মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর গত শুক্রবার এক বিস্ফোরক ঘোষণায় জানিয়েছে যে, তারা ইসরায়েলকে ৬.৫ বিলিয়ন ডলারেরও (প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা) বেশি মূল্যের সমরাস্ত্র সহায়তা পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এই বিশাল প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক ‘অ্যাপাচি’ অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং সাঁজোয়া যুদ্ধযান। তবে সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হলো, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নেতৃত্বাধীন পররাষ্ট্র দপ্তর এই অস্ত্র পাঠানোর ক্ষেত্রে মার্কিন কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের বাধ্যতামূলক পর্যালোচনা প্রক্রিয়া বা ‘কংগ্রেসনাল রিভিউ’ সরাসরি লঙ্ঘন বা বাইপাস করেছে।
২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এটি তৃতীয়বার যখন ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের তোয়াক্কা না করেই ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়ার জন্য জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে হোয়াইট হাউস স্পষ্ট করে দিল যে, মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে তারা আইনসভার কোনো খবরদারি সহ্য করবে না।
কী কী থাকছে এই বিশাল সমরাস্ত্র প্যাকেজে?
পররাষ্ট্র দপ্তর এই অস্ত্র পাঠানোর বিষয়টিকে চারটি পৃথক ‘কেস’ বা ভাগে বিভক্ত করেছে। এই প্যাকেজের প্রধান আকর্ষণ ও ব্যয়বহুল অংশগুলো হলো:
অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার: ৩.৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই হেলিকপ্টারগুলো ইসরায়েলের বিমান সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
জেএলটিভি (JLTV): প্রায় ১.৯৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ‘জয়েন্ট লাইট ট্যাকটিক্যাল ভেহিকল’, যা মূলত বিখ্যাত হামভি (Humvee)-এর আধুনিক ও শক্তিশালী সংস্করণ।
এডব্লিউ-১১৯ কোয়ালা: হালকা ওজনের বিশেষ হেলিকপ্টার।
সাঁজোয়া যানের পাওয়ার প্যাক: আমর্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ারের জন্য শক্তিশালী ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ।
কংগ্রেসের ক্ষোভ ও সাংবিধানিক বিতর্ক
মার্কিন নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো বড় ধরনের অস্ত্র বিক্রির আগে প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটি এবং সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডেমোক্র্যাট সদস্যরা অভিযোগ করেছেন যে, তাদের কোনো উত্তর না দিয়েই এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নিউ ইয়র্কের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, “ঘোষণার মাত্র এক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প প্রশাসন আমাকে জানায় যে তারা বছরের পর বছর ধরে চলে আসা সংসদীয় রীতি উপেক্ষা করে ৬ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির বিজ্ঞপ্তি জারি করবে। এটি কংগ্রেসের সাংবিধানিক তদারকি ভূমিকার ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরও একটি নগ্ন আঘাত।”
গাজা পরিস্থিতি ও মানবিক সংকট
এই অস্ত্র পাঠানোর খবরটি এমন এক সময়ে এল যখন গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী (যাকে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাও সঠিক বলে স্বীকার করেছে), ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা এই যুদ্ধে নিহতের বিশাল অংশই নারী ও শিশু।
যদিও গত অক্টোবরে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তবে ইসরায়েল গাজায় নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সমালোচকরা অভিযোগ করছেন যে, মার্কো রুবিও ও ট্রাম্প প্রশাসন জেনেভ কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে একটি ‘গণহত্যা’ চলমান রাখতে সহায়তা করছে।
সৌদি আরবের জন্য ৯ বিলিয়ন ডলারের মিসাইল
একই দিনে পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবের জন্যও ৯ বিলিয়ন ডলারের ইন্টারসেপ্টর মিসাইল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। এটি মূলত মার্কিন প্রযুক্তির ‘প্যাট্রিয়ট’ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের জন্য ব্যবহৃত হবে। সৌদি আরব বর্তমানে মার্কিন অস্ত্রের বৃহত্তম ক্রেতা। তবে ইয়েমেন যুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ডের কারণে অনেক ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা সৌদিকে অস্ত্র দেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি?
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন খুব দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে এই অস্ত্রগুলো পাঠাতে চাইছে কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানকে সরাসরি আক্রমণের হুমকি দিয়েছেন। ইরান যদি পাল্টা আঘাত করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের পার্টনার দেশগুলো এবং সেখানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে রক্ষা করতেই এই দ্রুতগতিতে আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সাঁজোয়া যান পাঠানো হচ্ছে। শুক্রবার বিকেল ৫টার পর (অফিস টাইম শেষ হওয়ার পর) এই ঘোষণা দেওয়া হয়, যাতে সংবাদমাধ্যম ও বিরোধীদের নজরের বাইরে থাকা যায়।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এই নাটকীয় পরিবর্তন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন:
১. গণতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ সংকট: কংগ্রেসকে বাইপাস করার এই প্রবণতা মার্কিন গণতন্ত্রের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আইনসভাকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহী বিভাগের এই স্বেচ্ছাচারিতা ভবিষ্যতে বিপজ্জনক নজির হয়ে থাকবে।
২. মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা: ইসরায়েল ও সৌদিকে একযোগে এত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র দেওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হবে। এটি শান্তি প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার বদলে ইরান ও তার মিত্রদের আরও বেশি উসকে দিতে পারে।
৩. মানবিক দায়বদ্ধতার অভাব: ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু সত্ত্বেও কোনো শর্ত ছাড়াই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র পাঠানো প্রমাণ করে যে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন মানবাধিকারের চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
৪. কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের সুযোগ হারানো: ডেমোক্র্যাটদের দাবি ছিল, অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত রেখে নেতানিয়াহু সরকারকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করা। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন আগ বাড়িয়ে অস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলের ওপর থেকে সেই লিভারেজ বা চাপের সুযোগটি নষ্ট করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ কেবল একটি অস্ত্র চুক্তি নয়, বরং মার্কিন শাসনব্যবস্থার দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের ওপর বড় ধরনের আঘাত। কংগ্রেসের তদারকি ভূমিকাকে পাশ কাটিয়ে এভাবে কয়েক বিলিয়ন ডলারের মারণাস্ত্র পাঠানোর সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, হোয়াইট হাউস এখন বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে কোনো ধরণের আইনি জবাবদিহিতার তোয়াক্কা করছে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুক্রবার অফিস সময়ের শেষে এই ঘোষণা দেওয়ার কৌশলটি ছিল মূলত জনরোষ এবং মিডিয়া ট্রায়াল এড়ানোর একটি সচেতন প্রচেষ্টা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মতো বিতর্কিত ক্ষেত্রে এভাবে শর্তহীন অস্ত্র সরবরাহ আমেরিকার তথাকথিত 'মানবাধিকার' ও 'নৈতিক অবস্থান'কে বিশ্বদরবারে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে, যা মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত প্রশমনের বদলে নতুন করে অস্থিরতা উসকে দিতে পারে।