হোম » Democracy dies in darkness

Democracy dies in darkness

admin- Sunday, May 21st, 2017

রফিকুজজামান রুমান

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট সম্প্রতি দারুণ একটি স্লোগান নির্ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই দৈনিকটির ১৪০ বছরের ইতিহাসে কোনো অফিসিয়াল স্লোগান ছিল না। গত বছরেই পত্রিকাটির মালিকানার পরিবর্তন হলে নতুন স্লোগানটি সংযুক্ত হয়। তা হলোÑ ‘অন্ধকারে মরে যায় গণতন্ত্র (Democracy dies in darkness)।’

এটি এমন সময়ে করা হলো যখন যুক্তরাষ্ট্র তার ৪৫তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বেছে নিয়েছে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে এবং ক্ষমতায় আসার পর থেকেও নানা কৌতূহলোদ্দীপক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, গণমাধ্যমের সমালোচনা। সংবাদমাধ্যমের সমালোচনায় মুখর ট্রাম্প কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে যা খুশি তাই বলে যাচ্ছেন। সাংবাদিকেরা ‘অসৎ’,‘এরা আমেরিকার জনগণের শত্রু’সহ নানা তির্যক মন্তব্য করেছেন। অনেকেই মনে করেছিলেন, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকাটি ট্রাম্পকে উদ্দেশ করেই তাদের নতুন স্লোগান প্রণয়ন করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলোÑ এক বছর আগেই একটি সাক্ষাৎকারে এর নতুন মালিক, যিনি আমাজনডটকমেরও প্রতিষ্ঠাতা, জেফারি বেজোস এই স্লোগানের কথাগুলো বলেছিলেন। ২০১৬ সালের ১৮ মে এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন পোস্ট-এর নির্বাহী সম্পাদক মার্টিন ব্যারন। সেখানে কথা প্রসঙ্গে বেজোস বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি আমাদের অনেকেরই বিশ্বাস, অন্ধকারে মরে যায় গণতন্ত্র। তাই (গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য) কিছু প্রতিষ্ঠানকে (যেমনÑ গণমাধ্যম) আলো ছড়ানোর দায়িত্ব নিতে হয়।’ ধারণা করা হয়,

জেফারি বেজোসের এ কথা থেকেই ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের নতুন স্লোগানটি নেয়Ñ অন্ধকারে মরে যায় গণতন্ত্র। ‘অন্ধকারে মরে যায় গণতন্ত্র’ বেজোসের নিজের কথা নয়। কথাটি শুনেছেন ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক, বিখ্যাত অনুসন্ধানী প্রতিবেদক বব উডওয়ার্ডের কাছ থেকে। উডওয়ার্ড তার সর্বশেষ বই দ্য লাস্ট অব দ্য প্রেসিডেন্টস মেন নিয়ে ২০১৫ সালে একটি প্রেজেন্টেশন দেয়ার সময় কথাটি বলেছিলেন, যেখানে বেজোস উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ১৯৭২ সালে ‘ওয়াটেরগেট স্ক্যান্ডাল’ রিপোর্ট করে আমেরিকার ৩৭তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে পদত্যাগে বাধ্য করা উডওয়ার্ড জানান, Democracy dies in darkness ঠিক তার নিজের উক্তি নয়। এটি তিনি বেশ কয়েক বছর আগে একটি বিচারিক মতামতে শুনেছিলেন, যেখানে আমেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনী নিয়ে মতামত দেয়া হয়েছে। উডওয়ার্ড ওই বিচারপতির নাম মনে করতে পারেননি। উডওয়ার্ড আরো জানান, ‘এটা (অন্ধকারে মরে যায় গণতন্ত্র কথাটি) অনেক আগের ব্যাপার। এর মূল উদ্দেশ্য হলো এটা বলা যে, সরকারের কর্মকাণ্ডে গোপনীয়তা থাকা বিপজ্জনক।’ ইতোমধ্যে এ কথাটি বলা সেই বিচারপতির নাম জানা গেছে। তিনি হলেন ডেমোন জে কেইথ। তিনি ‘ওয়ারেন্ট ছাড়া কারো কথা রেকর্ড করা যাবে না’ মর্মে একটি রুল দিতে গিয়ে ওই কথাটি বলেছিলেন। যা হোক, শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন পোস্টে। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এ স্লোগানটি ব্যবহার করা হচ্ছে। অবশ্য স্লোগানটি করার প্রক্রিয়া সহজ ছিল না। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর একটি বিশেষজ্ঞ দল সম্ভাব্য আরো পাঁচ শ’ স্লোগান নিয়ে কাজ করেছিল। শেষ বিচারে টিকে যায় এ স্লোগানটিইÑ ‘অন্ধকারে মরে যায় গণতন্ত্র।’ ১৪০ বছরের ইতিহাসে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার কোনো অফিসিয়াল স্লোগান ছিল না। বিভিন্ন সময় তারা কিছু বাণিজ্যিক স্লোগান দিলেও পুরো পত্রিকার জন্য অফিসিয়াল স্লোগান এটাই প্রথম। ওয়াশিংটন পোস্ট যখন নতুন স্লোগান দিয়ে চার দিকে হইচই ফেলে দিয়েছে, বসে থাকেনি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নিউ ইয়র্ক টাইমসও। সাত বছরের মধ্যে এবারই প্রথম তাদের অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে ‘দ্য ট্রুথ’ নামে একটি বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। সেখানে বলা হয়, ‘সত্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। সত্য জানা কঠিন। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সত্য জানা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ এই কথামালা থেকেই নিউ ইয়র্ক টাইমসের নতুন স্লোগান নির্ধারিত হয়Ñ ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সত্য জানা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ (The truth is more important now than ever)।’

ওয়াশিংটন পোস্ট এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের এ দুটো স্লোগান কাকতালীয়ভাবে হলেও এমন সময়ে আলোড়ন তুলল, যখন বিতর্কিত ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এবং আমেরিকার গণতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই বিতর্কে লিপ্ত। আমেরিকার প্রথম সারির পত্রিকাগুলো ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট না করার জন্য প্রকাশ্যে প্রচারণা চালিয়েছিল। ওয়াশিংটন পোস্ট তো ২০ জন প্রতিবেদকই নিয়োজিত করেছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যাবতীয় তথ্য উদঘাটন করার জন্য। পোস্ট-এর সহযোগী সম্পাদক বব উডওয়ার্ড বলেছিলেন, ‘(ট্রাম্প সম্পর্কে) অনেক কিছুই জানা বাকি আছে। আমরা ২০ জন প্রতিবেদক নিয়োগ করেছি ট্রাম্পের জীবনের প্রতিটি বিষয়ের তথ্য অনুসন্ধানের জন্য। এমনকি আমরা এ বিষয়ে একটি বই বের করারও পরিকল্পনা করছি।’ এত কিছুর পরও ট্রাম্পের বিজয় ঠেকানো যায়নি। ভূমিধস বিজয় নিয়ে তিনি ক্ষমতায় বসেছেন। কিন্তু থেমে নেই গণমাধ্যম। ট্রাম্প যেমন গণমাধ্যমকে ধুয়ে দিচ্ছেন, গণমাধ্যমও তেমনি ট্রাম্পের ব্যাপারে সোচ্চার। যুক্তরাষ্ট্রে গণমাধ্যম ও সরকারের মধ্যে চলমান সম্পর্ক (নাকি বৈরিতা) কি তাহলে নতুন কোনো বার্তা দিচ্ছে? হঠাৎ করে প্রভাবশালী দু’টি পত্রিকার ‘গণতন্ত্র’ ও ‘সত্য’ নিয়ে এমন উঠে পড়ার পেছনের কারণ কী? আমেরিকার গণতন্ত্র কি আসলেই হুমকির মুখে পড়েছে? সে ক্ষেত্রে জনগণ বেছে নেবে সরকার নাকি গণমাধ্যম? অবশ্য আমেরিকার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন বহু আগেই বলে গেছেন, “Were it left to me to decide whether we should have a government without newspapers, or newspapers without a government, I should not hesitate a moment to prefer the later.” সংবাদপত্রহীন সরকারের চেয়ে সরকারহীন সংবাদপত্র ভালো।

আমেরিকার এই অবস্থাকে ভূমিকা হিসেবে নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পর্যালোচনা করাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ করে ‘অন্ধকারে মরে যায় গণতন্ত্র’Ñ এই স্লোগানের মর্মার্থ বাংলাদেশের গণতন্ত্র চর্চায় বেশ জুৎসইভাবে খাপ খেয়ে যায় বলে এই আলোচনা এখানে ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক।

বলা ভুল হবে না যে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র শুরু থেকেই ক্ষমতামুখী শুধু নয়; ক্ষমতাসর্বস্ব। যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতে হবে এবং যেকোনো কিছুর বিনিময়ে ক্ষমতায় থাকতে হবেÑ এই ক্ষমতাকেন্দ্রিক চক্র থেকে আমাদের গণতন্ত্র বের হতে পারেনি। এখানকার রাজনীতিও সীমাহীন ক্ষমতার প্রতীক। দুঃখজনক হলো, ক্ষমতার নাটাই থাকে গুটিকয়েক মানুষের হাতে। বাকি সবাই শুধুই ক্ষমতাচর্চার নীরব দর্শক। তাদের বসবাস অন্ধকারে। বেশির ভাগ মানুষকে ‘অন্ধকারে’ রাখতে পারলেই ক্ষমতাচর্চার পথ সুগম হয়। অন্ধকার মানে তথ্যহীনতা, অন্ধকার মানে অধিকারহীনতা, অন্ধকার মানে প্রশ্নহীন সমাজ। এমন একটি ‘মেনে নেয়া’ সমাজ সৃষ্টি করা গেলে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার পথ প্রশস্ত হয়। জনগণের সামনে নেমে আসে অন্ধকার। ‘অ্যাসিমেট্রিক ইনফরমেশন’ বা ‘তথ্যের অসমানতা’ তত্ত্বে অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ বলেছেন, ‘যারা শাসন করে আর যাদের শাসন করা হয়, এই দুয়ের মধ্যে তথ্যের যে অসমানতা থাকে, তাই কিন্তু প্রশাসকদের হাতে তুলে দেয় বিশাল ক্ষমতা।’ ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যেতে চাওয়া ব্যক্তিরা তাই সাধারণ মানুষকে কখনোই কিছু জানতে দিতে চান না।

শেক্সপিয়ার বলেছিলেন, ‘ক্ষমতা একবার সীমাহীন হলে কিছুই ঠিকমতো চলে না।’ এর নামই অন্ধকার। এই অন্ধকারে ক্ষমতা শক্তিশালী হয় বটে; কিন্তু গণতন্ত্র মরে যায়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছেন, ÔPower remains strong when it remains in the dark. Exposed to sunlight, it begins to evaporate.Õ জনগণকে অজ্ঞতার অন্ধকারে রাখার সামর্থ্যরে সমান্তরাল হলো ক্ষমতার সীমা-পরিসীমা। জনগণ যত বেশি অন্ধকারে, ক্ষমতা তত শক্তিশালী। নোয়াম চমস্কি তার এক লেখায় বলেছেন, এক গবেষণায় দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা ৭০ ভাগ মানুষের সে দেশের ‘পলিসি মেকিং’-এ কোনো ভূমিকা নেই (নিউ এজ, ২০ আগস্ট ২০১৩)। বাংলাদেশে নিঃসন্দেহে এই হার তার চেয়েও অনেক বেশি। অর্থাৎ এখানকার বেশির ভাগ মানুষ অন্ধকারে। অন্ধকারে বাঁচে না গণতন্ত্র। বাংলাদেশের জনগণকে অন্ধকারে রাখার উদাহরণ অনেক। বিদেশী রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে চুক্তির পর চুক্তি হয়। জনগণ সেই চুক্তির অন্তর্নিহিত ‘দেনা-পাওনার’ সামান্যই জানতে পারে। সুন্দরবনের রামপালে গড়ে ওঠে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এত বিরোধিতার পরও রামপাল থেকে সরে না আসার কারণ সম্পর্কে জনগণ অন্ধকারে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরির ঘটনার মূলে কে বা কারা, আজো জানা যায়নি। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি নিয়ে অনেক চাপের মুখে তদন্ত করা হলেও কালবৈশাখী ঝড়ের অন্ধকারের মতোই তার প্রতিবেদন হারিয়ে গেছে কোনো এক অন্ধকারে। আজো তা প্রকাশ করা হয়নি। নারায়ণগঞ্জের কিশোর ত্বকীকে কারা হত্যা করেছে, আজো ধোঁয়াশা। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার পর এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও অন্ধকারের চোরাবালিতে হারিয়ে গেছে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য। তাদের ছোট্ট ছেলে মেঘ বড় হয়ে উঠছে বাবা-মাকে খুন করার কারণ না জানার অন্ধকারকে সঙ্গী করেই। ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে কমপক্ষে ২৬৮টি গুমের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ১৮৭ জন মানুষের মৃতদেহও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের কী হলো, কেন হলোÑ কোনো উত্তর নেই। অন্ধকারেই কাটছে স্বজনদের সময়।

এই বাংলাদেশে তাহলে গণমাধ্যমের ভূমিকা কী? এখানে গণমাধ্যম কি সত্যিকারের ‘ওয়াচডগ’ হতে পেরেছে? গণতন্ত্রের ওপর অন্ধকার নেমে এলে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমাধ্যম আলো ছড়ানোর দায়িত্ব পালন করতে পারে। তার প্রমাণ সম্প্রতি প্রকাশিত মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান (১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬)। সুতরাং গণমাধ্যমকে একপেশে দোষ দিলে চলবে না। গণমাধ্যম এবং তাতে কর্মরত সংবাদকর্মীরা এই সমাজ, এই সংস্কৃতি এবং রাজনীতির বৃত্তের বাইরের নন।

‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে’ গেলে শুধু গণমাধ্যমকেই ‘ধোয়া তুলসিপাতা’ ভেবে প্রত্যাশার পাহাড় রচনা করা অযৌক্তিক বিবেচিত হতে পারে। তবুও ওয়াশিংটন পোস্ট-এর ‘অন্ধকারে মরে যায় গণতন্ত্র’ স্লোগান এ দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের অন্তত নীতিগত একটি বার্তা দিতেই পারে।

লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

rafique.ruman@gmail.com