এখন সময় ডেস্ক • প্রকাশিত: ৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:০৫ এ এম • অনলাইন সংস্করণ

অ্যালবার্টা সংকট: ট্রাম্পের বিস্তারবাদ ও কানাডার সার্বভৌমত্ব

অ্যালবার্টা সংকট: ট্রাম্পের বিস্তারবাদ ও কানাডার সার্বভৌমত্ব

উত্তর আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যেন তারা কানাডার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে এবং দেশটির সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানায়। সম্প্রতি প্রকাশিত চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য অনুযায়ী, কানাডার তেল-সমৃদ্ধ প্রদেশ অ্যালবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একাধিক গোপন বৈঠক হয়েছে। এই ঘটনা অটোয়া ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে।

গোপন বৈঠক এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস'-এর এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা 'অ্যালবার্টা প্রসপারিটি প্রজেক্ট' (APP) নামক একটি গোষ্ঠীর সাথে অন্তত তিনবার বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। এই গোষ্ঠীটি কানাডা থেকে অ্যালবার্টার বিচ্ছিন্ন হওয়ার দাবিতে একটি গণভোট আয়োজনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চালিয়ে আসছে।

প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, যিনি নিজেও অ্যালবার্টার বাসিন্দা এবং এডমন্টনে বড় হয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার অটোয়াতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, "আমি মার্কিন প্রশাসনের কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা পাঠিয়েছি। আমরা আশা করি তারা কানাডার সার্বভৌমত্বকে পূর্ণ সম্মান জানাবে।" কার্নি আরও জানান যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে এই বিষয়টি উত্থাপন করেছেন।

ট্রাম্পের "৫১তম অঙ্গরাজ্য" তত্ত্ব ও মার্কিন উচ্চাকাঙ্ক্ষা

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কানাডাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের "৫১তম অঙ্গরাজ্য" হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচ্ছন্ন বা প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে আসছেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তার এই লক্ষ্য পুরো কানাডা নয় বরং নির্দিষ্টভাবে সম্পদশালী অ্যালবার্টা প্রদেশ।

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অ্যালবার্টার স্বাধীন চেতনার প্রশংসা করে বলেন, "অ্যালবার্টা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি স্বাভাবিক অংশীদার। তাদের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, কিন্তু কানাডিয়ান সরকার তাদের প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ করতে দিচ্ছে না। আমার মনে হয়, তাদের উচিত আমাদের (যুক্তরাষ্ট্রের) সাথে যুক্ত হওয়া।"

বেসেন্ট আরও ইঙ্গিত দেন যে, অ্যালবার্টার মানুষ সার্বভৌমত্ব চায় এবং সেখানে একটি গণভোটের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এই মন্তব্যের পরপরই APP-এর নেতা জেফরি রাথ জানান যে, তারা আগামী মাসে মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে আরেকটি বৈঠক করতে যাচ্ছেন, যেখানে অ্যালবার্টার স্বাধীনতার পর প্রাথমিক ব্যয় মেটানোর জন্য ৫০০ বিলিয়ন ডলারের একটি ক্রেডিট লাইনের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে।

অ্যালবার্টার ক্ষোভের কারণ: কেন এই বিচ্ছিন্নতাবাদ?

অ্যালবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদের শিকড় অনেক গভীরে। দশকের পর দশক ধরে অটোয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে এই প্রদেশের বিরোধ চলছে। বিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তেল ও গ্যাস সম্পদের ব্যবস্থাপনা।

১. অর্থনৈতিক বৈষম্য: ২০২৪-২৫ সালে কানাডার মোট জিডিপিতে অ্যালবার্টার অবদান ছিল ১৫ শতাংশ, যদিও সেখানে দেশের মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ বাস করে।

২. ইকুয়ালাইজেশন পেমেন্ট: কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার ধনী প্রদেশগুলো থেকে কর সংগ্রহ করে দরিদ্র প্রদেশগুলোর সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করে। অ্যালবার্টা এই তহবিলে বিশাল অংকের অর্থ দিলেও সেখান থেকে কোনো 'ইকুয়ালাইজেশন পেমেন্ট' পায় না, যা অনেক অ্যালবার্টিয়ানকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

৩. পরিবেশগত নীতিমালা: কেন্দ্রীয় সরকারের কার্বন ট্যাক্স এবং কঠোর পরিবেশগত আইনের কারণে অ্যালবার্টার জ্বালানি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে সেখানকার অধিবাসীদের ধারণা।

নব্য-সাম্রাজ্যবাদ ও উত্তর আমেরিকার নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

অ্যালবার্টার এই বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা এবং তাতে মার্কিন প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন সমর্থন কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং এটি উত্তর আমেরিকায় ট্রাম্প প্রশাসনের "আমেরিকা ফার্স্ট" নীতির একটি আগ্রাসী প্রতিফলন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই কৌশলটি গতানুগতিক কূটনীতি ছাড়িয়ে এক ধরণের "সম্পদ দখলকারী বিস্তারবাদে" রূপ নিয়েছে। গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব কিংবা ভেনিজুয়েলার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টার মতো অ্যালবার্টার প্রতি এই আগ্রহও মূলত জ্বালানি নিরাপত্তার ভূ-রাজনীতি।

কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার যখন জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কঠোর পরিবেশ নীতি গ্রহণ করছে, তখন ট্রাম্প প্রশাসন অ্যালবার্টার তেলকে সরাসরি মার্কিন পাইপলাইনে নিয়ে আসার প্রলোভন দেখিয়ে কানাডার ফেডারেল কাঠামোতে ফাটল ধরাতে চাইছে। এটি একদিকে যেমন কানাডার জাতীয় ঐক্যকে হুমকির মুখে ফেলছে, অন্যদিকে ন্যাটো জোটের দুই প্রধান সদস্যের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী আস্থার সংকট তৈরি করছে। যদি এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন কোনোভাবে আইনি বৈধতা পায়, তবে তা কেবল কানাডার মানচিত্রই বদলে দেবে না, বরং উত্তর গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্যের এক নতুন এবং বিপজ্জনক অধ্যায়ের সূচনা করবে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—অ্যালবার্টার অর্থনৈতিক ক্ষোভ প্রশমন করা এবং একই সাথে মার্কিন প্রভাব বলয় থেকে দেশের অখণ্ডতা রক্ষা করা।

কানাডার অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া: একতা বনাম বিচ্ছিন্নতা

অ্যালবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়ে কানাডার রাজনৈতিক অঙ্গন এখন দ্বিধাবিভক্ত। ব্রিটিশ কলম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড ইবি এই গোপন বৈঠকগুলোকে সরাসরি "রাষ্ট্রদ্রোহিতা" বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, "বিদেশি শক্তির কাছে গিয়ে নিজের দেশকে ভেঙে দেওয়ার সাহায্য চাওয়া রাষ্ট্রদ্রোহিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।"

অন্যদিকে, ওন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে অ্যালবার্টার বর্তমান প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ কিছুটা ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছেন। তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের "দানবীয়" হিসেবে দেখতে নারাজ। স্মিথ মনে করেন, অটোয়ার বিরুদ্ধে অ্যালবার্টার মানুষের ক্ষোভ অত্যন্ত যৌক্তিক। উল্লেখ্য যে, স্মিথ ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি মার-এ-লাগো ভ্রমণেও গিয়েছিলেন।

আইনি জটিলতা: ক্ল্যারিটি অ্যাক্ট (Clarity Act)

অ্যালবার্টা যদি গণভোটের মাধ্যমে আলাদা হতেও চায়, তবে পথটি সহজ নয়। কানাডার 'ক্ল্যারিটি অ্যাক্ট' অনুযায়ী, যেকোনো প্রদেশ আলাদা হতে চাইলে কেন্দ্রীয় সরকারকে নিশ্চিত হতে হবে যে, গণভোটের প্রশ্নটি স্বচ্ছ ছিল এবং একটি স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিচ্ছিন্নতার পক্ষে রায় দিয়েছে। এরপর ঋণ বণ্টন, সীমানা নির্ধারণ এবং আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হবে। সুতরাং, গণভোট আয়োজন করা সম্ভব হলেও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা অ্যালবার্টার জন্য এক দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ আইনি লড়াইয়ের বিষয়।