আদিম মানুষের জীবাশ্মের চমকপ্রদ কাহিনি

দক্ষিণ আফ্রিকায় উদ্ধার করা মানব প্রজাতির নতুন জীবাশ্মের রহস্যময় ইতিহাস নিয়ে সম্প্রতি তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

পুরাতাত্ত্বিক এই আবিষ্কারে দেখা গেছে ‘হোমো নালেদি’ বা নালেদি মানবরা মৃতদেহ গুহায় রেখে দিত। এই ধরনের উন্নত সংস্কৃতি পালন করা সত্ত্বেও তাদের মস্তিষ্ক ছিল আমাদের এক-তৃতীয়াংশ। এ ছাড়া আরো কিছু আদিমত্বের ছাপ থাকলেও এরা সম্ভবত ২ লাখ ৩৫ হাজার বছর আগেও টিকে ছিল। এই প্রজাতির মানুষ সম্ভবত আধুনিক মানুষদের প্রথম পূর্বপুরুষ ‘হোমো সাপিয়েন্স’-দের সঙ্গে জড়িত।

ইলাইফ জার্নালে প্রকাশিত একাধিক গবেষণাপত্রে জোহানেসবার্গের উইটওয়াটার্সর‌্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লি বার্গার এবং আমেরিকার উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হক্স ও তাদের সহযোগীরা এই নমুনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছেন।

নালেদি মানবের কাহিনি সামেন আসে ২০১৩ সালে। দক্ষিণ আফ্রিকার রাইজিংস্টার গুহাশ্রেণির দিনালেদি কুঠুরিতে বিভিন্ন বয়সের ১৫টি জীবাশ্ম পাওয়া যায়। একই সময়ে ১০০ মিটার দূরে লেসেদিতে দ্বিতীয় একটি কুঠুরির সন্ধান পাওয়া যায়। স্থানীয় সোয়ানা ভাষায় ‘লেসেদি’ মানে ‘আলো’।

দিনালেদির জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণা ২০১৫ সালে প্রকাশিত হলেও লেসেদি নিয়ে গবেষণার ফলাফল এই প্রথম প্রকাশ করলেন বিজ্ঞানীরা।

লেসেদিতে অন্তত তিনটি জীবাশ্ম পাওয়া যায়, দুজন প্রাপ্তবয়স্কের ও একটি শিশুর। এদের মধ্যে একজন প্রাপ্তবয়স্কের কঙ্কাল আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় অক্ষত রয়েছে। এই নমুনাটি সম্ভবত একজন পুরুষের। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘নেও’, সোথো ভাষায় এর মানে ‘পুরষ্কার’।

এদের হাড়ের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, নালেদি মানবরা হাঁটা ও চড়া দুটোতেই দক্ষ ছিল।

নালেদি মানবরা যে ‘হোমো সাপিয়েন্স’- এর প্রাথমিক সংস্করণের সঙ্গে একই সময়ে ও আফ্রিকার একই এলাকায় জীবিত ছিল, এই তথ্য পুরো প্লাইস্টোসিন যুগের মানব সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময়তার প্রমাণ দেয়।

অধ্যাপক হক্স বলেন, তুলনামূলক আদিম হলেও নালেদি মানবরা অন্যান্য বিবর্তিত মানব প্রজাতির সঙ্গে ১০ লক্ষাধিক বছর ধরে একই এলাকায় বসবাস করেছে। তারা অন্য প্রজাতির থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করছিল, এ কথা বলা যাবে না। এদের দাঁতের গড়ন দেখে মনে হয়, এদের খাদ্যাভ্যাস অধুনা মানুষদের মতোই ছিল। এদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আকারও আমাদের মতোই এবং এদের জন্য পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করাটাই স্বাভাবিক।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, একাধিক কক্ষে একাধিক মৃতদেহ পাওয়ার ঘটনা থেকে অনুমান করা হচ্ছে, নালেদি মানবরা মৃতদেহ সংরক্ষণ করত। যদি তা সত্য হয়, তাহলে এতে উন্নত মস্তিষ্ক ও সংস্কৃতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

২০১৫ সালে অধ্যাপক বার্গার জানান, এই জীবাশ্ম ৩০ লাখ বছরের পুরোনো হতে পারে। তবে একাধিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত তারা হোমো নালেদির বয়স নির্ধারণ করতে পেরেছেন ২ লাখ ৩৬ হাজার থেকে ৩ লাখা ৩৫ বছর।

নালেদি মানবকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের মনে প্রশ্নের অন্ত নেই। তবে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই প্রজাতির বিবর্তনের ইতিহাস।

গবেষকরা এ মুহূর্তে দুটি সম্ভাবনার কথা মাথায় রাখছেন। হোমো নালেদি হয়তো ‘হোমো হ্যাবিলিস’- এর মতো মানুষের আদিমতম সংস্করণের একটি। এদের শারীরিক গঠনে আদিমত্বের ছাপ থাকলেও পাশাপাশি এরা আধুনিক মানুষের বংশ ধারার সমান্তরালে বিবর্তিত হয়েছে। আদিম মানবদের ওই ধারাটিই পরে আধুনিক মানুষে পরিণত হয়।

দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হলো- প্রায় ১০ লাখ বছর আগেই ‘হোমো ইরেক্টাস’- এর মতো কোনো বিবর্তিত প্রজাতি থেকে হোমো নালেদি আলাদা হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে তুলনামূলকভাবে আদিম পর্যায়ে কিছুটা প্রত্যাবর্তন করে। এদের খুলি ও দাঁতের মতো কিছু ক্ষেত্রে তার ছাপ রয়ে গেছে।

You Might Also Like