‘শেখ হাসিনা পারেন, শেখ হাসিনাই পারবেন’

দেলোয়ার জাহিদ : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার “আওয়ামী লীগই পারে, আওয়ামী লীগই পারবে” বিশেষ লেখাটি পড়লাম। সাধারণত বিশ্বে সরকার ও দল প্রধানদের এধরনের লেখা আমাদের সচরাচর চোখে পড়েনা । লেখাটি নিঃসন্দেহে সুবিন্যস্ত ও  তথ্যবহুল কিন্তু আওয়ামী লীগের …।তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে কেন খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই আওয়ামী লীগের ইতিহাস ও সাফল্য তুলে ধরতে তার কলম ধরতে হলো। একজন সচেতন পাঠক হিসেবে জানার আগ্রহ থেকেই গেলো। আওয়ামী লীগ প্রধানের বক্তব্যের মূল্যায়নে কিছু একটা লেখার হৃদয়গত তাগিদ থেকে এ অভিব্যক্তিগুলো প্রকাশের ক্ষুদ্র প্রয়াস.

শেখ হাসিনা তার নিবন্ধে  লিখেছেন “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের ইতিহাস আর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, বাঙালি জাতিকে স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে বিশ্বসভায় আত্মপরিচয়ের সুযোগ করে দেয়া, বাঙালির বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত করাসহ বাঙালির যা কিছু প্রাপ্তি, যা কিছু গৌরবের, তার সবই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল।…তিনি উপলব্ধি করেন যে, একটি শক্তিশালী সংগঠন ছাড়া সাধারণ মানুষের মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়। তাই তিনি সংগঠনকে শক্তিশালী করতে অধিক মনোযোগ দেন। এই সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে শাসক শ্রেণীর সকল অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। আন্দোলন গড়ে তোলেন। ফলে বারবার তিনি মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হন ও তাকে কারাবরণ করতে হয়। এমনকি জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের কথা বলতে গিয়ে তাঁকে অনেকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়। তাকে ফাঁসি দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে মিথ্যে মামলার আসামিও করা হয়েছে। কিন্তু তিনি তাঁর নীতিতে ছিলেন হিমালয়ের মতো অটল-অবিচল। সকল হুমকির বিরুদ্ধে তিনি বাঙালির ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তাঁর প্রাণপ্রিয় আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীও জেল-জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন…আওয়ামী লীগই পারে, আওয়ামী লীগই পারবে…বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা অর্জন ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে আমরা এক ঐতিহাসিক ঘটনার অদ্ভূত সম্মিলন দেখতে পাই। এই সংগঠন যেন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল এক ঐতিহাসিক দায় পরিশোধ করে বাঙালির আজীবন লালিত আকাঙ্খাকে বাস্তবে রূপ দিতে।”

আওয়ামী লীগের মুক্তবিবেক বলে পরিচিত বিশাল লেখক, বুদ্ধিজীবি, পেশাজীবি ওরা কোথায়? কোথায় আওয়ামী লীগের প্রচার প্রকাশনা বিভাগ? কোথায় ৬৯ এর গণআন্দোলনের নেতারা? কোথায় মক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি? যে বা যারা ঘটা করে আওয়ামী লীগের সফলতার ও সীমাবদ্ধতার কথাগুলো তুলে ধরবেন। বছর বয়সী একটি রাজনৈতিক সংগঠন আজো কি ইপ্সিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে? কি পর্যায়ে একজন সরকার ও দল প্রধানকে বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় সব কথার ই জবাব দিতে হয়। কেন শেখ হাসিনাকেই।

জীবনে মাত্র কবার বঙ্গবন্ধুর সান্নিগ্ধে গিয়েছি, তার স্নেহাস্পর্শে আমি বা আমার মত অনেকেই আক্রান্ত। আমাদের কাছে চাওয়া পাওয়ার কোন হিসেব নেই, থাকলে আমরা মুক্তিযুদ্ধে যেতাম না। এখনো লাখো মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক বঙ্গবন্ধুর চেতনা বুকে ধারন করে বেচে আছেন। তাদের দায় বঙ্গবন্ধুর আত্মার কাছেআওয়ামী লীগের কাছে নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বঙ্গবন্ধু অনুসারীদের কষ্ট শুধুই বেড়ে যায়।

লেখিকা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের অর্জনগুলোর কথা বলেছেন অতীতের একটা পর্যায় বা সময় পর্যন্ত তা মেনে নিতে আমার অন্ততঃ কোন আপত্তি নেই, হয়তো কারো কোন আপত্তি নেই কিন্তু আওয়ামী লীগের সে অর্জনগুলো কে বা কারা প্রশ্নবিদ্ধ করছে তা অবশ্যই ভেবে দেখার বিষয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে আশা করেছিলাম বঙ্গবন্ধু কন্যা যুগের চাহিদা অনুযায়ী নতুন এক আওয়ামীলীগের কথা বলবেনতৃণমূল থেকে শিক্ষিত, সৎ, যোগ্য, ত্যাগী নেতৃত্ব সৃষ্টির কথা বলবেনবঙ্গবন্ধুর অধুরা স্বপ্ন বিকেন্দ্রীকরনের কথা বলবেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবানী উচ্চারণ করবেন এবং দলের নামে যেকোন পর্যায়ে লুটেরা, সন্ত্রাসী, খুনি, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোর হবেন। কারন আওয়ামী লীগ এদেরই কারনে অতীতে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে, এবং ভবিষ্যতেও হবার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারী কার্য্য পরিচালনা নিয়ে কোন জনক্ষোভ আজো চোখে পড়েনি এর অর্থ এই নয় যে জনগণ সব মেনে নিয়েছে

বঙ্গবন্ধুকে নিরাপত্তার আওতায় নেয়া যায়নি কখনো। জনগণ এবং বঙ্গবন্ধুর মাঝে কোন দেয়াল ছিলোনা। তিনি শুধু আওয়ামী লীগ নয় জাতির অভিবাবক ছিলেন, আন্তর্জাতিকভাবেও ছিলেন একজন সন্মাণিত নেতা। সম্ভবতঃ গাফ্ফার চৌধুরী ভাইয়ের একটি লেখায় পড়েছিলাম যে তদানিন্তন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানাতে তার গাড়ীর দরোজা নিজ হাতে খুলে দিয়েছিলেনসাংবাদিকদের রেওয়াজ ভাঙ্গার কৈফিয়ত দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন শেখ মুজিব শুধু বাংলাদেশের নেতা নন তিনি বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের নেতা।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে আমরা কাদের নেতা হিসেবে দেখতে চাই? আওয়ামীলীগের? গোটা বাংলাদেশের? এশিয়ার? বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের?

বঙ্গবন্ধু কিভাবে একজন উচু মাপের নেতা, তার কটি উদাহরন দিতে চাই। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ভৈরববাজার এলেন বঙ্গবন্ধুএক জনসভায় ভাষণ দিবেন। জনসভাতো নয় যেন জনসমুদ্রআমরা মঞ্চের পার্শ্বেমঞ্চ ও যেন ঠাই নাই, ঠাই নাই ছোট্র এ তরীউঠেই প্রশ্ন শহীদ নুরু আতিকের পরিবার কোথায়? (৪ঠা জুলাই, ১৯৭১ প্রকাশ্য দিবালোকে ভৈরব আক্রমন করে দালাল মমতাজ পাগলাকে হত্যাকারী- নুরু, লেখকের আপন মামা ও আতিক মামাতো ভাই)। বঙ্গবন্ধু গর্জে উঠলেন, তোরা এখানে(মঞ্চে) কি করিস? তখন মঞ্চ প্রায় শুন্যশহীদ পরিবারকে বুকে জড়িয়ে তিনি কাদলেন, সেসাথে কাদলো লাখো জনতাএইতো শেখ মুজিবএইতো বঙ্গবন্ধু

আমার বাবা মরহুম এম।এ।খালেক ৭৩ এর নির্বাচনের পূর্বে একজন সংসদ সদস্যের সাথে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে গেলেনসালাম দেয়ার পর হাতের ইসারায় বসতে বললেন বঙ্গবন্ধুসংসদ সদস্য এগিয়ে গিয়ে কদমবুছি করতে গেলেন, হঠাৎ করে ধ্বপ শব্দ হলোবঙ্গবন্ধু লাথি দিয়ে ফেলে দিয়েছেন ওই সংসদ সদস্যকেরাগে, ক্ষোভে চিৎকার করছেনতাতীদের সুতা চুরি করে আবারো এসেছিস!…অথচ সমসাময়িক সময়ে তিনি ছিলেন একজন তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত মানুষএদের মতো মানুষেরাই ছিলো আওয়ামীলীগে ক্যানসার!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হলে সেভেনমার্ডার কারা ঘটিয়েছিলো? বঙ্গবন্ধু কি তাদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়েছিলেন? তাহলে কি তাদের বিচার হতো? অভিযুক্ততার কারনে বঙ্গভবনে পদত্যাগপত্র দিয়ে কেউ কেউ কি হেটে বাসায় যাননি? সেই বঙ্গবন্ধু কন্যার কোন আপোষকামীতা কি জনগণ ক্ষমা করবে?

৭৩ এর নির্বাচনে নরসিংদীর রায়পুরা থানাধীন নারায়নপুর বাজারে রবিউল আউয়াল কিরনের এক নির্বাচনী জনসভায় আমার পরই বক্তৃতা দিতে উঠলেন সে সভার প্রধান অতিথি জিল্লুর রহমান, সহজ ও সাবলিল ভাষায় তার বক্তব্য ছিলো এমনঃ

  •    একটি মাত্র ভোট দিয়েছিলেনআমরা আপনাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছি
  •    একটি মাত্র ভোট দিয়েছিলেনকৃষকদের নার্য্যমূল্যে সার, বীজ দিয়েছি
  •    একটি মাত্র ভোট দিয়েছিলেনআমরা আপনাদের নিরাপত্তা দিয়েছি
  •    একটি মাত্র ভোট দিয়েছিলেনআমরা আপনাদের নিরাপত্তা দিয়েছি
  •    একটি মাত্র ভোট দিয়েছিলেনআমরা আপনাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিয়েছি

রবিউল আউয়াল কিরনের জন্য একটি মাত্র ভোট চেয়েই তিনি সেদিন বক্তব্য শেষ করেছিলেন…। ন্যাপ, কমিউনিষ্ট পার্টির ঘাটি বলে খ্যাত বেলাবো এলাকায় বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে কিরণ সাংসদ হয়েছিলেন কিন্তু তাকেও করুণভাবে অপমৃত্যু বরণ করতে হয়েছে।

চলমান ঘটনা প্রবাহ দেশে চরম অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।  নারায়নগন্জে ৭খুনের ঘটনা, দায় স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট র্যাব কর্মকর্তাদের লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি। ফেনীতে দলীয় কোন্দলে জণপ্রিয় উপজেলা চেয়ারম্যান একরামকে পুরিয়ে হত্যাকুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে সদর আসনের সাংসদ আকম বাহাউদ্দিন বাহারের ভাস্তে আহসান হাবীব সুমু হত্যা সহ ধারাবাহিক ঘটনা প্রবাহে বিদগ্ধ আওয়ামী রাজনীতিবিদরা চরম উৎকন্ঠিত। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সাংবাদিক হুমায়ূন কবীর বালু হত্যার দশবছর কেটে গেছে আজো বিচার মিলেনি, মিলেনি সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের বিচার। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ দেখছেন…রাজনৈতিকদের হাতে রাজনীতি নেই। মন্ত্রী ওবায়েদুল কাদের রাজনীতিকে উন্নয়নের বাধা হিসেবে মনে করছেন।

এসকল পরিস্থিতির দায় কার? শুধুই সরকারের? শুধুই আওয়ামীলীগের ? অথবা উভয়ের!

আওয়ামীলীগ, একটি সুপ্রাচীন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মসমালোচনা করা উচিত। তৃণমূল থেকে গড়ে উঠা  এদলের স্থানীয় থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ে ভাল নেতৃত্ব গড়ে তোলা। আর শেখ হাসিনাই পারবেন জাতির জনকের মৌলিক সে চাওয়া পাওয়া ও স্বপ্নগুলো কে বাস্তবায়িত করতে…দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে শান্তি, শৃংখলা ও উন্নয়ন এর ধারা অব্যাহত রাখতে. এটাই বাংলাদেশের দায় আওয়ামীলীগের কাছে।।

 

লেখক: দেলোয়ার জাহিদ, রিচার্স ফেলো, সেন্ট পলস কলেজ, ইউনির্ভাসিটি অব ম্যানিটোভা, কানাডা, সম্পাদক, সমাজককন্ঠ

You Might Also Like