আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই : প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ

যুক্তরাষ্ট্র সফররত রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বলেছেন, ১৯৬১ সালে মেট্রিক (এসএসসি) পাশের পর একটি রাজনৈতিক বিশ্বাস আর আদর্শ নিয়েই রাজনীতি করছে। ছাত্র জীবনে তীব্রভাবে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। রাজনৈতিক জীবনে এমপি, ডেপুটি স্পীকার, স্পীকার, বিরোধীদলীয় উপনেতা, স্পীকার হয়ে এখন রাষ্ট্রপতি হয়েছে। তাই আমার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই, আমার জন্য কোন পথ খোলা নেই, যাওয়ার কোন জায়গা নেই। বলতে গেলে জীবন সায়াহ্নে আমি। এখন আমার একটিই যাওয়ার রাস্তা সেটি হলো কবর। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সংসদীয় ব্যবসায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত। তাই আমার সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও আমার কিশোরগঞ্জের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করে চলেছি। তিনি প্রবাসী সকল কিশোরগঞ্জবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থেকে পারষ্পারিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি বজায় রেখে সামাজিক সংগঠনকে আরো জোরদার করে কল্যাণমূখী কর্মকান্ডে অবদান রাখার জন্য প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ কিশোরগঞ্জ ডিষ্ট্রিক্ট এসোসিয়েশন ইউএসএ ইন্ক আয়োজিত সম্বর্ধনা সভায় ভাষনদানকালে উপরোক্ত কথা বলেন। গত ১৯ জুন বৃহস্প্রতিবার রাতে নিউইয়র্ক সিটির উডসাইডস্থ গুলশান ট্যারেসে প্রেসিডেন্টের সম্মানে এই সভার আয়োজন করা হয়। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ কিশোরগঞ্জ জেলার সন্তান এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এটাই তাঁর প্রথম সফর। আরো উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে গত ১৭ জুন সোমবার যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উদ্যোগে প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদের সম্মানে সর্বজনীন নাগরিক সম্বর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়েছিলো। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের বিবদমান দু’গ্রুপের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং সম্বর্ধনা কমিটিতে স্বাধীনতা বিরোধীদের অবস্থান রয়েছে বলে আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার অভিযোগসহ নিউইয়র্কে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে সর্বজনীন সম্বর্ধনা প্রদান করার বিষয়কে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান ও জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশনে নিযুক্ত স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত ড. একে মোমেনের মধ্যকার বিরোধের প্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত এই সম্বর্ধনা সভা ভন্ডুল হয়ে যায় এবং স্থানীয় লাগোর্ডিয়া এয়ারপোর্ট ম্যারিয়ট হোটেলের বলরুমে আয়োজিত এই নাগরিক সম্বর্ধা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ যোগ দেননি। এই সম্বর্ধনা কমিটিতে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগসহ যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ কমিউনিটির বিশিষ্ট নাম দেখা যায়।
কিশোরগঞ্জ ডিষ্ট্রিক্ট এসোসিয়েশন ইউএসএ ইন্ক’র সম্বর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলহাজ মোহাম্মদ ফজলুল হক। সভায় রাষ্ট্রপতিকে পুষ্পস্তবক দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয় এবং এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে প্ল্যাক প্রদান করা হয়। সভায় সাবেক এমপি আনিসুজ্জামান খোকন, বাংলাদেশ মিশনে নিযুক্ত স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত ড. একে মোমেন, নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেটে নিযুক্ত কনসাল জেনারেল শামীম আহসান মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির সম্মানে প্রদত্ত মানপত্র পাঠ করেন আব্দুর রািজ্জাক। এছাড়া শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা এবিএম ওসমান গণি, আব্দুল আওয়াল সিদ্দিকী ও ভজন সরকার, মফিজুর রহমান, জাহিদুল কবীর, সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর করিম খান, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিক খান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
কড়া নিরাপত্তায় অনুষ্ঠিত সম্বর্ধনা সভায় রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ তার চিরাচরিত প্রাণখোলা ভাষায় প্রবাসী কিশোরগঞ্জবাসীদের উদ্দেশ্যে বলেন, পুরো কিশোরগঞ্জ জেলাই আমার বাড়ী। কিশোরগঞ্জের কোথায় কি আছে, কার কি নাম, এমনকি আপনাদের (প্রবাসী কিশোরগঞ্জবাসী) বাপ-দাদার নাম বললে হয়তো তাদেরকেও আমি চিনবো। তিনি বলেন, আমি ১৮ বছর ধরে নিয়মিত এলাকায় না থাকলেও প্রযুক্তির সর্বক্ষন কিশোরগঞ্জের সকল খবরাখবরই পাই। তিনি বলেন, এর আগে নিউইয়র্ক আসার পর স্পীকার হিসেবে সম্বর্ধণা পেয়েছি, আজ রাষ্ট্রপতি হিসেবে সম্বর্ধনা পেলাম। আমার রাষ্ট্রপতি হওয়ার ব্যাপারে কিশোরগঞ্জবাসীদের ভূমিকা বেশী। এজন্য তিনি কিশোগঞ্জবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং নিউইয়র্কে এতো প্রবাসী কিােরগঞ্জবাসী দেখে তাঁর বুকটা গর্বে ভরে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর কিশোরগঞ্জের সকল দলের মানুষ খুশি হয়েছে। এটা আমার জীবনের বড় পওয়া। আমিও চেষ্টা করেছি বিরোধীদলকে সম্মান জানিয়ে কিশোরগঞ্জের জন্য কাজ করা। তিনি বলেন, আজো দল-মতের উর্ধ্বে উঠে কিশোরগঞ্জবাসী আমার পরামর্শ নেয়, এমনকি বিয়ের অনুষ্ঠান হলেও। রাষ্ট্রপতি বলেন, কিশোরগঞ্জের মানুষ শান্তি প্রিয়। সরকারী দল আর বিরোধীদলের মধ্যে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি বিদ্যমান থাকায় কিশোরগঞ্জে কোন মারামারি-হানাহানি নেই। তাই দেশের অন্য এলাকার চেয়ে কিশোরগঞ্জ আলাদা, কিশোরগঞ্জের সংস্কৃতিও আলাদা। তিনি বলেন, কিশোরগঞ্জ আগের কিশোরগঞ্জ নেই। কিশোরগঞ্জের হাওর আর ভাটি এলাকার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। রাষ্ট্রপতি দল-মতের উর্ধ্বে থেকে কিশোরগঞ্জ ডিষ্ট্রিক্ট এসোসিয়েশনকে আরো শক্তিশালী করে কিশোরগঞ্জবাসীদের মধ্যকার সৌহার্দ্য-স্প্রীতি আরো জোরদার করার উপর গুরুত্ব দেন।
পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন কবরা হয়। বিপুল সংখ্যক প্রবাসী কিশোরগঞ্জবাসীসহ কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন পরিদর্শন
এদিকে প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ একই দিন বিকেলে (১৯ জুন, নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটায়) জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন পরিদর্শনে পরিদর্শন এবং কুটনীতিক ও অফিসিয়ালদের সাথে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। এর আগে তিনি ঘুরে ঘুরে মিশনের বিভিন্ন স্মৃতি চিহ্ন অবলোকন করেন। মিশনে নিযুক্ত মিনিস্টার  (প্রেস) মামুন-অর রশীদ জানান, মতবিনিময় সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন স্থায়ী প্রতিনিধি ড.এ.কে আব্দুল মোমেন। তিনি প্রেসিডেন্টর কাছে মিশনের কর্মকান্ডের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ আজ জাতিসংঘের অনেকগুলো কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং সকল সদস্য দেশের সাথে মধুর সম্পর্ক বজায় রেখে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আজ আমরা জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে প্রথমবারের মত একজন মহামান্য প্রেসিডেন্টকে পেয়েছি। যা ইতিহাসের একটি অংশ হয়ে থাকবে।
সভায় প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ বলেন, আপনারা প্রত্যেকে দেশের এক একজন রাষ্ট্রদূত। আপনাদের কথা, চাল-চলন, আচার-আচরনের মাধ্যমে আপনারা দেশকে এই বিদেশের মাটিতে উজ্জলভাবে তুলে ধরবেন। এখানে আপনারাই বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহন করে আপনারা অংশীদারিত্ব হবেন এটাই আমার একান্ত আহবান।

You Might Also Like