ইজরায়েল কর্তৃক পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত রাষ্ট্রসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা আনরোয়ার সদর দপ্তর গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় বইছে। সম্প্রতি বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, জাপান, নরওয়ে, পর্তুগাল, স্পেন এবং যুক্তরাজ্য—এই ১১টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে ইজরায়েলের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক রীতিনীতির চরম লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন। বুধবার প্রকাশিত এই বিবৃতিতে তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, রাষ্ট্রসংঘের একটি স্বীকৃত সংস্থার ওপর এ ধরনের হামলা নজিরবিহীন এবং এটি সংস্থার কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করার একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা। তারা ইজরায়েল সরকারকে অবিলম্বে সব ধরনের উচ্ছেদ ও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
গাজায় চলমান সংঘাতের আবহে আনরোয়ার ওপর ইজরায়েলের এই চাপ সৃষ্টি নতুন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘকাল ধরে এই সংস্থাটি ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা নিশ্চিত করে আসছে। কিন্তু ইজরায়েল সরকার এবং তার ঘনিষ্ঠ মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ করে আসছে যে আনরোয়ার সঙ্গে হামাসের যোগসূত্র রয়েছে। রাষ্ট্রসংঘ এই অভিযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করলেও ইজরায়েল তা মানতে নারাজ। উল্টো তারা এই অভিযোগকে পুঁজি করে গাজায় ত্রাণ তৎপরতা সীমিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, গাজার মতো বিপর্যস্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার জন্য আনরোয়ার বিকল্প অন্য কেউ নেই।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৪ সালের শেষের দিকে, যখন ইজরায়েলের পার্লামেন্টে একটি আইন পাস করা হয় যার মাধ্যমে ইজরায়েলি নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলোতে আনরোয়ার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে এই নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার জন্য নতুন কিছু সংশোধনী আনা হয়। রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছেন। গত সপ্তাহে আনরোয়া রিপোর্ট করে যে, ইজরায়েলি আইনপ্রণেতাদের উপস্থিতিতেই দেশটির বাহিনী তাদের সদর দপ্তরে ঢুকে ভবনগুলো ভাঙতে শুরু করে। আনরোয়া প্রধান ফিলিপ লাজারিনি একে আন্তর্জাতিক আইনের চরম অবমাননা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রসংঘের সদস্য দেশ হিসেবে ইজরায়েলের দায়িত্ব সংস্থার পবিত্রতা রক্ষা করা, তা ধ্বংস করা নয়।
লাজারিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইজরায়েলের এই আগ্রাসন ২০২৫ সালের অক্টোবরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা আইসিজের দেওয়া রায়ের সম্পূর্ণ বিরোধী। ওই রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে বলেছিল যে ইজরায়েল আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আনরোয়ার কাজে বাধা দিতে পারে না এবং সংস্থাটির ত্রাণ কাজ সহজতর করতে বাধ্য। আদালত আনরোয়াকে গাজার জন্য একটি অপরিহার্য ত্রাণ সরবরাহকারী সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে যে, ইজরায়েল আদালতের সেই নির্দেশনাকে তোয়াক্কা করছে না। ১১টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তাদের বিবৃতিতে আরও জানান যে, আনরোয়া শুধু গাজায় নয় বরং পুরো অঞ্চল জুড়েই কোটি কোটি ফিলিস্তিনির শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের একমাত্র ভরসা। তারা আরও বলেন যে গাজার পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৬৬০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
এই পুরো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, আনরোয়ার সদর দপ্তর ধ্বংস করা কেবল একটি অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর ওপর এক সরাসরি আঘাত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইজরায়েল পরিকল্পিতভাবে এমন একটি সংস্থাকে অকার্যকর করতে চাইছে যা ফিলিস্তিনিদের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন হিসেবে কাজ করে। ১১টি প্রভাবশালী দেশের এই যৌথ প্রতিবাদ ইঙ্গিত দেয় যে, পশ্চিমাবিশ্বের মিত্রদের মধ্যেও ইজরায়েলের একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। আইসিজের সুস্পষ্ট রায় এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করায় ইজরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি এখনই ত্রাণ সরবরাহ স্বাভাবিক না করা হয় এবং রাষ্ট্রসংঘের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে যা বিশ্বশান্তির জন্য চরম হুমকি।