রোজা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান

মোশারেফ হোসেন পাটওয়ারী: শারীরিক বিন্যাস এবং গঠনশৈলী স্থিতিশীল রাখতে প্রতিটি ধর্মেই উপবাস প্রথা রয়েছে। অন্য ধর্মের উপবাস প্রথা আর ইসলাম ধর্মের রোজা এক নয়। ইসলাম শান্তি ও মানব কল্যাণের ধর্ম। এ ধর্মের মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রোজা অন্যতম। মানব জাতির আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আত্মোন্নতির এক ঐতিহাসিক খোদায়ী ব্যবস্থা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সিঁড়ি হচ্ছে রোজা। মহান আল্লাহ রমজানুল মুবারককে নিজের মাস হিসেবে এবং রোজাদারের পুরস্কার তিনি স্বয়ং দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

সাধারণভাবে মনে হয় রোজা মানুষের জন্য কষ্টদায়ক। বিশেষ করে অসুস্থ এবং পীড়িতদের বেলায়। মূলত রোজা সবার জন্য কল্যাণকর। এতে মানুষ দৈহিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক স্বস্তি পায়। স্বাস্থ্যের জন্য রমজানের রোজা উপকারী। চিকিৎসা বিজ্ঞানও শারীরিক সুস্থতার সাথে সাথে মানসিক ও আধ্যাত্মিক স্বস্তিকেও স্বাস্থ্যের অপরিহার্য অঙ্গ বলে ঘোষণা করেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান আরো বলে, ‘Prevention is better than cure’.ইসলামের ধ্যান-ধারণা, পথনির্দেশনা, বিধিবিধান মানুষের স্বাস্থ্য পরিচর্যার ক্ষেত্রে বড়ই কল্যাণকর। আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনকি অনেক অসুস্থ পীড়িতদের জন্যও রোজা উপকারী।

Fasting-Medical-Benefitরোজা রাখার কারণে যদি কোনো রোগ বৃদ্ধি পায় অথবা রোগী বেশ কষ্ট পায় তবে এ বিষয়ে মুফতিদের সাথে আলোচনা করে নেয়াই ভালো। রোগীদের সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত রোজা না রাখার অনুমতি ইসলামে রয়েছে। ‘তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে। সে এ মাসে রোজা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিকে গণনা পূর্ণ করবে। (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৫)।

মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্বারোপ করার কারণেই শিশুকে দুগ্ধদানকারীদের, সফরকারীদের এবং রোগাক্রান্ত দুর্বল মানুষের জন্য রোজার বাধ্যবাধকতাকে শিথিল করে দিয়েছেন।

ধূমপানকারীদের জন্যঃ ধূমপান করা মানেই বিষপান করা। এ কথা আধুনিক যুগে কে না জানে। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের এ আবিষ্কারের বহু আগেই ইসলাম ধূমপান নিষিদ্ধ করেছিল। ধূমপানের ফলে ফুসফুসের ওপর নিকোটিনের দাগ পড়তে পড়তে এক সময় ধূমপায়ী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। রমজানের রোজার ফলে ধূমপান থেকে বিরত তাকার কারণে ফুসফুস দীর্ঘসময় পর্যন্ত নিকোটিনের বিষক্রিয়া মুক্ত থাকে। ফলে ফুসফুস রোগমুক্ত থাকে এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসে। যারা ধূমপান করেন রমজানের রোজা তাদের জন্য অবশ্যই উপকারী। ধূমপান বর্জনেরও এটা উত্তম সময়।

স্থূলকায় রোগীদের জন্যঃ অতিরিক্ত আহার বর্তমানে অন্যতম স্বাস্থ্য সমস্যা। তাই ইসলামে হালকা ভোজনই কাম্য। বেশি বেশি খাদ্য গ্রহণের ফলে দেহে চর্বি জমে অনেকে বেশ স্থূল বা অস্বাভাবিক মোটা হয়ে যায়। যা স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, বিব্রতকর ও কষ্টকর। এ চর্বি শরীরের চামড়ার নিচে কলেস্টেরল আকারে শিরা-উপশিরা-ধমনীতে এমনকি হৃৎপিণ্ডেও জমা হয়। যার ফলে শরীরে স্বাভাবিক রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। কিন্তু রোজা রাখার কারণে স্থূলকায় রোগীর শরীরে জমে থাকা এসব কোলেস্টেরল শরীরের কাজে ব্যয়িত হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক হয় রক্তের সার্কুলেশন। তবে এ জাতীয় রোগীরা ইফতার ও সেহরিতে ভূরিভোজন না করে অবশ্যই হালকা খাবার খেতে হবে।

আলসার বা পেটের পীড়ার রোগীদের জন্যঃ দেখা যায়, পেপটিক আলসারের রোগীরা রোজা রাখলেই ভালো বোধ করেন। কারো কারো ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। তবে তাদের জন্য রোজার বিষয়টি অনুশীলনের ওপর নির্ভর করে। আলসার বা এ জাতীয় সমস্যায় সাধারণত দৈনিক দু’বারের বেশি ওষুধ সেবন করতে হয় না। যার জন্য রোজা রাখতে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।

ডায়াবেটিক রোগীদের জন্যঃ যেসব মানুষ ডায়াবেটিস রোগে ভুগছেন বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য মুখে ওষুধ গ্রহণ করছেন, খাদ্য তালিকা মেনে চলছেন এবং ওজন কমাতে চাচ্ছেন­তাদের জন্য রোজা খুবই উপকারী। বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে হাইপো গ্লাইসেমিয়া হয়ে না যায়। যারা দু’বেলা ইনসুলিন নিচ্ছেন তাদের জন্য তো কথাই নেই বরং যারা দু’বেলার অধিক ইনসুলিন নেয়, তাদেরও চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক ডোজ অ্যাডজাস্ট করে রোজা রাখতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানি রোগীদের জন্যঃ হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানি রোগীদের জন্য রোজা উপকারী। রোজার ফলে রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে যায়। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকিও কমে। তা ছাড়া রোজা রাখার কারণে স্ট্রেস হরমোন করটিসেলের নিঃসরণ কমে। এতে বিপাকক্রিয়া ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। রোজার ফলে মস্তিষ্কের সেরিবেলাম ও লিমরিক সিস্টেমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ে বিধায় মনের অশান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর হয়, কর্মোদ্দীপনাও বাড়ে, যা উচ্চ রক্তচাপের জন্য মঙ্গলজনক। অধিকাংশ হাঁপানি রোগীর ক্ষেত্রেই রোজা উপকারী।

অ্যালার্জি, সর্দি-কাশির রোগীদের জন্যঃ অ্যালার্জি, সর্দি-কাশির রোগীদের রোগের উসিলা দিয়ে অযথা নিজ সিদ্ধান্তে রোজা না রাখার কোনো ভিত্তি নেই। এসব রোগে ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক, এন্টিহিস্টোমিন কিংবা স্টেরয়েড স্প্রে দিনে দু’বার বা একবার খেলে বা ব্যবহার করলেই চলে। তবে খানাখাদ্যের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

কোষ্ঠকাঠিন্য রোগীদের জন্যঃ রোজার সময় যেহেতু দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকতে হয়, তাই কারো কারো পানি স্বল্পতা হতে পারে। যা কোষ্ঠকাঠিন্য রোগীদের জন্য সমস্যার ব্যাপার। তারা ইফতার ও সেহরিতে প্রচুর পরিমাণ পানি, ডাবের পানি, ফলের রস, সরবত, শাকসবজি, সালাদ, ইসবগুলের ভুসি খেলে আরাম করে রোজা রাখতে সমস্যা হবে না। গরু বা খাসির গোশত, ইলিশ ও চিংড়ি মাছ এবং যেসব খাবার খেলে মল শক্ত হয়ে যায় তা না খাওয়াই ভালো।

রোজার বিষয়ে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ডা. শেলটন বলেছেন, উপবাসকালে শরীরের মধ্যকার প্রোটিন, ফ্যাট, শর্করা জাতীয় পদার্থগুলো স্বয়ং পাচিত হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলোর পুষ্টি বিধান হয়। এই পদ্ধতিকে ‘অ্যাস্টোলিসিস’বলা হয়। (সুপিরিয়র নিউট্রিশন গ্রন্থ)।

স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ডা. আব্রাহাম জে হেনরি রোজা সম্পর্কে বলেছেন, রোজা হলো পরমহিতৈষী ওষুধ বিশেষ। কারণ রোজা পালনের ফলে বাতরোগ, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে মানুষ কম আক্রান্ত হয়।’স্বাস্থ্য গবেষকদের মতে, সারা বছর অতিভোজ, অখাদ্য কুখাদ্য, ভেজাল খাদ্য খাওয়ার ফলে আমাদের শরীরে যে জৈব বিষ (ঞড়ীরহ) জমা হয় তা দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এক মাস রোজা পালনের ফলে তা সহজেই দূরীভূত হয়ে যায়।

কেবল খোদার প্রেমে পাগল মুমিনরাই জানে রমজানের একটি ফরজ রোজার গুরুত্ব কত। যে সাধারণ উসিলায় রমজানের একটি রোজা নষ্ট করে, জীবনভর রোজা রেখেও সে এর ক্ষতিপূরণ দিতে পারবে না। হজরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসূল পাক সাঃ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোগ, অসুখ ও শরীয়তসম্মত ওজর-আপত্তিবিহীন রমজান মাসের একটি রোজা ত্যাগ করেছে সে যদি এর পরিবর্তে সারাজীবন রোজা পালন করে তবুও তার ক্ষতিপূরণ হবে না।’ (মুসনাদে আহমদ)।

 

You Might Also Like