শিল্প-সাহিত্যপ্রেমী মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত ২৩তম আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলা

আবহাওয়া বার্তায় ছিল উদ্বোধনের দিন শুক্রবার বৃষ্টি হবে। এজন্য আয়োজকদের মনে একপ্রকার আশংকাও ছিল। কিন্তু শুভ উদ্যোগ ও ভালো কিছু করার প্রত্যয় ছিল তাদের। তাই আকাশে মেঘের ভেলা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের কিছুক্ষণ পরে ২৩তম আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলা ফিতা কেটে উদ্বোধন করেন কবি মহাদেব সাহা। সাড়ম্বরে। সগৌরবে।
আলোকিত মানুষের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে উদ্বোধনী সময় ও দিন। লেখক-পাঠক উৎসাহী প্রবাসী বাঙালীদের আনন্দ হৈ চৈ বুঝিয়ে দেয় বাংলা উৎসব ও বইমেলার আয়োজন যথার্থ রূপ পেতে যাচ্ছে এবং পেয়েছেও।
স্বরচিত কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, বইয়ের পরিচিতি, লেখক-পাঠক মুখোমুখি, আমিন্ত্রত অতিথিদের সাথে আড্ডা, বাংলা লিখন, চিত্রাঙ্কন, নৃত্য, সঙ্গীত ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, সেমিনার, মুক্ত আলোচনা, নাটক, সঙ্গীত, নৃত্যানুষ্ঠানে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ইউরোপ, কানাডা ও আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যের শতাধিক কবি-লেখক-সাহিত্যিক-আবৃত্তিকার ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে গত ১৩, ১৪ এবং ১৫ জুন  নিউইয়র্কের লংআইল্যান্ড সিটির উইলিয়াম ব্রায়ান্ট হাই স্কুলে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন আয়োজিত ২৩তম আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্বেও আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে বাঙালি। তাদের নিয়েই গত ১৩ জুন বিকেলে এক আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে ফিতা কেটে বইমেলার উদ্বোধন করেন কবি মহাদেব সাহা।
সংবাদ সংস্থা এনা’র খবরে বলা হয়: বই মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি মহাদেব সাহা বলেন, বাংলাদেশ ও কলকাতার বাইরে নিউইয়র্কের এই মেলা হচ্ছে  বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেলা ও বাঙালির উৎসব। নিউইয়র্কের বই মেলা ও বাংলা উৎসব আজ বিশ্ব বাঙালির মিলন উৎসবে পরিণত হয়েছে। ফিতা কেটে বই মেলা ও বাংলা উৎসবের উদ্বোধনের আগে ২৩ বছরের ২৩ টি মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন বিশেষ অতিথি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওমাবার এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমিটির উপদেষ্টা ড. নীনা আহমেদ, চ্যানেল আই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও শিশু সাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত কবি ও সাহিত্যিক কণা বসু মিশ্র, কবি দাউদ হায়দার, সাহিত্যিক মাঈনুস সুলতান, ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন, প্রাবন্ধিক অর্ভিন ঘোষ, লেখক মৃণাল চৌধুরী, তাজউদ্দিন আহমেদের কন্যা ’তাজউদ্দিন আহমেদ নেতা ও পিতা’ গ্রন্থের লেখিকা শারমিন আহমেদ, লেখক ও সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি, ছড়াকার আমীরুল ইসলাম, কবি ও সাংবাদিক নাজমুন নেসা পেয়ারি, লেখক ও প্রাবন্ধিক হাসান ফেরদৌস, কবি সেজান মাহমুদ, সাংবাদিক মনজুর আহমদ, মেলার আহবায়ক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, কবি মোস্তফা সারোয়ার, লেখক ও প্রাবন্ধিক ফেরদৌস সাজেদীন, কন্সাল জেনারেল শামীম আহসান, নজরুল গবেষক ড. গুলশানারা কাজী, কবি তনুশ্রী ভট্টাচার্য্য ও উৎসব ডট কমের ম্যানেজিং পার্টনার রায়হান জামান।

তিন দিনের মেলা যেন কবি, লেখক এবং পাঠকদের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিলো। বাংলা সংস্কৃতির জয়গানের ধ্বনি উচ্চারণে নতুন আবহ সৃষ্টি হয়েছিলো। সবকিছুতেই বাঙালিয়ানা। মেলায় বাংলা সাহিত্য, বিশ্ব সাহিত্য, বাংলা সংস্কৃতি, লেখিকা তসলিমা নাসরিন, দাউদ হায়দার প্রসঙ্গ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মৌলবাদ, গণতন্ত্র থেকে শুরু করে মূলধারায় বাঙালির অবস্থান পর্যন্ত উঠে এসেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কবি মহাদেব সাহা বলেন, বাংলাদেশ ও কলকতার বই মেলার পর নিউইয়র্কে বাংলা বই মেলা হচ্ছে সবচেয়ে বড় বই মেলা। নিউইয়র্কের বই মেলা এবং বাংলা উৎসবকে বিশ্ব বাঙালির মিলন উৎসব বলে আমি মনে করি। তিনি আয়োজক মুক্তধারাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমি তাদের আমন্ত্রণে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে এসেছি। আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন, আমি আবিষ্কার করেছি বই মেলা এবং বাংলা উৎসবের। কলম্বাস বই আবিষ্কার করতে পারেননি, আমি বই আবিষ্কার করেছি। তিনি আরো বলেন, আজকে আমরা যে বই মেলায় এসেছি, সেই মেলা ৩ দিন দিনের, আমি প্রত্যাশা করি আগামীতে মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে। ড. নীনা আহমেদ বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠান আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য এবং আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই মেলা হচ্ছে আমাদের ভাষার মেলা, এই মেলা হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যের মেলা, এই মেলা হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতির মেলা। প্রবাসে জন্ম নেয়া এবং বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা ধরে রাখতে হলে এই মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। এই ভাষার জন্য ১৯৫২ সালে ভাষা সৈনিকরা জীবন দিয়েছিলেন। তার পাশাপাশি দেশের জন্য ১৯৭১ সালে জীবন দিয়েছিলেন বীর বাঙালি। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা ভাষা এবং দেশ পেয়েছি। তিনি বলেন, আমি গর্বের সাথে বলতে চাই- আজকে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষায় রূপ লাভ করেছে, আন্তর্জাতিক ভাষায় পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না আমরা কোন দেশ থেকে এসেছি। সেই দেশের কালচার, কৃষ্টি এবং ঐতিহ্য কী তা আমাদের ধরে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে শেকড় ভুলে যাওয়া মানেই সবকিছু ভুলে যাওয়া। তিনি আরো বলেন, আপনারা জানেন আমি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার এশিয়া প্রশান্তমহাসাগরীয় কমিটির উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ পেয়েছি। এই প্রশাসনে আমার কাজ হচ্ছে ইমিগ্র্যান্টদের এই দেশে অন্যান্য দেশে নাগরিকরা যে সব সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন তা থেকে যেন বাংলাদেশীরা বঞ্চিত না হন। প্রেসিডেন্ট ওবামা ইমিগ্র্যান্টদের ব্যাপারে অত্যন্ত সদয়, সেই বিষয়টি আমাদের কাজ লাগাতে হবে। ফরিদুর রেজা সাগর বলেন, ২৩ বছর ধরে আমেরিকায় বাংলা বই এবং বাঙালির উৎসব হচ্ছে এটা অনেক বড় বিষয়। এখানে এসে আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা শুধু বই মেলা নয়, এটা বাঙালির মিলন মেলা। এই মেলা কখন যে এত বিশাল রূপ নিয়েছে তা ভাবতেই আনন্দ লাগে। আমরা সব সময়ই এই মেলার সাথে রয়েছি, ভবিষ্যতেও থাকবো।
দাউদ হায়দার বলেন, আমি জামার্নিতে থাকি সেখানে বাংলাদেশের বই পাই, কলকাতার বই পাই না। কিন্তু বাংলাদেশে কলকতার বই পাওয়া যায়। এই বই আদান প্রদানের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আত্মিক একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। তিনি বলেন, ১৮২৫ সাল থেকেই বই মেলা শুরু হয়েছিলো। সেই থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে এই বই মেলার আয়োজন চলছে। তারই অন্যরকম রূপান্তর নিউইয়র্কের বই মেলা। উদ্বোীনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ড. জিয়া উদ্দিন আহমেদ সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আজকে এই মেলা করা সম্ভব হয়েছে শুধু মাত্র আপনাদের জন্য। আপনারা যারা এসেছেন এবং আমাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তিনি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অতিথিদের ধন্যবাদ জানান। বই মেলা সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় উদ্বোধন করার কথা থাকলেও প্রচন্ড বৃষ্টির কারণে মেলার উদ্বোধন করা হয় রাত ৮টায়। একদিকে বৃষ্টির বাগড়া, অন্যদিকে মূল অডিটোরিয়ামে স্টেজ না পাওয়া। স্টেজ না পাওয়ার কারণে জিমনেসিয়ামে বিকল্প মঞ্চ তৈরি করা হয়। এত বড় আয়োজন, এত মাসের পরিকল্পনা, তারপরেও এমন কেন হলো? ভাগ্যভাল যে আয়োজকরা বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে তড়িঘড়ি মঞ্চ তৈরি করেছেন এবং একটু সময় নিলেও মেলার উদ্বোধন করেছেন। দেরির আরেকটি কারণের কথা উল্লেখ করলেন প্রধান অতিথি কবি মহাদেব সাহা। তিনি বলেছেন, এমন বৃষ্টি, আসতে কিছুটা দেরি হলো। এই কথাগুলো তিনি বলেছেন যখন তাকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। ঔপন্যাসিক ফেরদৌস সাজেদীনের সুন্দর এবং কাব্যিক উপস্থানায় কবি মহাদেব সাহাকে আজীবন সম্মাননার ফুল তুলে দেন ফাতেমা আহমেদ এবং উত্তরণীয় পরিয়ে দেন ডা. জিয়াউদ্দীন আহমেদ। সম্মাননা অনুষ্ঠানে কবি মহাদেব সাহা বলেন, আজ আমি মুগ্ধ, অভিভূত। আমি ছোট বেলা থেকে কবিদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। রাজা, মহারাজা, সমাজপতি, কোটিপতির প্রতি আমি আকৃষ্ট হইনি। আকৃষ্ট হই রবীন্দ্র নাথের প্রতি। রবীন্দ্র নাথ নিজেই বলেছিলেন তিনি বিশ্বের কবি, পৃথিবীর কবি। আমিও সেই কথা বিশ্বাস করি। তিনি আরো বলেন, কবি হওয়া যায় কিন্তু রবীন্দ্রনাথ হওয়া যায় না। নৃত্য এবং বৃষ্টি আমার খুব প্রিয়। আজকে অনুষ্ঠান শুরুর আগে বৃষ্টি দেখেছি, অনুষ্ঠানে এসে চমৎকার নৃত্য দেখেছি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা এবং গান অসাধারণ। আজকে আমি প্রবাস বাঙালির যে উৎসব দেখেছি, পৃথিবীর আর কোথাও এই উৎসব নেই। আমি বাংলা ভাষার একজন কবি। আমাকে যে সম্মাননা জানানো  হয়েছে, এই জন্য কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, আমাদের দেশে কোন কোন কবি এবং সাহিত্যিক আছেন যারা বলেন, তারা পুরস্কার বা স্বীকৃতির জন্য লিখেন না, আমি বলি আমি পুরস্কার বা স্বীকৃতির জন্য লিখি। আমি যতদিন বেঁচে থাকবো, ততদিন যেন বাংলা ভাষার সঙ্গে থাকতে পারি এবং লিখতে লিখতেই চলে যেতে পারি। তিনি তাকে দেয়া সম্মাননা মুক্তধারাকে উৎসর্গ করেন। বই মেলার উদ্বোধনের পর পরই পরিবেশন করা হয় উদ্বোধনী সঙ্গীত। ধৃতি নৃত্যশালার ’ আমার বাংলা’ নামকরণে নৃত্য অনুষ্ঠানটি ছিলো অপূর্ব। এই নৃত্যানুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ওয়ার্দা রিহাব। ধৃতি নৃত্যশালার শিল্পীরা এসেছিলেন ঢাকা থেকে।
কবি মহাদেব সাহাকে সম্মাননা জানানোর পূর্বেই সঙ্গীত পরিবেশন করেন সঞ্চারি ভট্টাচার্য্য। তার পরেই জামালউদ্দিন হোসেনের নির্দেশনায় পরিবেশন করা হয় রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিয়ে নাটক দ্বিতীয় বিজয়া। নাটকে অংশগ্রহণ করেন জামাল উদ্দিন হোসেন ও সেমন্তী ওয়াহেদ। নৃত্যে ছিলেন সুস্বনা চৌধুরী ও অভিজিত রায়। নাটকটির রচনায় আসাদুল ইসলাম, আবহ সঙ্গীতে গোলাম সারোয়ার হারুন। নাটকটি যখন চলছিলো তখন শব্দযন্ত্রের বিভ্রাট ছিলো। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন উৎসব ডট কমের রায়হান জামান, বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থার সহ-সভাপতি মেছবাহ উদ্দীন আহমেদ প্রমুখ। রায়হান জামান বলেন, সব ভাল কাজের সহযোগিতায় আমরা আছি এবং আগামীতেও থাকবো। মেলার প্রথম দিনে উদ্বোধন করা হয় গোপাল সান্যালের ব্যবস্থাপনায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রদর্শনী একাত্তর ছবিতে ও কথায়। উদ্বোধন করেন মুক্তিযোদ্ধা ড. নূরন নবী। এই সময় আরো উপস্থিত ছিলেন  কবি মহাদেব সাহা, ফরিদুর রেজা সাগর, ঠিকানার প্রেসিডেন্ট ও সিওও সাঈদ- উর -রব, মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের সভাপতি বিশ্বজিত সাহা, ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা গোপাল সান্যাল প্রমুখ। ডানা ইসলামের পরিচালনায় গানের ভেলায় সঙ্গীত পরিবেশন করেন টরন্টো থেকে আগত শিল্পী শিরিন চৌধুরী, নিউইয়র্কে বসবাসরত শিল্পী জাভেদ ইকবাল ও কানাডা প্রবাসী ফারহানা শান্তা।
এ ছাড়াও মেলায় বাংলাদেশের বিশিষ্ট ফটো সাংবাদিক পাভেল রহমানের আলোকচিত্র আমার বাংলা প্রদর্শনী করা হয়। ব্যবস্থাপনায় ছিলেন আবুল ফজল। পাভেল রহমানের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ফরিদুর রেজা সাগর। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দার।
এছাড়াও বইমেলা প্রাঙ্গণে খান’স টিউটোরিয়ালের  প্রধান ড. মনসুর খানের বই’র মোড়ক উন্মোচন করেন ফরিদুর রেজা সাগর। এদিন কানাডা প্রবাসী রুমানা চৌধুরীর দুটি আবৃত্তির সিডির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। একটি করেন ফরিদুর রেজা সাগার। অন্যটি বিশ্বজিত সাহা ও রুমা সাহা।
মেলার উদ্বোধনী দিনে বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বই প্রেমী মেলায় এসেছিলেন। তারা মেলায় এসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগের পাশাপাশি বাংলাদেশ, কলকাতা এবং স্থানীয় বই’র স্টল ঘুরে দেখেছেন। কেউ বা কবি, লেখকদের সাথে চুটিয়ে আড্ডা মেরেছেন। সঙ্গীত পরিবেশন শেষেই মেলার প্রথম দিনের আয়োজন শেষ হয়। দ্বিতীয় দিন বই মেলা ও বাংলা উৎসবের দ্বিতীয় দিন ১৪ জুন শুরু হয় নতুন প্রজন্মের শিশু- কিশোরদের মধ্যে নৃত্য, সঙ্গীত ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। মোশাররফ হোসেনের সমন্বয়ে বেবি মন্ডল, আল্পনা গুহ ও সৃদৃতা পালের ব্যবস্থাপনায় প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে জেরিন।
উদীতা তন্বী সঞ্চালনায় নতুনের আহবান অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে শ্রুতিকনা, অংকিতা, পীরান ইকবাল ও মোহনা বোস। প্রবাসের বিশিষ্ট ছড়াকার মনজুর কাদেরের পরিচালনায় স্বরচিত কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন অতিথি কবি মহাদেক সাহা, দাউদ হায়দার, আব্দুর রাজ্জাক, কনা বসু মিত্র, জুনায়েদ আক্তার, ধনঞ্জয় সাহা, ফারহানি পলি, তনুশ্রী ব্যানার্জি, হুমায়ুন কবীর, মোস্তফা সারওয়ার, রুমানা চৌধুরী, হোসেইন কবীর, মৌ মধুবসন্তী, নাজমুন নেসা পেয়ারি, হুমায়ুন কবীর ঢালি। অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের গণমানুষের কবি প্রয়াত কবি দিলওয়ারের স্মরণে করা হয়। অনুষ্ঠানে কবি মহাদেব সাহা বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি, আমরা গণজাগরণ মঞ্চ করি কিন্তু দাউদ হায়দার ও তসলিমা নাসরিনের মত কবি ও লেখকদের বাংলাদেশে নিতে পারি না। তিনি আরো বলেন, কবি দিলওয়ার আমার খুব পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন আসলে গণমানুষের কবি, আমি তাকে আজ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। তিনি বলেন, যারা কবি বা লেখক তারা মানুষের ভাবনা নিয়ে কবিতা বা বই লিখেন, সাহিত্য রচনা করেন। আমাদের কখনো স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের শত্রুর বিরুদ্ধে, মৌলবাদের বিরুদ্ধে কবিতা লিখতে হয়। কেউ তার মত সরাসরি প্রকাশ করেন, কেউ করেন না। তসলিমা নাসরিন তা সরাসরি প্রকাশ করেছিলেন। বাংলাদেশের কবিতায় প্রতিবাদী ধারা চলে এসেছে, কলকাতার কবিতার ধারা হচ্ছে ব্যাঞ্জনার ধারা। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে আমরা আমাদের কবিতায় সময়ের ধারাকে ধরার চেষ্টা করেছি। যে কারণে আমাদের কবিতার মধ্যে অসাধারণ গতি রয়েছে। কবিতা হচ্ছে না বলা শ্রেষ্ঠ কথা, কবিতায় সমস্ত বোধকে ধারণ করার চেষ্টা করা হয়, যদিও কোন কোন সময় তা সম্ভব হয় না। নাদিম আহমেদের পরিচালনায় নতুন প্রজন্মের অনুষ্ঠান যুবকণ্ঠে অতিথি ছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামার এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমিটির উপদেষ্টা ড. নীনা আহমেদ। প্রবাসে জন্ম নেয়া এবং বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের শিশু কিশোরদের উদ্দেশে নীনা আহমেদ বলেন, আমরা যখন জন্ম গ্রহণ করি তখন প্রথম কথাটি আমাদের কানে বাজে বাংলায়। বাবা- মা যখন কথা বলেন, বাংলায় বলেন। সুতরাং আমরা যেখানেই থাকি না কেন আমাদের সংস্কৃতিকে লালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে আমরা কোন দেশ এবং সংস্কৃতি থেকে এসেছি তা ভুলে গেলে চলবে না। আমরা যদি তা ভুলে যাই তাহলে আমরা হারিয়ে যাবো। তিনি নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তিনি কীভাবে সাফল্য লাভ করেছেন তা উল্লেখ করে বলেন, প্রত্যেক মানুষের স্বপ্ন থাকে রোল মডেল থাকে। স্বপ্ন পূরণের জন্য রোল মডেলকে অনুসরণ করতে হয়। আমাকে সাহায্য করেছেন ডা.জিয়াউদ্দিন আহমেদ এবং তার স্ত্রী। তিনি বলেন, এখানে যারা জন্ম গ্রহণ করছো তোমরা আমার মেয়ের মত হয়ত বাংলা বলতে পার না কিন্তু বুঝতে পার। আমি বলতে পারি কিন্তু লিখতে পারি না। তাই বলে কী ছেড়ে দেবো? কখনো না। তিনি বলেন, তোমরা এই দেশের নাগরিক। সুতরাং এই দেশে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হলে, অধিকার আদায় করতে হলে অবশ্যই রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে হবে। রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ছাড়া এই দেশে আমাদের মত সংখ্যালঘুদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। তিনি কীভাবে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন তাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমি জন হাওয়ার্ডের নির্বাচনে ক্যাম্পেইন করি, স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। আমি আমার এলাকার মানুষের বাসায় বাসায় গিয়েছি। তাদের সাথে কথা বলেছি, তাদের আমাদের বাসায় নিমন্ত্রণ করেছি। বিশ্বাস করুন, এই পৃথিবীতে সব মানুষ এক। তাদের মন এক, হয়ত রং- এর ভিন্নতা থাকতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের মেন্যুতে থাকলে হবে না, টেবিলে থাকতে হবে। প্রয়োজনে ইন্টারনেট ব্যবহার করা যেতে পারে, মানুষের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে, ভলেন্টিয়ারের কাজ করতে হবে। আর এই সব কাজে বাবা মাকেও তার সন্তানকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমাদের স্কিল আছে কিন্তু ভাষা নেই। আশা করি নতুন প্রজন্মের সেই সমস্যা হবে না। তিনি আরো বলেন, আমি মূলধারার সাথে কাজ করছি এবং আমার একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেই কাজে। একদিন আমাকে হোয়াইট হাউজ থেকে ফোন করা হলো এবং বলা হলো প্রেসিডেন্ট ওবামা আপনাকে তার উপদেষ্টা নিয়োগ করেছেন। আমি জানি না কেন প্রেসিডেন্ট আমাকে বাছাই করলেন এবং কারা আমাকে নমিনেশন দিয়েছেন। তিনি বলেন, এর অর্থ হচ্ছে আপনি যদি কাজ করেন তার মূল্যায়ন হবে। কেউ কেউ আপনার ভাল কাজ প্রত্যক্ষ করছেন। তিনি অনুষ্ঠানে নতুন প্রজন্মের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। কবি ফারুক ফয়সলের সঞ্চালনে বুদ্ধদেব বসুর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলিতে আলোচনায় অংশ নেন লুৎফুর রহমান রিটন এবং কবিতা আবৃত্তি করেন ক্লারা রোজারিও ও আবীর আলমগীর। ছড়া পাঠ ইশতেহারে অংশ নেন ছড়াকার আমীরুল ইসলাম ও দর্পন কবীর। প্রবাসের জনপ্রিয় আবৃত্তিকার জি এইচ আরজুর পরিচালনায় আবৃত্তিতে অংশ নেন মেরি রাশেদীন, শেখর গোমেজ, আহমেদ হোসাইন, দিলারা নাহার বাবু ও তাহমিনা জাফর। ’বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ অনুষ্ঠানে ছোট গল্পকার ও কলাম লেখক মাসুদা ভাট্টি বলেন, আমরা যখন বাংলাদেশ থেকে প্রবাসে আসি তখন আমরা আমাদের হৃদয়ে সব সময় একটি ছোট্ট বাংলাদেশকে নিয়ে আসি। আমরা এই বাংলাদেশকে আমাদের শরীরের ভিতরে রাখি। কারণ প্রবাসে আমরা অন্য মানুষ এবং অন্য সংস্কৃতির সাথে থাকি। আমি এখন বলতে পারি আমরা যারা প্রবাসে আসি তারা আসলে বিশ্ববাঙালি। সেজান মাহমুদ বলেন, হৃদয় বলতে কী, হৃদয়ে আমরা কী ধারণ করি, তা পৃথিবীর যেখানেই থাকি না কেন তা বাংলায় প্রকাশ করি। আমরা যারা প্রবাসে থাকি তাদের মধ্যে একটা শূণ্যতা হয়ত কাজ করে, সে কারণেই আমরা আমাদের শিল্প, সাহিত্যকে লালন এবং পালন করার চেষ্টা করি। আমরা ঢাকায় থাকলে এই শূন্যতা অনুভব করি না। ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদের সঞ্চালনায় ’তাজউদ্দিন আহমেদ নেতা পিতা’ গন্থের লেখিকা শারমিন আহমেদ সেমিনারে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন আমাদের প্রেরণার উৎস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন একে অন্যের পরিপূরক। শেখ মুজিব স্বপ্ন দেখেছেন আর তাজউদ্দিন আহমেদ তা বাস্তবায়ন করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে এখন এক ব্যক্তিকেই বড় করে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, সমস্ত ক্রেডিট তাকে দিতে গিয়ে তাজউদ্দিনসহ অন্যান্য বীরদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। সেই সাথে সব কিছু হাইজ্যাক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে স্বাক্ষর করতে চাননি। তিনি দর্শকদের উত্তরে বলেন, আমার হয়ত ক্ষোভ থাকতে পারে কিন্তু এই ক্ষোভের বহি:প্রকাশ এই বইতে স্থান পায়নি। কারণ এই বই-এর মধ্যে আমি ২০ পাতার অধিক ডকুমেন্টস দিয়েছি। এটি হচ্ছে একটি ইতিহাস। যা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস বিকৃতি থেকে রক্ষা করবে। বেঙ্গলী হার্লেম নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন লেখক বিভেক বাল্ড। এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী রথীন্দ্র নাথের উপস্থাপনায় এক মহাপ্রয়াণ অনুষ্ঠানে মান্নাদের স্মরণ অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন জীবন বিশ্বাস, শহীদ হাসান, খায়রুল ইসলাম সবুজ, অসীত চৌধুরী ও দেলোয়ার হোসেন। মান্নাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন জীবন চৌধুরী। নওগাঁ থেকে নিউইয়র্ক শিরোনাম অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ২০১৪ সালের বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ড. মাহফুজুর রহমান। কাজী নজরুল ইসলামের ১১৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বুলবুলি অনুষ্ঠানে কাওয়ালি পরিবেশন করে দর্শকদের হৃদয় জয় করে নেন সৌখিন শিল্পী গোষ্ঠির কাশফিয়া বিল্লাহ, সালাউদ্দিন আহমেদ, রাজিয়া আহমেদ, লিনা হোসেন, মোসাদ্দেক হোসেন ও সুমি বেগম। অনুষ্ঠানটি পরিচালনায় ছিলেন সোহরাব হোসেন এবং সঞ্চলনায় ছিলেন গোপন সাহা। মোহন বাঁশি বাজে অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করেন নন্দিতা দাস। শান্তা নাগের পরিচালনায় সময়ের স্রোতে গীতি নকশায় অংশ নেন মোল্লা বাহাউদ্দীন পিয়াল, নীরা বাহাউদ্দীন, আয়েশা দেওয়ান লিপি, পূর্বাশা রুদ্র রায়, জয়ন্ত নাগ ও শান্তা নাগ। গীতি নকশায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তুলে ধরা হয়। বন্দে মাতারম থেকে জয় বাংলা শ্লোগান। মৃনাল’স লেটার শিরোনামে রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর পত্র অবলম্বনে ইংরেজি একক অভিনয়ে অংশ নেন গার্গি মুখোপাধ্যায়। সউদ চৌধুরীর বর্ণময় উপস্থাপনায় পঞ্চকবির গানের অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন তন্দ্রা, শবনম আবেদী, সুপ্রিয়া চৌধুরী, সেলিমা আশরাফ, অনিন্দিতা ভৌমিক। পঞ্চ কবির গানের অনুষ্ঠানে শিল্পীরা অনিন্দ্য সুন্দর সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এই দিনের শেষ শিল্পী ছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। তিনি স্বভাবসূলবভাবেই প্রতিটি গান কেন রবীন্দ্র নাথ রচনা করেছিলেন, প্রেক্ষাপট কী ছিলো তা বর্ণনা করেন। বন্যার গান হলে উপস্থিত দর্শকরা প্রাণভরে উপভোগ করেন। ফারহানা শান্তা যদি একটি গানের কথা বলে তিনটি গান পরিবেশন না করতেন তাহলে বন্যার অন্তত: আরো কয়েকটি গান দর্শকরা আরো বেশি শুনতে পেতেন। প্রথম দিনে বৃষ্টি ও বজ্রপাতের ছোবল থাকলেও দ্বিতীয় দিনে দর্শক ও বই পিপাসু মানুষের ভীড় ছিলো লক্ষ্যণীয়। বই মেলা এবং বাংলা উৎসবের সার্থকতা খুঁজতে হলে দ্বিতীয় দিনের কাছেই যেতে হবে। পড়ন্ত বিকেলে বই মেলার প্রাঙ্গণ যেন একুশের বই মেলার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। লুৎফর রহমান রিটনসহ অন্যান্য কবি লেখকরা যেন অনুষ্ঠানের বাইরে স্কুলের সামনেই বেশি বসে ছিলেন। আর সুযোগও নিয়েছেন আগত বইপ্রেমী মানুষ। সুযোগ পেয়েছেন তো ক্লিক। কারণ এখন আর ইলেট্রনিক্স ডিভাইসের অভাব নেই, হাতের মুঠোতেই সব। ফটো তুলছেন আর ফেইসবুকে সেঁটে দিচ্ছেন। এক পর্যায়ে দাউদ হায়দার তো বলেই ফেললেন, ছবি তুলুন অসুবিধা নেই কিন্তু ফেইস বুকে দেবেন না। আডডা, আনন্দ, উচ্ছাস আর আলোচনায় শেষ হলো দ্বিতীয় দিনের বই মেলা। মিলনই যদি প্রেমিক প্রেমিকার স্বার্থকতার সজ্ঞা হয়, বই প্রেমীদের সাথে মেলায় বই এর প্রেম হয়েছে, সুতরাং আয়োজকরা সার্থকতা খুঁজতে পারেন। তৃতীয় দিন তৃতীয় দিনের বই মেলারও যাত্রা নতুন প্রজন্মের প্রতিযোগিতা দিয়ে। এ দিন বিষয়বস্তু ছিলো বাংলা লিখন ও চিত্রাঙ্কন। সিকদার আমিনুল হক কক্ষে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে ব্যবস্থাপনায় ছিলেন নাসরিন চৌধুরী ও জেবু চৌধুরী।

এদিন দুপুর ১২টায় অনুষ্ঠিত হয় আমন্ত্রিত অতিতিদের সাথে প্রাতরাশসহ আড্ডা। সাংবাদিক লেখক রওশন জামিলের আড্ডাটি সঞ্চালনের কথা থাকলেও এটি বস্তুত করেন লেখক-প্রাবন্ধিক হাসান ফেরদৌস। প্রায় ৫০ এর অধিক আমন্ত্রিত লেখক সাহিত্যিকের প্রাণবন্ত আড্ডাটি অংশগ্রহণকারীদের মনে থাকবে।

আলী আনোয়ার কক্ষে মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বিষয়বস্তু ছিলো শাহবাগের শিক্ষা। আলোচনায় অংশ নেন সৈয়দ হাসান ইমাম, মাসুদা ভাট্টি, রোকেয়া হায়দার, পাভেল রহমান ও ফকির ইলিয়াস। হুমায়ুন কবীরের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে শাহবাগের আলোচকরা শাহবাগ আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশকে যুদ্ধাপরাধী মুক্ত করতে হলে শাহবাগের চেতনার দরকার আছে।
হাসান ফেদৌসের পরিচালনায় কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন বাঙালির সম্পাদক কৌশিক আহমেদ, জি এইচ আরজু ও শিকাগো প্রবাসী লেখক খায়রুল আনাম।
কবি ফারুক আজমের পরিচালনায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন তনুশ্রী ভট্টাচার্য্য, সৈয়দ শহীদ, রাজ্জাক হায়দার এবং সঙ্গীত পরিবেশন করেন পার্থ সারথী, সুনীলের চিঠি পাঠ করে শরফুজ্জামান মুকুল। লোকে বলে বলে রে অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন দুলাল ভৌমিক এবং ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান করেন শিল্পী তাজুল ইমাম। নৃত্যে ছিলেন শ্বেতা গোস্বামী এবং চেতনায় হানছে আঘাত নাটকে অভিনয়ন করে প্রশংসিত হন রেখা আহমেদ, বসুনিয়া, সুমি, রাহি, জেফরি, কাজল ও গোলাম সরোয়ার হারুন। বই মেলায় বাবা দিবস উপলক্ষ্যে বিশ্বজিত সাহার  কন্যা বহতা সাহা বাবার জন্য কেক নিয়ে আসেন। কেকটি কাটেন কবি মহাদেব সাহা।  তিন দিনের বই মেলার শেষ হলো আহবায়ক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদের সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে। তিন দিনের বই মেলার উপস্থাপনায় ছিলেন সাবিনা হাই উর্বি, গোপাল সান্যাল, হোসেন শাহরিয়ার, সাদিয়া খন্দকার, মিজানুর রহমান বিপ্লব। পুরো অনুষ্ঠানটির দায়িত্বে ছিলেন সেমন্তী ওয়াহেদ। অনুষ্ঠানমালা নির্মাণ করেছেন হাসান ফেরদৌস।
বইমেলায় বাংলাদেশ থেকে যোগ দেয় আহমেদ পাবলিশার্স, বাংলাপ্রকাশ, কথাপ্রকাশ, সময় প্রকাশন, বিদ্যাপ্রকাশ, গতিধারা, স্টুডেন্ট ওয়েজ, প্রীতম প্রকাশ। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিশ্বভারতী, আনন্দ পাবলিশার্স, পত্রভারতী, সাহিত্যম প্রকাশনা সংস্থার স্টল বসে। এছাড়া নিউইয়র্কের মুক্তধারা, লেবু ভাই ফাউন্ডেশন ও ইসলামিক বুক ফাউন্ডেশন। বইমেলার ২৩ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক ১৫টি বইয়ের স্টল এবার অংশগ্রহণ করে।  এবং বইমেলা এবং অন্যান্য দেশজ সামগ্রীর মেলা পৃথক করে আয়োজকরা বইমেলাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের চিত্র প্রদর্শনী ক্লাস রুমে না করে বইমেলার স্থানে করলেই ভালো হতো বলে অভিজ্ঞমহলের ধারণা। এই বইমেলার যত লেখক-সাহিত্যিকই উপস্থিত হয়েছেন তার মধ্যে বইমেলার উদ্বোধক কবি মহাদেব সাহার বক্তব্য সকলকে আকৃষ্ট করেছে। তাঁর কবিতা পাঠ, বক্তব্য এবং তিনদিনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ছিল প্রবাসী বাঙালীদের জন্য বাড়তি পাওয়া।
সেমিনার
এ বছরের বইমেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিষয় ভিত্তিক সেমিনার ও মুক্ত আলোচনা। বইমেলার দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে মোট ৭টি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব নির্ধারিত ৭ জন সঞ্চালকের পরিচালনায় ও অতিথি আলোচকদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সেমিনারগুলো উপভোগ্য হয়ে ওঠে। সদ্য প্রয়াত দু’জন লেখকের নামে দুটি সেমিনার কক্ষের নাম নির্ধারণ করা হয়। একটি আলী আনোয়ার কক্ষ অন্যটি সিকদার আমিনুল হক কক্ষ।
১৪ জুন শনিবার শাহবাগের শিক্ষা মুক্ত আলোচনায় অংশ্রগহণ করেন মাসুদা ভাট্টি, রোকেয়া হায়দার. ড. হায়দার আলী খান, হাসান ফেরদৌস, তাজুল ইমাম, তানভীর রাব্বানী প্রমূখ। এটি পরিচালনা করেন বারুক কলেজের শিক্ষক হুমায়ূন কবীর।
এরপর ছিল ‘কেন লিখি’ বিষয়ে। এটি পরিচালনা করেন আদনান সৈয়দ। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন মাঈনুস সুলতান, রাজীব আহমেদ, নাজমুন নেসা পিয়ারী। বিশেষ অতিথি ছাড়াও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সেজান মাহমুদ, দর্পণ কবীর, জসিম মল্লিক, মাসুদা ভাট্টি, ড. লুনা ঘোষ, নির্মল চৌধুরী, তাজুল ইমাম, আলেয়া চৌধুরী, লুৎফুন নাহার লতা, নাসরীন চৌধুরী ও রানু ফেরদৌস প্রমূখ।
কেন লিখি উন্মুক্ত আলোচনায় মহাদেব সাহা বলেন, কেন লিখি আমি জানি না। সাহিত্য হচ্ছে অব্যক্ত সব ভাবনা যা মানুষের মনে জন্ম নেয়। সাধারণ মানুষ তা প্রকাশ করতে পারে না, কবি, লেখকরা তা লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করেন। মানুষের জীবনটাই হলো লেখার বিষয়। যেখানে রয়েছে, ভালোবাসার প্রভাব। জগত থেকে মায়া উঠে গেলে বা ভালোবাসা উঠে গেলে মায়ের পেটে সন্তান জন্ম নেবে না, স্বামী- স্ত্রীর সম্পর্ক থাকবে না, প্রেমিক- প্রেমিকা থাকবে না। কবিরা কেন কবিতা লিখে আমি জানি না। আমার জন্ম পাবনায়। আমাদের বাড়ির পাশে ছিলো কবিরাজ বাড়ি। রজনীকান্ত কবিরাজ। আমি চিন্তা করলাম রাজ শব্দটি বাদ দিয়ে আমি কবি শব্দটিই গ্রহণ করি। সাহিত্য কোন বায়োবিয় ব্যাপার নয়। মানুষের জীবনই সাহিত্য। সাহিত্য মানুষের জীবন থেকে রস গ্রহণ করে। মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনাবলির সম্মিলন। মানুষের শ্রেষ্ঠ স্বপ্ন অংকিত করাই সাহিত্য। তিনি বলেন, আমার মনে হয়, সঙ্গীতই হচ্ছে সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম, যদিও রবীন্দ্র নাথ বলেছিলেন চিত্রকর্ম। তার সাথে আমার এখানে পার্থক্য রয়েছে। সাহিত্য সমাজকে বদলায় এবং জীবন সংগ্রামের সেতু রচনা করে। দাউদ হায়দার বলেন, আমি যা দেখি, যা ভাবি তাই লিখি। কবি ও লেখকরা কীভাবে লিখবেন সেটা তাদের ব্যাপার। তবে আমি এটুকু বলতে পারি কবিতা মানুষের জন্য। পাঠকদেরও বলতে হবে তারা কী চান। মাসুদা ভাট্টি বলেন, ভাষা অনেক রকমের। আমরা নিজেরাও একেক জন একেকভাবে ভাষা ব্যবহার করি। কবিতা, উপন্যাস এবং সংবাদপত্রের ভাষা এক নয়। লেখা হওয়া উচিত প্রমিত ভাষায় কিন্তু অনেক সময় চরিত্রের প্রয়োজনে নোয়াখালি আঞ্চলের, সিলেট আঞ্চলের বা চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভাষা ব্যবহার করা যায়। কিন্তু ইদানিং টিভির নাটকে ঢাকা এবং ময়মনসিংহের ভাষা মিলিয়ে যে একটি বাংলিশ ভাষা তৈরি করা হচ্ছে, এটা করা উচিত নয়। কলকাতার ভাষাকে প্রমিত বলে আমরা আরেকটি বাংলিশ ভাষা তৈরির চেষ্টা করছি। পাঠক লেখক বিতর্কে জমে ওঠা এই অনুষ্ঠানে দাউদ হায়দার বলেন, কলকাতার ভাষা মোটেও প্রমিত ভাষা নয়। এলাকার উপর নির্ভর করে সেখানে ভিন্ন ভিন্ন এলাকার ভাষা ব্যবহার করা হয়। পাঠক এবং উপস্থাপক সেজান মাহমুদের এক প্রশ্নের জবাবে মহাদেব সাহা বলেন, কোন একটি প্রতিষ্ঠান বা আইন বলে দেবে আমাকে এই ভাষায় লিখতে হবে, এই শব্দ ব্যবহার করতে হবে, আমি তা কখনো মানবো না। কবির ভাষা কবি ঠিক করবেন। আমি লেখকের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আমি কারো নির্দেশ মানবো না। লেখক আদনান সৈয়দের পরিচালনায় কেন লিখি উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠানটি জমে উঠেছিলো কথায় কথায় ও মহাদেব সাহার উদ্ধৃতি ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে। এ অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ছিলেন মাইনুস সুলতান, রাজিব আহমেদ, নাজমুন নেসা পেয়ারি। লেখক সেজান মাহমুদ বলেন, লেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পর লেখকের মুত্যু হয়। এর পর চলে যায় পাঠকের হাতে। লেখার জন্য ভেতর থেকে তাগিদ থাকে, থাকে দায়বদ্ধতা। নাজমুন নেসা পেয়ারি বলেন, একটি বীজ থেকে গাছ যেমন বেড়ে ওঠে, আকাশে ক্ষীণ চাঁদ বেড়ে ওঠে পূর্ণ চাঁদ হয়ে, তেমনিভাবে ভেতরে লেখকের তাড়না আপন গতিতে তাড়া দিতে থাকে। তিনি আরো বলেন, আমার মনে পড়ে আমার প্রথম কবিতা ’যে ঘরে সোনালী বৃষ্টি’ লেখার কথা। তখন আমি ছবি আঁকতাম- লাল সিঁদুরে রং আর ঘন নীল রং দারুণ ভাল লাগতো। আমার ঘরের সব পর্দা ছিলো নীল। আমার শাড়িও ছিলো নীল। সেই তাড়না থেকেই সৃষ্টি এই কবিতার। তারপর ভাবলাম আর লিখবো না। কিন্তু বার্লিনে আমাকে অঙ্কুর প্রকাশনীর মেজবাহ আহমেদ প্রস্তাব দিলেন নোবেল বিজয়ী জার্মান লেখিকা এলফ্রিডে ইমেলিনিকের পিয়ানো গীটার সরাসরি জার্মান থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে। দ্বিধা ছিলো। কারণ লেখিকা নিজেই বলেছিলেন আমার লেখা অনুবাদ করা দূরূহ। ভাষাবিদ সুনীল সেনগুপ্ত বললেন, আমি পারবো। সেই থেকে আমার দ্বিতীয় যাত্রা। তাই আমার কাছে মনে হয় লেখার ক্ষেত্রে প্রেরণাও উল্লেখযোগ্য।
জসিম মল্লিকের সঞ্চালনে অনুষ্ঠিত হয় নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের তৃতীয় ও শেষ দিন ২০১৪ সালে প্রকাশিত নতুন বই এর মোড়ক উন্মোচন করেন কবি দাউদ হায়দার। নুরজাহান বেগমের বাঙালির অর্জন ও গৌরবের কথা, একবিংশ শতাব্দির পৃথিবীকে, মোস্তাফা সারওয়ারের অনুলিপি ঃ অন্তরঙ্গ মুহূর্ত, প্রার্থিত নির্বাসনের উন্মাদ পদাবলী, হোসাইন কবিরের সাঁকোর নীচে শান্তজল, সিনহা আবুল মনসুরের দ্বীপ ও জনপদের গল্প এবং আনিস আহমেদের ইলিশিয়ামের প্রতীক্ষায়, সালমা বাণীর ইমিগ্রেশন, জসীম মল্লিকের এইভাবে বেঁচে আছি এইভাবে, অভিমান, সুলতানা শিরীন সাজির বিষন্নতায় একা, আবেদুজ্জামান চৌধুরীর সরল ছন্দ কবিতা, মিলি সুলতানার আলৌকিক ক্ষুধা, হাসান ফেরদৌস, ইকবাল হাসান ও ফারুক ফয়সাল সম্পাদিত স্বনির্বাচিত সংকলন। আবু রায়হানের রাজা দরশন, অলকেশ দত্ত রায়ের টি টোয়ান্টি, ইমরান আনসারির সংকটের আবর্তে বাংলাদেশ, ফারুক ফয়সালের ফিরে দেখা ঃ মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও অন্যবিধ প্রসঙ্গ। ড. হুমায়ুন কবীরের এক জীবনের কথা, ঘরণী, ঘুম নিয়ে কিছু কথা, বিবস্ত্র গতর, ধনঞ্জয় সাহার প্রেম পাথরের কারখানা, শামস আল মমীনের আমি বন্ধ খোলা জানালার কাছে, আদনান সৈয়দের জানা অজানা রবার্ট ক্লাইভ, এ এম সাইদুল আনামের তসলিমা, প্যাট্রিসিয়া, তোতাপাখি এবং ঢাকা নিউইয়র্ক ভায়া মস্কো, তাহমিনা শহীদের ফেইস বুক আহা ফেইস বুক। দর্পণ কবীর এবং কানাযা প্রবাসী রুমানা চৌধুরীর বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়।
উত্তর আমেরিকায় থিয়েটার  এরপর উত্তর আমেরিকায় বাংলা নাট্য চর্চা বিষয়ে সেমিনারটি পরিচালনা করেন জামাল উদ্দীন হোসেন। আলোচনায় ছিলেন মুজিব বিন হক, দীপন রায়, সউদ চৌধুরী, গোলাম সারোয়ার হারুন প্রমূখ। উত্তর আমেরিকায় থিয়েটার মানে নাটক নিয়ে খুব জরুরী কিছু কথা হয়ে গেল ১৪ জুন দুপুর তিনটায় আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বই মেলার একটি সেমিনার কক্ষে। প্রবাসে বিশেষত তৃতীয় বাংলার কেন্দ্র বলে ইতিমধ্যেই স্বীকৃত নিউইয়র্কে থিয়েটার নিয়ে আয়োজিত সেমিনারটিতে প্রবাসের বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব একুশে পদক প্রাপ্ত জামাল উদ্দিন হোসেন, সউদ চৌধুরী, মুজিব বিন হক এবং দীপন রায় কথা বলেন। পরে ড্রামা সার্কলের সভাপতি আবীর আলমগীরও আলোচনায় অংশ নেন। সেমিনারটির সঞ্চালনায় ছিলেন জামাল উদ্দিন হোসেন। তিনি সূচনা বক্তব্যেই বলেন, মানুষের জীবন যদি নাটক হয়, তবে মানব সমাজের সূচনাকাল থেকেই নাটকের অভ্যুদয়। ১২ শ’ বছর আগে চর্চাপদ থেকে তা বেশ স্পষ্ট। আর ১৮৭৬ এ প্রথম যে বাংলা নাটকটি মঞ্চস্থ হয় সেটি ছিলো বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়ের নীল দর্পণ। এরপর জনাব হোসেন বিভিন্ন পর্ব ধরে ধরে নাটকের ক্রম বিবর্তনের ইতিহাস তুলে ধরেন। রবীন্দ্র নাথকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ আধুনিক নাট্যকার উল্লেখ করে তিনি ভারতে শিশির ভাদুরী, উৎপল দত্ত, শম্ভু মিত্রের নাট্য আন্দোলন পার হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর নব নাট্য আন্দোলনের ধারা তুলে আনেন অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় মনোগ্রাহী করে একেবারে ছবির মত। তিনি প্রবাসের নাট্য চর্চার বাধা ও সম্ভাবনার নানা দিকও তুলে ধরেন নানা দৃষ্টান্ত সহকারে। জামাল উদ্দিন হোসেনের আলোচনার সূত্র ধরেই প্রবাসে নাট্য চর্চার গোড়ার কথা, হালের কথা সবিস্তারে টেনে আনেন মুজিব বিন হক। বিস্তারিত হলেতো একটু দীর্ঘ হবেই। তাই যথারীতি তিনি তার লিখিত বক্তব্য শেষ করতে পারলেন না সময়ের নির্মমতায়। তবে যেটুকু বললেন সেটাও অনেক এবং তাতেই পাওয়া গেল কী সংকট এবং সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে প্রবাসের নাটক পাগল মানুষদেরকে। খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হলো মরহুম মুক্তাদির, এস এম সোলায়মান, সউদ চৌধুরী, ঝর্না চৌধুরী, স্বপ্ন কাউসার, ফজলুল কবির, লিটন, চঞ্চল, মিল্টন, রীপা আহমেদ, মুকিত, আলমগীরদের নাম। নাটকের পোকা মাথায় ছিলো বলেই তাদের অস্থিরতার কাছে হার মানে প্রবাস জীবনের সকল সীমাবদ্ধতা। জামাল উদ্দিন হোসেনের সূচনা কথা যদি ভূমিকা হয়, তবে সউদ চৌধুরীর বক্তব্য উপসংহার বলা যায়। তাঁর কথাতেও নষ্টালজিয়া খুঁজে পাওয়া গেল। কী করে এই প্রবাসে নাট্য চর্চার পথ চলা, কী করে এতটা পথ আসা হলো। প্রতিবন্ধকতার গিটগুলোও তিনি তার আলোচনায় তুলে আনেন এবং বর্তমানে যে অচলায়তন এবং সীমাবদ্ধতা তা ডিঙানোর জন্য তিনি প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সুধী ও বিত্তশালী চিত্তবানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতার উপর জোর দেন।
সালমান কক্ষে নতুন প্রজন্মের আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন ড. নীনা আহমেদ। আলোচনা ও প্রশ্ন উত্তর পর্বে অংশগ্রহণ করেন রাহাত নাসরিন হোসাইন, কারিশমা রহমান আজমত ও সাঈদা হোসাইন। এ ছাড়াও নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণে আরো বেশ কয়েকটি সেমিনার বিভিন্ন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। মূল মঞ্চে শিশু কিশোরদের মধ্যে যারা বিজয়ী হয়েছেন তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন লায়লা হাসান ও মাঈনুস সুলতান। রওশন জামিলের পরিচালনায় লেখকদের আড্ডায় ছিলেন মহাদেব সাহা, দাউদ হায়দার। পাঠকদের মুখোমুখি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন মহাদেব সাহা, লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, মাঈনুস সুলতান, মাসুদা ভাট্টি, হুমায়ূন কবীর ঢালী, সেজান মাহমুদ, মেছবাহ উদ্দিন আহমেদ, মজিবুর রহমান খোকা, দর্পণ কবির প্রমুখ। এটি পরিচালনা করেন ফাহিম রেজা নূর।
মনজুর কাদেরের পরিচালনায় নিউইয়র্ক প্রবাসী কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন নূরুল হক পাশা, লিয়াকত আলী, খিজির হায়াত, জুয়েল আহমেদ, চারু হক, সহুল আহমেদ, নাসিরুল্লাহ মুহাম্মদ, খান শওকত, মাকসুদা আহমেদ, এবিএম সালেহ উদ্দিন, সোনিয়া কাদের, সেলিম আনোয়ার, মামুন জামিল, খন্দকার জাহাঙ্গীর, সৈয়দ মামুনুর রশিদ, নূরজাহান কাদের, ফকির ইলিয়াস, তমিজ উদ্দিন লোদী ও শামস আল মমীন।

তানভীর রাব্বানীর সঞ্চালনায় এই বছরের নতুন বই’র অনুষ্ঠানে অতিথি আলোচক ছিলেন কবি মহাদেব সাহা ও লুৎফুর রহমান রিটন। অংশগ্রহণে ছিলেন হোসাইন কবীর, ডা. হুমায়ুন কবীর, ড. সাজেদ কামাল, সিনহা আবুল মনসুর, ধনঞ্জয় সাহা, ফারুক ফয়সাল, বেগম নুরুজাহান কাদের, মোস্তফা সারওয়ার, আনিস আহমেদ, সালমা বাণী, জসিম মল্লিক, আবেদুজ্জামান চৌধুরী, মিলি সুলতান, শামস আল মমীন, আবু রায়হান, অলকেশ দত্ত রায়, ইমরান আনসারী, আদনান সৈয়দ ও তাহমিনা শহীদ।
১৫ জুন রবিবার বেশ কয়েকটি সেমিনার হয়। এদিনের প্রথম সেমিনার ‘মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র’। পরিচালনা করেন রোকেয়া হায়দার। আলোচক ছিলেন ড. নূরন নবী, ড. গাজী সালেহউদ্দীন, লায়লা হাসান, মাসুদা ভাট্টি, বদরুজ্জামান আলমগীর, সৈয়দ হাসান ইমাম ও মঞ্জুরুল কাদের।
এরপরের অনুষ্ঠান ছিল জীবন চৌধুরীর পরিচালনায় ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ নিয়ে সেমিনার। এতে অংশগ্রহণ করেন মহাদেব সাহা, এবিএম সালেহউদ্দিন ও আবু রায়হান। মহুয়া ও চন্দ্রাবতীর ওপর সংগীত পরিবেশন করেন শাহনাজ পারভীন ও লিটন ফিলিপস।
রোববার সেমিনার ছিল বিতর্ক বাঙালী হতে বাংলা শেখা কি আবশ্যক? এ সেমিনারটি পরিচালনা করেন রানু ফেরদৌস। আলোচক ছিলেন দাউদ হায়দার, ড. হায়দার আলী খান, নাসিমুন্নাহার নিনি, রওশন জামিল। এছাড়া অংশগ্রহণ করেন আনিস আহমেদ, মাসুদা ভাট্টি, সেজান মাহমুদ, জেবু চৌধুরী, শফিকুল ইসলাম প্রমূখ।

আগামি বছর বইমেলার দুই যুগ এবং উত্তর আমেরিকায় বাঙালি কৃষ্টি-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশে মুক্তধারার প্রচেষ্টার ২৫ বছর।  সে উৎসবে সারা পৃথিবীর বাঙালীদের যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে গত ১৫ জুন রাত ১১টায় আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। এ উপলক্ষে মুক্তধারা বহির্বিশ্বে বসবাসরত সকল লেখকদের নাম-ঠিকানা ও ছবি সম্বলিত জীবনী এবং তাঁদের প্রকাশনার তথ্য উপাত্ত নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশের ঘোষণা দিয়ে সকলকে মুক্তধারায় তথ্য-উপাত্ত পাঠানোর জন্য অনুরোধ জানানো হয়।

You Might Also Like