মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন করে চাপে ফেলেছে। তেলের মজুত কমে আসায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো এখন বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে তৎপর হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা এখন প্রায় তলানিতে পৌঁছেছে।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের অবরোধের কারণে বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
আঞ্চলিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বিশ্লেষক আহমেদ হেলাল জানিয়েছেন, জ্বালানির মজুত কমে যাওয়ায় অনেক দেশ এখন জরুরি সংরক্ষিত মজুতের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। বৈশ্বিকভাবে অতিরিক্ত সরবরাহের সক্ষমতাও সীমিত হয়ে এসেছে।
গত মার্চে হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার পর সৌদি আরব তাদের তেল রপ্তানির বড় অংশ লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে স্থানান্তর করে। বর্তমানে দেশটি সেখান থেকে মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি করছে। তবে বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের অবরোধের কারণে সেই রপ্তানি ব্যবস্থাও এখন চাপে পড়েছে।
এতদিন বাব এল-মান্দেব প্রণালিকে এশিয়ার জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বিপুল পরিমাণ তেল এই জলপথ ব্যবহার করে পৌঁছাত। কিন্তু সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
হরমুজ সচলে ওমানের নতুন উদ্যোগ
এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালি এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এই প্রণালিকে ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আপাতত কমে এলেও সমাধান এখনও দূরে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ওমান একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলো স্বেচ্ছাভিত্তিতে একটি ফি প্রদান করতে পারবে, যা নৌ-নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ব্যবহার করা হবে। এ উদ্যোগে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের সমর্থনও রয়েছে বলে জানা গেছে।
ওমানের প্রস্তাবে ইরানকে একক নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার কথা বলা হয়নি। বরং এটি মালাক্কা প্রণালির মডেলে পরিচালনার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে নৌচলাচলের নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য স্বেচ্ছা অনুদানের ব্যবস্থা রয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, তারা ওমানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পরিচালনায় আগ্রহী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, বাধ্যতামূলকভাবে কোনো ফি আরোপ আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের মতে, যুদ্ধের আগে যেমন প্রণালিটি অবাধে ব্যবহার করা যেত, সেই অবস্থায় ফিরে যাওয়াই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে
এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও জোরদার হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি আরব ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।
ফোনালাপে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংকট নিরসনে সহযোগিতা এবং যৌথ কূটনৈতিক উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেই সংকট লোহিত সাগর অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।