বাংলার কবিদের মূল্যায়ন হয় অকালে : উপমাহদেশের প্রখ্যাত কবি ‘কবি মহাদেব সাহা’

শিবলী চৌধুরী কায়েস : প্রথমে অক্ষর, এর পর শব্দ, তার পর একটি লাইন! এই ভাবেই বইয়ের প্রেমে পড়েন উপমহাদেশের প্রখ্যাত কবি ’কবি মহাদেব সাহা’। তাই তো সুদুর বাংলাদেশ থেকে সাত-সমুদ্র তের-নদী পাড়ী দিয়ে প্রিয়তমা সহধর্মীনী নীলা সাহাকে নিয়ে ছুটে আসেন নিউইয়র্কে। উদ্দেশ্য একটাই উত্তর আমেরিকার তথা নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ড সিটিতে তিনদিন ব্যাপী ২৩তম আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বইপ্রেমীদের সাথে একান্তে সময় কাটানো।

শুক্রবার মেলার মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়ে ‘আমার বাংলা’ তথা আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলার শুভ উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত এই কবি মহাদেব সাহা। কথা বলেন, ভাষা আন্দোলন তথা বাঙলা সংস্কৃতির উৎপত্তি নিয়ে। এরপরই চলে আসেন মুল আয়োজন বই মেলা প্রাঙ্গনে। নিজের লেখা কবিতার বই নিজেই তুলে দেন প্রবাসী বইপ্রেমীদের হাতে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মেলায় অংশ নেয়ার পরও একটু ক্লান্তি অনুভব করেন নি প্রবীণ এই বাঙলার কবি। তাই রবিবার মেলার সমাপনির দিনেও তাঁকে দেখা গেছে অনেক প্রাণবন্ত এবং উৎফুল্ল।

আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক কলামিষ্ট ও নবীন লেখকদের ফটোফ্রেমে বন্দী হবার পাশাপাশি সময় দিচ্ছেন নিজের রচিত বইয়ের স্টলে। পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলাম মহান এই কবির কর্মময় জীবন, লেখক হিসেবে প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তী বিষয়ে।

মনের দিক থেকে অবিচল থাকলেও শারিরীক ভাবে অনেকটা ক্লান্ত এই মহাকবীর নরম গলায় অনেকটা আক্ষেপের সুরে মাথা নেড়ে জানান, কী আর বলবো? স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের প্রথম বইমেলা খান ব্রাদারস এর প্রকাশনা তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’-এর কথা। অনেক সাড়াও নাকি পেয়েছিলেন। কবি ও লেখক হিসেবে তিনিই নাকি তাঁর প্রথম প্রকাশিত বইয়ের ‘রয়্যালটি‘’ পেয়েছেন। এতকিছুর পরও বাংলাদেশে কবিদের মুল্যায়ন ‘অকাল পক্ক’ বলে দাবি করেন তিনি। কারণ হিসেবে জানান, এত কবিতা প্রকাশিত হবার পরও যথাযোগ্য সম্মাননা পেতে প্রায় ‘দশ‘ বছর অপেক্ষা করতে হয় তাঁকে। অবশেষে ১৯৮৩ সালে প্রথম বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন বাঙলার রোমান্টিক এই কবি।

এ পর্যন্ত তাঁর  প্রায় ১শ ২৫টি বই প্রকাশিত হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর কবিতা পড়ে অনেক ভাঙ্গা সংসার জোড়া লেগেছে মজা করে এমনটিও জানান মহাদেব সাহা। নিউইয়র্কের মেলা সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন। অনেক সীমাবদ্ধতা থাকবে; তব্ওু এ মেলার আয়োজন বাংলা ভাষার জন্য এক অনন্য উদাহরণ। মেলা উপস্থিতি তাঁর ভালো লেগেছে এমন দাবি করে কবি মহাদেব সাহা বলেন, ‘মনটা পড়ে আছে দেশে। আমার দীর্ঘ দিনের প্রিয় সহকর্মী অধ্যাপক সরদার ফজলুল করীম মারা গেছেন তাই’।  ‘‘তব্ওু এখানে না আসলে অনুভব করতে পারতাম না এত বড় আয়োজন।’’

বই মেলাকে উৎসব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই যে মেলার আবহ ও মানুষের মিলন মেলা ও নতুন বইয়ের প্রচ্ছদে মোড়ানো ফুলের মতো প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে পুরো মেলা প্রাঙ্গন। নানা রঙের আঁচড়ে ফুটে উঠেছে এক একটি বইয়ের প্রচ্ছদ। পেছনের রঙ পুরো মেলা জুড়ে। এটা খুবই আনন্দের অনুভূতি’।

এভাবেই খানিকটা নিশ্চুপ ছিলেন। প্রশ্ন ছিলো। বাংলা ভাষার মিশ্র ব্যবহার নিয়ে। অভিযোগ নয়! প্রত্যাশার সুরেই উত্তর দিলেন। ‘বিভিন্ন ভাষা শেখা কোন অপরাধ নয়; তবে মাতৃভাষাকে যেন আমরা ভুলে না যাই’। পরিবার, সমাজ ব্যক্তি ও রাষ্ট্র যে যার অবস্থানে থেকে তরুণ প্রজন্মকে দেশে কৃষ্টি-কালচার শিখানোর গুরু দায়িত্ব কাঁধে নিতে হবে বলে মনে করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই কবি।

তিনি আবারও বলেন, ‘বই হচ্ছে অক্ষরের উৎসব। এর মত পবিত্র, সুন্দর এবং ভালো পৃথিবীতে আর কিছু নেই। তাঁর মতে, ‘আমাদের সভ্যতার আবির্ভাব ঘটেছে অক্ষর দিয়ে। বাঙলার মানুষ তার সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছে এই অক্ষর থেকে’। তাই লাখো শহীদরে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ মায়ের ভাষাকে যেন আমরা ভুলে না যাই। শুধু নিউইয়র্ক নয়; পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে হবে বাংলা ভাষার রথযাত্রা। তাহলেই ভাষা বেঁচে থাকবে চিরকাল, এমনটিই প্রত্যাশা কবি মহাদেব সাহা’র।

কবি মহাদেব সাহা জন্ম ও পরিচয়

১৯৪৪ সালের ৫ আগস্ট পাবনা জেলার ধানঘড়া গ্রামে পৈতৃক ভিটায় জন্মগ্রহণ করেন মহাদেব সাহা। তাঁর পিতার নাম বগদাধর সাহা এবং মাতা বিরাজমোহিনী। তাঁর সহধর্মীনীর নাম নীলা সাহা এবং তীর্থ সাহা, সৌধ সাহা নামের দু’সন্তানের জনক তিনি।

মহাদেব সাহা তাঁর কাব্য প্রতিভার জন্য অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেছেন। ১৯৮৩ সালে কবিতায় প্রথম ‘বাংলা একাডেমী’ পুরস্কার এবং ২০০১ সালে ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। এছাড়াও অন্যান্য পুরস্কার ও সম্মাননার মধ্যে ১৯৯৫ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে বগুড়া ‘লেখকচক্র’ পুরস্কার, ২০০২ সালে ‘খালেদদাদ’ চৌধূরী স্মৃতি পুরস্কার এবং সর্বশেষ ২০০৮ সালে ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’ পুরস্কার ছিল অন্যতম।

এই গৃহ এই সন্ন্যাস, তোমার পায়ের শব্দ, কবি মহাদেব সাহা’র উল্লেখযোগ্য রচনা। এছাড়াও, মানব এসেছি কাছে, চাই বিষ অমরতা, কী সুন্দর অন্ধ, তবু স্বপ্ন দেখি, সোনালী ডানার মেঘ, পৃথিবী তোমাকে আমি ভালোবাসি, কে পেয়েছে সব সুখ, সবটুকু মধু, শুকনো পাতার স্বপ্নগাঁথা, দুঃসময়ের সঙ্গে হেঁটে যাই, দুঃখ কোন শেষ কথা নয়, ভালোবাসা কেন এতো আলো অন্ধকারময়, লাজুক লিরিক-২, দূর বংশীধ্বনি, অর্ধেক ডুবেছি প্রেমে-অর্ধেক আধারে, কালো মেঘের ওপারে পূর্ণিমা, সন্ধ্যার লিরিক ও অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

কবি মহাদেব সাহার রাজনৈতিক কবিতা (কাব্য-সংকলন), তাঁর প্রেমের কবিতা (কাব্য-সংকলন), মহাদেব সাহার কাব্যসমগ্র কাব্য-সংকলন) – ১ম খন্ড, ২য় খন্ড, ৩য় খন্ড, ৪র্থ খন্ড, মহাদেব সাহার শ্রেষ্ঠ কবিতা (কাব্য-সংকলন), প্রেম ও ভালবাসার কবিতা (কাব্য-সংকলন), নির্বাচিত ১০০ কবিতা (কাব্য-সংকলন), নির্বাচিত একশ (কাব্য-সংকলন), প্রকৃতি ও প্রেমের কবিতা(কাব্য-সংকলন)

প্রবন্ধ [সম্পাদনা] : আনন্দের মৃত্যু নেই, মহাদেব সাহার কলাম, কবিতার দেশ ও অন্যান্য ভাবনা, মহাদেব সাহার নির্বাচিত কলাম এরকম অসংখ্য লেখা রয়েছে যা বাংলা ভাষার জন্য এক মাইল ফলক হিসেবে পাঠকদের হৃদয়ে থাকবে চিরকাল।

শিশুসাহিত্য [সম্পাদনা] : টাপুর টুপুর মেঘের দুপুর, ছবি আঁকা পাখির পাখা, আকাশে ওড়া মাটির ঘোড়া, সরষে ফুলের নদী, আকাশে সোনার থালা, মহাদেব সাহার কিশোর কবিতা (সংকলন) ইত্যাদি।

You Might Also Like