প্রকাশিত: ২৪ জুন ২০২৫, ০৫:৪৫ পিএম • অনলাইন সংস্করণ

ইসরায়েলের সৃষ্টির মূল লক্ষ্যই মুসলমানদের অস্থির রাখা

ইসরায়েলের সৃষ্টির মূল লক্ষ্যই মুসলমানদের অস্থির রাখা

বিশ্ব ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায় হলো মধ্যপ্রাচ্যের প্রাণকেন্দ্রে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম, যা মুসলিম বিশ্বের অস্থিরতা ও বিভাজন সৃষ্টির এক সুপরিকল্পিত পশ্চিমা প্রকল্পের বাস্তবায়ন। এর নেপথ্যে যে কূটচাল, ইতিহাস ও রাজনীতি লুকিয়ে রয়েছে, তা অনুধাবন করা মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যাবশ্যক।

ইসরায়েলের জন্মের পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক লন্ডনের ষড়যন্ত্রের ছায়া। ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা (Balfour Declaration) ছিল সেই সূচনা বিন্দু, যেখানে ব্রিটিশ সরকার প্রথমবার ফিলিস্তিন ভূমিতে ইহুদি জাতির জন্য “জাতীয় আবাসভূমি” গঠনের কথা ঘোষণা করে¹। অথচ তখন ফিলিস্তিন ছিল শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমান ও খ্রিস্টান অধিবাসীদের ভূখণ্ড²। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়লে ফিলিস্তিনকে ম্যান্ডেট শাসনের নামে দখলে নেয় ব্রিটেন, আর জায়নিস্টদের জন্য বসতি গড়ার পথ সুগম করে।

১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম ঘটে নাকবা বা মহাবিপর্যয়ের মাধ্যমে- যেখানে প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনি নিজভূমি থেকে বিতাড়িত হন³। তাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, আর ইহুদি অভিবাসীদের জন্য নতুন নগরী-গ্রাম গড়ে তোলা হয়।

ইসরায়েলের জন্মলগ্ন থেকেই এটি মুসলিম বিশ্বের জন্য স্থায়ী অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭ এবং ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধগুলো এই অশান্তির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বিশেষত ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা, জেরুজালেমের পুরনো শহর, গোলান মালভূমি দখল করে নেয়⁴। মুসলিম উম্মাহর আত্মমর্যাদা, ঐক্য ও স্থিতি চূর্ণ হয়।

পশ্চিমা শক্তির অন্ধ সমর্থন ইসরায়েলকে পরিণত করেছে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী আগ্রাসী রাষ্ট্রে। ১৯৪৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি⁵। জাতিসংঘে ইসরায়েলের নিন্দা প্রস্তাবগুলো একের পর এক যুক্তরাষ্ট্র ভেটো করেছে⁶। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো মানবাধিকারের বুলি আওড়ালেও ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য ও অস্ত্র চুক্তি জারি রেখেছে।

আজকের দিনে ইসরায়েল শুধু মুসলমানদের নয়, বিশ্বশান্তিরও প্রধান অন্তরায়। গাজায় ঘন ঘন গণহত্যা, লেবাননে আগ্রাসন, সিরিয়া ও ইরানে গুপ্ত হামলা, জেরুজালেমের ইসলামী নিদর্শনগুলোতে আক্রমণ- সবই ইসরায়েলের দৈনন্দিন নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিশ্বে সামরিক শাসন, গৃহবিভাজন ও উগ্রবাদ জন্ম নিয়েছে। এই অস্থিরতা মুসলিম উম্মাহকে ব্যস্ত রেখেছে আত্মরক্ষার সংগ্রামে, আর পশ্চিমা বিশ্ব তার প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি দিয়ে প্রভাব বিস্তার করে গেছে।

ইসরায়েলের সৃষ্টি মুসলিম বিশ্বের হৃদয়ে বসানো এক বিষফোড়া, যা পশ্চিমা বিশ্বের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের ফসল। একে মোকাবিলা করতে হলে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, প্রযুক্তি-অর্থনীতিতে স্বনির্ভরতা, এবং ইসলামী মূল্যবোধে পুনর্জাগরণ অপরিহার্য। মুসলিম উম্মাহকে চেতন হতে হবে- ফিলিস্তিনের মুক্তি কেবল ফিলিস্তিনিদের দায়িত্ব নয়; এটি সমগ্র মুসলিম জাতির মর্যাদার লড়াই।

উৎস ও পাদটীকা

¹ Balfour Declaration, 1917 - The British Government’s letter expressing support for a “national home for the Jewish people” in Palestine.

² Khalidi, R. (2006). The Iron Cage: The Story of the Palestinian Struggle for Statehood. Beacon Press.

³ Pappé, I. (2006). The Ethnic Cleansing of Palestine. Oneworld Publications.

⁴ Shlaim, A. (2000). The Iron Wall: Israel and the Arab World. W. W. Norton & Company.

⁵ Congressional Research Service (2023). U.S. Foreign Aid to Israel.

⁶ United Nations Security Council Records, multiple resolutions vetoed by USA regarding Israeli actions