মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) সংস্থায় বড় ধরনের রদবদলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশজুড়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয়ের কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এ বিষয়ে অবগত তিনজন ব্যক্তি।
এই পদক্ষেপের পেছনে কারণ হিসেবে হোয়াইট হাউস ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দফতরের অসন্তুষ্টিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশিত এক বছরের মধ্যে ১০ লাখের বেশি অভিবাসী বহিষ্কারের লক্ষ্য পূরণে সংস্থাটির অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীরগতির হওয়ায় এই রদবদলের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে সূত্রগুলো জানায়, প্রায় অর্ধডজন আঞ্চলিক পরিচালকের পদে পরিবর্তন আনতে যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
প্রস্তাবিত এ রদবদল দেখায় যে, অভিবাসনবিরোধী নীতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান পূরণে প্রশাসন এখনো মরিয়া। যদিও প্রেসিডেন্ট ও তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টারা দাবি করছেন, তারা সীমান্ত সুরক্ষা এবং অভিবাসী বহিষ্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেল জ্যাকসন রদবদলের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে বলেন, “প্রেসিডেন্টের পুরো দল তাঁর নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করছে, এবং সীমান্ত সুরক্ষা থেকে শুরু করে অপরাধী অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কারে অর্জিত সাফল্য নিজেরাই প্রমাণ।”
বর্তমানে দেশজুড়ে দুই ডজনের বেশি আইসিই ফিল্ড অফিস পরিচালক আছেন, যারা বহিষ্কার কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান করেন। প্রতিটি অঞ্চলের আওতা বিশাল, কখনো কখনো একাধিক অঙ্গরাজ্য বা উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার মতো বড় অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত থাকে।
এই আঞ্চলিক পরিচালকরা আইসিই–এর গ্রেপ্তার অভিযান বাড়াতে প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছেন। সংস্থাটি ইতিমধ্যে তার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও শীর্ষ বহিষ্কার কর্মকর্তাদের দুই দফায় সরিয়ে দিয়েছে।
আইসিই–এর সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা ক্লেয়ার ট্রিকলার-ম্যাকনাল্টি বলেন, “কর্মীরা ক্রমাগত হুমকির মধ্যে কাজ করছেন; তাদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে ফেলা হয়েছে; পুরো সংস্থায় একধরনের ভয় ও অনিশ্চয়তার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।”
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দফতর জানিয়েছে, ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪ লাখেরও বেশি অভিবাসীকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং বছরের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা ৬ লাখে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে। তবে এই হিসাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। প্রশাসন সীমান্তে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদেরও “বহিষ্কৃত” হিসেবে গণনা করছে, যদিও তারা যুক্তরাষ্ট্রে কখনো বসবাসই করেননি।
বছরের শুরুতে ট্রাম্পের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার ওয়াশিংটনে আইসিই–এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে গ্রেপ্তারের গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেন। পরে তিনি ফক্স নিউজে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সংস্থাটি প্রতিদিন ৩,০০০ অভিবাসী গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে কাজ করবে।
তার বক্তব্যের পর গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়লেও আইসিই এখনও প্রতিদিন ৩,০০০ জনকে আটক করার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ১,০০০ জনের মতো অভিবাসী গ্রেপ্তার হচ্ছে।
আইসিই–এর অভিযানগুলো সময়সাপেক্ষ ও জটিল। সংস্থাটি সাধারণত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে অভিযান চালায়, যাতে নিরপরাধ লোকেরা ধরা না পড়ে। ফলে সীমিত সম্পদ ও নজরদারির কারণে উচ্চমাত্রার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটির মুখপাত্র ট্রিশিয়া ম্যাকলাফলিন বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং সহিংস অপরাধী অবৈধ অভিবাসীদের দেশ থেকে অপসারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এখন পর্যন্ত কোনো জনবলের পরিবর্তন হয়নি, এবং ঘোষণার মতো কিছু নেই।”
আইসিই কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৬০,০০০–এর বেশি অভিবাসী আইসিই হেফাজতে রয়েছেন, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। সম্প্রতি গৃহীত অভ্যন্তরীণ নীতিমালায় সংস্থাটির বাজেট বেড়ে ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং ১ লাখের বেশি অভিবাসীকে আটক রাখার সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
তবে আইসিই–এর গ্রেপ্তার অভিযান কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বর্ডার পেট্রোল কর্মকর্তারা এখন অভিবাসনবিরোধী তৎপরতায় আরও বেশি ভূমিকা নিচ্ছেন। তারা বড় দোকান ও আবাসিক এলাকায় অভিযান চালাচ্ছেন, যেমন শিকাগোর এক বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে পরিচালিত সাম্প্রতিক অভিযানে দেখা গেছে। অন্যদিকে, আইসিই এখনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
নতুন রদবদলের পরিকল্পনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি পূরণে প্রশাসন যে এখনও চাপের মুখে রয়েছে— তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তথ্যসূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস