আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক : • প্রকাশিত: ২০ জুন ২০২৫, ০৮:৫০ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ইসরায়েল ইরান সংঘাত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সংকটপূর্ণ হতে যাচ্ছে

ইসরায়েল ইরান সংঘাত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সংকটপূর্ণ হতে যাচ্ছে

ইসরায়েল-ইরান বিমানযুদ্ধ এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে, এবং উভয়পক্ষই পাল্টা-পাল্টি হামলায় নিযুক্ত রয়েছে। পরিস্থিতি মুহূর্তে মুহূর্তে বদলাচ্ছে, কিন্তু সংঘাত থামার কোনো ইঙ্গিত নেই। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক বিমান হামলায় ইরানের পরমাণু এবং ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো- যেমন আরাক, নাতানজ, ইসফাহান এবং বুশেহরের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো- লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলের লক্ষ্য স্পষ্ট: ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সামরিক অবকাঠামোকে বিপর্যস্ত করে ইরানি নেতৃত্বের ভিত্তি নাড়িয়ে দেওয়া। ইরান এর পাল্টায় ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে একের পর এক ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যেখানে আবাসিক এলাকা এবং হাসপাতাল পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে বিয়েরশেবায় সোরোকা মেডিকেল সেন্টারে ইরানি হামলায় বহু রোগী এবং স্বাস্থ্যকর্মী আহত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে আলোড়ন তুলেছে।

দুই দেশেরই মানবিক ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ। ইরানে অন্তত ৬৫৭ জন নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে বিপ্লবী গার্ডস বাহিনীর সিনিয়র কমান্ডার এবং পরমাণু বিশেষজ্ঞরাও রয়েছেন। আহতের সংখ্যা দুই শতাধিক। ইসরায়েলে অন্তত ২৪ জন নিহত এবং ২৪০ জনের বেশি আহত হয়েছে ইরানি হামলায়। ইরানের ভেতরে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা এবং মিডিয়া ব্ল্যাকআউট চলছে, যার মাধ্যমে সরকার তাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।

এদিকে, আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানি একসঙ্গে জেনেভায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। তারা ইসরায়েলের হামলা বন্ধের শর্তে পরমাণু আলোচনায় ইরানকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ পরিস্থিতি নিয়ে দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছেন। একদিকে তিনি ইসরায়েলকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছেন, অন্যদিকে তিনি ইরানের ফোরদো পরমাণু কেন্দ্রে সরাসরি হামলার আগে দুই সপ্তাহের বিরতি ঘোষণা করেছেন, যেন নতুন করে লিবিয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়। হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েলের প্রতিটি হামলার আগেই অবগত থাকছে এবং মিসাইল প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় প্রস্তুত রয়েছে।

চীন এবং রাশিয়ার অবস্থানও তাৎপর্যপূর্ণ। তারা ইসরায়েলের বিমান হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে নিন্দা করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ এবং আরব লীগও নাগরিক প্রাণহানি এড়াতে উভয় পক্ষকে সংযমী হওয়ার অনুরোধ করেছে। তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিজবুল্লাহকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যেন তারা ইরানের পক্ষে এই যুদ্ধে না জড়ায়।

এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিমধ্যেই ভয়াবহ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানির দাম বাড়ছে। বাংলাদেশ, ভারতসহ অনেক আমদানিনির্ভর অর্থনীতিকে নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে এই উত্তেজনা। একইসঙ্গে ইরান এবং ইসরায়েলের যুদ্ধ ব্যয়ও চরমে পৌঁছেছে- ইসরায়েলের দৈনিক খরচ শত শত মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, ইরানের অবকাঠামো এবং জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

সর্বশেষ পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামী কয়েক সপ্তাহ উভয় পক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য সংকটপূর্ণ হতে যাচ্ছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বড় কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে এই যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়বে এবং এর প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও ফেলবে এক অমোচনীয় ছাপ।