ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় বইছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন এবং ইসরায়েলি মহলে একে একটি 'মিশন সফল' বা বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই উল্লাসের অন্তরালে কি ইরান সত্যিই এক নতুন সংকটে পড়তে যাচ্ছে, নাকি তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি যে ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না?
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এবং রাজনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান কেবল একজন ব্যক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং এটি একটি সুসংগঠিত সাংবিধানিক ব্যবস্থার ফসল।
পশ্চিমা উল্লাস বনাম তেহরানের বাস্তবতা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ অভিযানে খামেনির মৃত্যুর পর মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের বিজয়োৎসব লক্ষ্য করা গেছে। ট্রাম্প এবং তার মিত্ররা মনে করছেন, "সন্ত্রাসের মাদারশিপ" ডুবে যাচ্ছে এবং তাদের প্রধান অধিনায়ক এখন মৃত। তাদের ধারণা, খামেনির অবর্তমানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন অনিবার্য।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর এই ধারণা ইরানের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর প্রকৃত রূপ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি একটি স্বয়ংচালিত পদ্ধতি বা সিস্টেম। ইরানের সংবিধানে এমন পরিস্থিতির জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে, যা জনগণের সম্মতিতে দুটি জাতীয় গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত।
সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ: ক্ষমতার অন্তর্বর্তীকালীন বিন্যাস
আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পরপরই কার্যকর হয়েছে ইরানের সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হলে একটি অস্থায়ী তিন সদস্যের কাউন্সিল রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই কাউন্সিলে রয়েছেন:
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান: যিনি নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
গোলাম হোসেন মহসেনি এজেয়ি: ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান।
আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি: ১২ সদস্যের গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন প্রভাবশালী সদস্য।
এই কাউন্সিল ততক্ষণ পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করবে যতক্ষণ না অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস (Assembly of Experts) বসে নতুন একজন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করছে। সংবিধান অনুযায়ী এই প্রক্রিয়াটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।
উত্তরাধিকার প্রশ্নে ধোঁয়াশা: কে হবেন পরবর্তী কাণ্ডারি?
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর প্রথমবারের মতো অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস বসে নতুন নেতা নির্বাচন করেছিল। দীর্ঘ সময় পর আবারও ইরান সেই একই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। যদিও খামেনি প্রকাশ্যে কোনো উত্তরসূরি মনোনীত করে যাননি, তবুও কিছু নাম রাজনৈতিক মহলে জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন:
মোহাম্মদ মাহদি মিরবাঘেরি: একজন কট্টরপন্থী এবং প্রভাবশালী ধর্মীয় পণ্ডিত।
আলিরেজা আরাফি: যিনি বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলের সদস্য।
হাশেম হোসেনি বুশেহরি: ধর্মীয় মহলে যার গভীর প্রভাব রয়েছে।
তবে প্রশ্ন হলো, এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটি কতটুকু দ্রুত এবং নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে। সংবিধান অনুযায়ী, যদি অ্যাসেম্বলি কোনো যোগ্য একক নেতা খুঁজে না পায়, তবে তাদেরই একজন সদস্যকে এই পদের জন্য নির্বাচিত করা হতে পারে।
‘ডিপ স্টেট’ এবং আইআরজিসি (IRGC)-এর ভূমিকা
ইরানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার বাইরেও একটি অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা কেন্দ্র কাজ করে, যাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা 'ডিপ স্টেট' (Deep State) হিসেবে অভিহিত করেন। এই ডিপ স্টেটের মূল শক্তি হলো ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর এলিট সদস্যরা।
তেহরানে ব্যাপক বোমাবর্ষণ এবং মার্কিন হামলার মুখেও ইরানের কমান্ড স্ট্রাকচার বা শাসন কাঠামোর ভেঙে না পড়া প্রমাণ করে যে তারা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল। এমনকি খামেনির মৃত্যুর পরপরই আঞ্চলিক দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলা এটাই ইঙ্গিত দেয় যে তাদের অপারেশনাল সক্ষমতা এখনও অটুট।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দলত্যাগের আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত আইআরজিসি বা রাষ্ট্রের শীর্ষ মহলে কোনো ফাটল বা দলত্যাগের খবর পাওয়া যায়নি। বরং ইরানের অভ্যন্তরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভূ-রাজনীতি ও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ
আমেরিকা এবং ইসরায়েল বর্তমানে 'টার্গেটেড কিলিং' বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হত্যার যে নীতি গ্রহণ করেছে, তা কতদূর সফল হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন তিনি ইরানের সাথে কথা বলতে চান, কিন্তু প্রশ্ন হলো কার সাথে এবং কখন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং পর্যবেক্ষকদের মতে, আমেরিকা ও ইসরায়েল যদি মনে করে একের পর এক নেতা হত্যা করে তারা ইরানি শাসনব্যবস্থাকে বদলে ফেলবে, তবে তারা ভুল করছে। গত কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরও ইরানে 'রেজিম চেঞ্জ' বা শাসন পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি সামরিক সংঘাত নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক ও সাংগঠনিক লড়াই। আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু পশ্চিমা বিশ্বের জন্য একটি বড় অর্জন হতে পারে, কিন্তু তেহরানের জন্য এটি কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। ইরানের সংবিধানে ক্ষমতা হস্তান্তরের যে নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তা এই রাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকতে সাহায্য করছে।
পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন এবং তিনি খামেনির 'মোজাইক প্রতিরক্ষা' নীতি কতটুকু কঠোরভাবে পালন করবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ। তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিত যে, তেহরানের ক্ষমতার চাকা থামেনি; বরং এক জটিল মোড় পার হচ্ছে।