিগ স্কুলে পড়ার অভিজ্ঞতা এবং জীবন সংগ্রামের গল্প শেয়ার করতেন। আটকের পরপরই সকাল ৭টার দিকে তিনি ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্ট করেন। গাড়ির পেছনের সিটে বসা অবস্থায় একটি ছবি দিয়ে তিনি লেখেন, "ডিএইচএস আমাকে অবৈধভাবে গ্রেপ্তার করেছে। দয়া করে সাহায্য করুন।"
ডিএইচএস এবং আইস-এর পাল্টা যুক্তি
ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটির একজন মুখপাত্র আটকের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, "আইসিই আজ এলমিনা আগায়েভাকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি আজারবাইজান থেকে আসা একজন নাগরিক যার স্টুডেন্ট ভিসা ২০১৬ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় বাতিল করা হয়েছিল। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, তিনি ক্লাসে উপস্থিত ছিলেন না। বর্তমানে ডিএইচএস-এ তার কোনো আপিল বা আবেদন ঝুলে নেই।" মুখপাত্র আরও দাবি করেন যে, ভবনের ম্যানেজার এবং ওই শিক্ষার্থীর রুমমেট স্বেচ্ছায় অফিসারদের ভেতরে ঢুকতে দিয়েছিলেন।
আইনি লড়াই ও জরুরি পিটিশন
আগায়েভার আইনজীবীরা বৃহস্পতিবারই একটি জরুরি পিটিশন দাখিল করেছেন। তাদের দাবি, এজেন্টদের কাছে কোনো ওয়ারেন্ট ছিল না এবং তারা স্রেফ একজন নিখোঁজ ব্যক্তিকে খোঁজার নাম করে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকেছেন। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই তাকে লোয়ার ম্যানহাটনের একটি ফেডারেল ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পিটিশনে তার অবিলম্বে মুক্তি দাবি করা হয়েছে।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে এলমিনা আগায়েভার আটকের ঘটনাটি কেবল একজন শিক্ষার্থীর ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভিবাসন নীতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসনের ওপর একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা তিনটি প্রধান দিক যা আমাদের ভাবিয়ে তোলে:
১. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফেডারেল এজেন্সির অনুপ্রবেশ: ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করা হয়। কিন্তু যেভাবে ডিএইচএস এজেন্টরা ‘নিখোঁজ ব্যক্তি’ খোঁজার দোহাই দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকল, তা প্রশাসনিক সততাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। এটি ভবিষ্যতে অভিবাসী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর অনাস্থা তৈরি করবে।
২. আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি মারপ্যাঁচ: ডিএইচএস দাবি করেছে যে, আগায়েভার ভিসা ২০১৬ সালে অর্থাৎ ১০ বছর আগে বাতিল হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি যদি অবৈধই হয়ে থাকেন, তবে কেন এতদিন পর এবং কেন এখন তাকে টার্গেট করা হলো? তিনি একজন জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার বলেই কি তাকে ‘দৃষ্টান্ত’ হিসেবে ব্যবহারের জন্য এই সময়টি বেছে নেওয়া হয়েছে? ওবামা আমলের একটি বাতিলকৃত ভিসাকে বর্তমান প্রশাসনের সময় প্রয়োগ করা ইঙ্গিত দেয় যে, অভিবাসন ফাইলগুলো অনেক সময় রাজনৈতিক বা প্রচারণামূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।
৩. মুক্তচিন্তা ও অভিবাসী কণ্ঠস্বর দমন: এলমিনা আগায়েভা সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন অভিবাসীর লড়াই নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি তার সেই কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল হতে পারে। যখন একজন শিক্ষার্থী তার সংগ্রাম নিয়ে জনমত তৈরি করেন, তখন রাষ্ট্রযন্ত্র অনেক সময় তার নথিপত্রের দুর্বলতা খুঁজে বের করে তাকে স্তব্ধ করতে চায়।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এই ঘটনাটি আগামী দিনে ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী ইমিগ্রেশন পলিসির ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এভাবে ওয়ারেন্টহীন অভিযান চলতে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আমেরিকা আর পছন্দের গন্তব্য থাকবে না। সিটি কাউন্সিলের কড়া প্রতিবাদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি লড়াই প্রমাণ করে যে, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন ‘অভিবাসন’ ইস্যুটি সবচেয়ে বড় ফাটল হয়ে দাঁড়িয়েছে।