এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৫ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চীন সবসময় তেহরানের পাশে থাকবে: চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চীন সবসময় তেহরানের পাশে থাকবে: চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন বারুদ আর লাশের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে, তখন তেহরানের প্রতি প্রকাশ্য ও নিঃশর্ত সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এশিয়ার পরাশক্তি চীন। গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের মৃত্যুর খবরে যখন পুরো অঞ্চল টালমাটাল, ঠিক তখনই বেইজিংয়ের এই কড়া অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।

টেলিফোনে দৃঢ় বার্তা: ‘বেইজিং তেহরানের পাশে’

সোমবার এক বিশেষ ফোনালাপে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে বেইজিংয়ের পূর্ণ সমর্থনের নিশ্চয়তা দেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, ওয়াং ই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, "ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় চীন সবসময় তেহরানের পাশে থাকবে।"

ওয়াং ই এই সামরিক অভিযানকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে একে ‘জঙ্গলের আইন’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, কোনো শক্তিশালী দেশ তাদের সামরিক পেশিশক্তি ব্যবহার করে অন্য একটি স্বাধীন দেশের ওপর এভাবে যথেচ্ছ হামলা চালাতে পারে না।

কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ: ফ্রান্স ও ওমানের সাথে আলোচনা

একই দিনে ওয়াং ই কেবল ইরানের সাথেই নয়, বরং ওমান এবং ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও পৃথকভাবে কথা বলেন। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির সঙ্গে আলাপকালে তিনি মাস্কাটের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। অন্যদিকে, ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোটের সঙ্গে ফোনালাপে তিনি কূটনৈতিক পথে সংকট সমাধানের ওপর জোর দেন।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন মধ্যপ্রাচ্যে কেবল একটি অর্থনৈতিক শক্তি নয়, বরং একটি প্রধান রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।

রণক্ষেত্রের চিত্র: নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫০০

ইরানি রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া তথ্যমতে, গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫৫ জনে। হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে তেহরান, ইসফাহান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

এর জবাবে ইরানও দমে থাকেনি। তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই পাল্টা হামলায় চার মার্কিন সেনা নিহত এবং আরও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

কেন এই মুহূর্তে চীনের এই অবস্থান?

প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:

১. জ্বালানি নিরাপত্তা: ইরানের তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা চীন। ইরানে অস্থিরতা মানেই চীনের জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটা।

২. মার্কিন আধিপত্য রোধ: ওয়াশিংটন যদি মধ্যপ্রাচ্যে এককভাবে সফল হয়, তবে তা দক্ষিণ চীন সাগরেও বেইজিংয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

৩. আঞ্চলিক প্রভাব: সৌদি-ইরান চুক্তিতে মধ্যস্থতা করার পর চীন এখন প্রমাণ করতে চায় যে তারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বিপদে সবচেয়ে বড় বন্ধু।

ভবিষ্যৎবাণী: কোন দিকে যাচ্ছে বিশ্ব?

ওয়াং ই সতর্ক করে বলেছেন, "দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ কারও স্বার্থ রক্ষা করবে না।" তবে খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা এবং আইআরজিসি (IRGC)-র প্রতিক্রিয়া কী হবে, তার ওপর নির্ভর করছে পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ। এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘এপিক ফিউরি’ অভিযান যদি আরও বিস্তৃত হয়, তবে চীন ও রাশিয়ার সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।