মধ্যপ্রাচ্যে নববিন্যাস কি অনিবার্য?

মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে বেশ ক’বছর আগ থেকেই। সেই উত্তাপে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সাম্প্রতিক নানা ঘটনা। এসবের শেষ গন্তব্য কোথায় তা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ হচ্ছে। বাস্তব দৃশ্যপটে এখন যা দেখা যাচ্ছে, অদেখা ঘটনা রয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। অন্তরালে ঘটছে নানা মেরুকরণ ও দরকষাকষি। এসবের গতিবিধি কোন দিকে, তা-ও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে যে নববিন্যাসের কথা বেশ ক’বছর থেকে আলোচিত হচ্ছিল, তা এখন যেন অনেক দূর এগিয়েছে। বিশেষত সিরিয়া ও ইরাককে নিয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাষ্ট্রীয় সীমানার কার্যকারিতা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এই অঞ্চলে রাষ্ট্রিক-অরাষ্ট্রিক শক্তি মিলে সব পক্ষ এমন এক সঙ্ঘাতময় মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে, যাতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে বেশ ক’টি রাষ্ট্র ভেঙে পড়তে পারে অথবা রাষ্ট্রের মধ্যে সৃষ্টি হতে পারে নতুন রাষ্ট্র।

ইরাকে সুন্নি মিলিশিয়া অভিযান
ইরাকের সুন্নি অধ্যুষিত অঞ্চলে ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড দি আল শামের (আইসিস) অভিযান এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রধান অলোচিত বিষয়। আইসিস মোসুুল ও কিরকুক দখল করে বাগদাদের দিকে এগোচ্ছে। অন্য দিকে ইরাকের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি সিসতানি সুন্নি মিলিশিয়া বিদ্রোহীদের অগ্রাভিযান থামাতে যুবকদের (শিয়া) অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরাকের পবিত্র স্থান দখলমুক্ত রাখতে সর্বাত্মক সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। ইরাকি প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকি নিয়মিত বাহিনীর সাথে শিয়া স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয় করে সুন্নি বিদ্রোহীদের ঠেকানোর পরিকল্পনা করছেন। এ পরিকল্পনা তদারক করছেন ইরানের আল কুদস বাহিনীর প্রধান জেনারেল কাসেম সোলায়মানি।
আইসিসকে পশ্চিমা গণমাধ্যম এক সময় আলকায়েদা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত করত। এ সুন্নি মিলিশিয়া গ্রুপটি এখন নতুন রূপ নিয়েছে। ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের মেয়ে আইসিসের অগ্রাভিযানকে সুন্নি বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, তার চাচা ইজ্জত ইব্রাহিমের অনুগতরা সুন্নি বিপ্লবীদের সাথে রয়েছেন। ২০০৫ সাল থেকে সুন্নিদের প্রতি যে বৈষম্য ও জুলুম-নিপীড়ন করা হচ্ছিল, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে জনগণ। আমেরিকা আইসিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এক সময় এক লাখের মতো সুন্নি উপজাতি ইরাকিকে নিয়ে শাওয়া নামে একটি মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করেছিল। আমেরিকানরা চলে যাওয়ার সাথে সাথে মালিকি শাওয়া মিলিশিয়া দলটিকে ভেঙে দেন। এদের অনেককে নিয়মিত সেনাবাহিনীতে নেয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়েও তিনি তা রাখেননি, বরং প্রশাসনে সুন্নিদের বিরুদ্ধে মালিকি শুদ্ধি অভিযান চালান। এতে সাদ্দামের অনুগত আমেরিকাবিরোধী শক্তি এবং শাওয়া মিলিশিয়ারা আইসিসের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরাকে অগ্রাভিযান পরিচালনাকারী এ মিলিশিয়া গ্রুপটির বৈশিষ্ট্য হলে, তারা প্যান ইসলামিজম ও সালাফি ধ্যানধারণায় বিশ্বাস করে। তীব্র শিয়াবিরোধী আইসিসের বেশির ভাগই আবদুল ওয়াহাব নজদির অনুসারী এবং তাদের মূল বক্তব্য হলো, সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠা। আবু বকর বাগদাদির নেতৃত্বাধীন এ গ্রুপটির ইরাকের বাকুবাতে সদর দফতর রয়েছে। দলটির সিরিয়ার সদর দফতর হলো আল রাক্কাতে। পূর্ব ও উত্তর সিরিয়া এবং পশ্চিম ও উত্তর ইরাকজুড়ে একটি বড় এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে আইসিস। জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে তারা ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মোসুল এবং নিনেভা প্রদেশের বেশির ভাগ এলাকা দখল করে নেয়। এরপর তারা দক্ষিণে বাগদাদ অভিমুখে অগ্রসর হয়। পথের বেশ কয়েকটি শহরে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। মোসুলে চার দিন যুদ্ধের পর ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের নিরাপত্তা চৌকিগুলো আইসিসের মিলিশিয়াদের কাছে ছেড়ে পালিয়ে যায়। মোসুলের হামলা ছিল এক রকম দুঃসাহসিক। ছয় মাস ধরে তারা ফালুজা দখল করে রেখে এখন বাগদাদের বেশ কাছাকাছি। আনবার প্রদেশের রাজধানী রামাদির একাংশও তাদের নিয়ন্ত্রণে। বাগদাদের ১৪০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সাদ্দাম হোসেনের জন্মভূমি তিকরিত শহরও এখন আইসিসের দখলে। দলটি যে গতিতে অগ্রসর হচ্ছে তাতে স্পষ্ট, ২০০৩ সালে আমেরিকান আক্রমণের পর সুন্নি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বড় অংশের সহযোগিতা রয়েছে আইসিসের পেছনে। আমেরিকান সৈন্যরা ইরাক ত্যাগের পর থেকে শিয়াপ্রধান নুরি আল মালিকি সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছিল তারা। এখন তাদের হাতে ইরাককে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও যানবাহন। ছয়টি ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার এবং ৫০০ বিলিয়ন দিনারের সমপরিমাণ মুদ্রার নোটও তাদের দখলে।

সুন্নি আরবদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ক্ষোভ জাগিয়ে তুলে সিরিয়ার আসাদ ও ইরাকের মালিকি সরকার আইসিসের জন্য গ্রাউন্ড তৈরি করে দিয়েছেন। সিরিয়ার ৭০ শতাংশের বেশি জনগণ সুন্নি। আর ইরাকি জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশ তারা। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের সময় সুন্নিরা ছিল প্রভাবশালী। এক সময় আইসিস সিরিয়ায় আসাদবিরোধী বিভিন্ন প্রতিরোধ সংগঠনের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয় এবং বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করে। আইসিসের তৎপরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। এতে অনেক অঞ্চল বিদ্রোহীদের হাতছাড়া হয়ে যায়।

আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করছে আইসিস্ত
আইসিসের নাম থেকে স্পষ্ট হয়, এটি সিরিয়া ও ইরাকের সুন্নি অঞ্চলে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের তৎপরতার মধ্যে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। ২০০৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ সংগঠনটির পরিচয় ছিল ‘আলকায়েদার সহযোগী’ হিসেবে। ২০১৪ সালের ফেব্র“য়ারিতে আলকায়েদা এ সংগঠনটির সাথে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা জানায়। গত বছর এপ্রিলে আইসিস ইরাক থেকে তাদের অভিযান সিরিয়ায় নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। তারা আগের নাম ইসলামিক স্টেট অব ইরাক (আইএসআই) পরিবর্তন করে এর সাথে ‘অ্যান্ড আল-শাম’ যুক্ত করে, যা লিভান্ট বা পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল বা বৃহত্তর সিরিয়াকে বোঝায়। এতে স্পষ্ট সিরিয়ার বাইরে আরো অনেক বড় এলাকা দখল আইসিসের লক্ষ্য।
আইসিস এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নিজস্ব নিয়মে আদালত গঠন এবং নিজস্ব নিয়মকানুন চালু করেছে। তারা সিরিয়া ও ইরাকে দখল করা এলাকায় শুল্কায়নও চালু করেছে। তারা সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যে শাসনহীন এলাকাগুলোতে এক ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ইরাকে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারলে জর্ডানের সমান একটি ভূখণ্ড তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। চওড়ায় এই ভূখণ্ড হবে ৫০০ কিলোমিটার, সিরিয়ার আলেপ্পো থেকে ইরাকের পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত। আইসিসের বিভিন্ন আরব যোদ্ধা বসতি স্থাপনের জন্য সাথে করে তাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরও নিয়ে এসেছে। মসজিদে বিদেশী ইমাম নিযুক্ত করা হচ্ছে। একটি গোয়েন্দা বিভাগও গঠন করেছে তারা।

ইরানের সমর্থনে তৈরি হওয়া, লেবাননের হিজবুল্লাহ মিলিশিয়ার মতো একটি সুন্নি মিলিশিয়া হিসেবে দেখা হয় আইসিসকে। এ সংগঠনের পক্ষে সৌদি আরবের প্রকাশ্য কোনো অবস্থান না থাকলেও সৌদি গোয়েন্দা বিভাগের তত্ত্বাবধানে এ সংগঠনটি সৃষ্টি হয়েছে বলে ইরানিরা মনে করে। সিরিয়া ও ইরাকে সংঘটিত কিছু কিছু ঘটনায় তাদের এ দাবির পক্ষে সমর্থন পাওয়া যায়। আইসিস তার তৎপরতা শুরু করার আগে সৌদি আরব সিরীয় বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও অন্যান্য সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। এতে আসাদের সরকারি বাহিনীর হাতে মার খেতে থাকে বিদ্রোহীরা। সৌদি আরব সিরিয়ার মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করলেও তাদের প্রভাব কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এর একটি হলো, বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব থেকে ব্রাদারহুড নেতাদের বিচ্ছিন্ন করা। এতে রিয়াদ বেশখানিকটা সফলও হয়; বিরোধী কোয়ালিশন থেকে ব্রাদারহুড নিজেকে সরিয়ে নেয়। আইসিস তুরস্কের কিছু কিছু এলাকায় তাদের তৎপরতা ছড়িয়ে দেয়। মোসুল দখলের পর সেখানকার তুর্কি কনস্যুলেটে কর্মরতদের অপহরণ করা হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে সুন্নি ইসলামিস্টদের মধ্যে প্রধানত দু’টি ধারা রয়েছে। একটি ধারা মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত, যারা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলামি ধ্যানধারণা প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী। মুসলিম ব্রাদারহুড, আন নাহদা, একেপি, সাদাত পার্টি প্রভৃতি দল এ ধারার। আরেকটি ধারা রয়েছে, যারা ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র পন্থা অবলম্বনে বিশ্বাস করে। আলকায়েদা এ ধারার প্রধান সংগঠন হলেও একই আদর্শ অনুসরণকারী অনেক দলকে বিভিন্ন দেশে সক্রিয় দেখা যায়। আইসিসের মতো এ ধারার দলগুলো তীব্র শিয়াবিরোধী। এ দলের মূল রিক্রুটমেন্ট দেখা যায় সালাফি এবং ওয়াহাবি ধারা থেকে। এ ধারার পেছনে গোপন সৌদি সমর্থনের অভিযোগ করেছে ইরানিরা।

সঙ্কটে নুরি আল মালিকি
ইরাকে আইসিসের অভিযান এমন এক সময় পরিচালিত হচ্ছে যখন দেশটিতে নির্বাচনের পর নতুন সরকার এখনো গঠিত হয়নি। নুরি মালিকির দল নির্বাচনে অধিক আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন তিনি পাচ্ছেন না। এমনকি আইসিস বাগদাদ দখলে অগ্রসর হওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর ইরাকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য মালিকি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করলেও সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো কোরামের ব্যবস্থা তিনি করতে পারেননি।
ইরাক থেকে আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহারের পর পুরো দেশটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো পরিস্থিতি মালিকি সরকার সৃষ্টি করতে পারেননি। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরাকে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আমেরিকা বা ইরানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। আমেরিকার ওবামা প্রশাসন প্রথম দিকে আইসিসের অভিযানের মুখে নিরাপত্তা রক্ষায় ইরাককে সহায়তার কথা বললেও পরে সে অবস্থান থেকে সরে আসে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার উদ্যোগ নিতে হবে মালিকি সরকারকে। এ নতুন বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র কতটা ইরাক সঙ্কটে নিজেকে যুক্ত করবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। আমেরিকাকে বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলার জন্য মালিকি বারবার অনুরোধ জানালেও তাতে সাড়া দেয়নি ওয়াশিংটন। তারা সেখানে নিজেদের স্থাপনা ও কূটনৈতিক মিশন রক্ষায় কিছু সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাত্র।

এ অবস্থায় ইরাকে শিয়াপ্রধান সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করতে পারে কেবল ইরান। মালিকি সরকারের প্রতি ইরানের সুপ্রসন্নতা না থাকলেও ইরানের নিরাপত্তার জন্যই ইরাকের বর্তমান কাঠামো ধরে রাখতে হবে। ইতোমধ্যে ইরানি কুদস ফোর্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সোলায়মানি ইরাকে সুন্নি বিদ্রোহীদের প্রতিরোধে সম্ভাব্য করণীয় নিয়ে বৈঠক করেছেন। ইরাকের ধর্মীয় নেতা আলি সিসতানি অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তাতে শিয়া যুবকেরা দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে। সিরিয়ায় বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর ইরান তার নিরাপত্তা বাজেটের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত দেশটির জন্য ব্যয় করেছে। ইরাকের জন্য ব্যয় করতে হয়েছে ৭ শতাংশের মতো। নতুন পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে এ ব্যয় অনেক বেড়ে যেতে পারে। সেটি হলে ইরানের পক্ষে নিজ দেশের জনগণের জন্য মৌলিক সেবাদান কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে, যা দেশটিতে গণ-অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। ইরানের সামনে আরেকটি আশঙ্কা রয়েছে, সেটি হলো সিরিয়ার পর ইরাকে সঙ্ঘাত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নি সঙ্ঘাতকে ছড়িয়ে দিতে পারে। এর প্রভাব লেবানন, ইয়েমেন, বাহরাইনসহ বেশ ক’টি দেশে পড়তে পারে। এ ধরনের লড়াই চালিয়ে গেলে এক দিকে মুসলিমদের রক্তক্ষয়ে ইসরাইল তার শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে নিতে থাকবে, অন্য দিকে শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে ইসরাইলবিরোধী শক্তি দুর্বল হতে থাকবে।

নতুন সঙ্কটের কেন্দ্রবিন্দুতে লিবিয়া

ইরাক ছাড়াও নতুন একটি সঙ্কটের কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে লিবিয়া। এ সঙ্কটের পেছনে সৌদি আরব, মিসর ও আলজেরিয়ার বিরাট ভূমিকা রয়েছে। লিবিয়ায় আরব জাগরণের পথ ধরে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর সেখানে গণতান্ত্রিক রূপান্তর নিরবচ্ছিন্নভাবে হোক, সেটি কোনো আঞ্চলিক পরাশক্তিই চায়নি। মিসরে ড. মোহাম্মদ মুরসির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের পর জেনারেল আব্দুল ফাত্তাহ আল সিসি কর্তৃত্বে বসে লিবিয়ার অস্থিরতার পেছনে কলকাঠি নাড়তে শুরু করেন। জেনারেল সিসি লিবীয় সেনাবাহিনীতে একসময় কর্মরত তার এক বন্ধু, মেজর জেনারেল খলিফা হাফতারকে ইন্ধন দিচ্ছেন দেশটিতে সরকারের পতন ঘটানোর জন্য। সৌদি-আমিরাতের সমর্থনপুষ্ট হয়ে এ লিবীয় সাবেক জেনারেল একটি বাহিনী তৈরি করে বেনগাজির তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোতে নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। জেনারেল হাফতার রাজধানী ত্রিপলিতে হামলা করলে পাল্টা রাষ্ট্রীয় শক্তি রুখে দাঁড়ায়। তাদের সমর্থন দিচ্ছে ইসলামিস্টরা। জেনারেল সিসির পরিকল্পনা হলো, তিনি জেনারেল হাফতারকে দিয়ে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলকে জঙ্গি দমনের অজুহাতে দখল করে রাখবেন। আর সেখানকার তেলসম্পদ লুণ্ঠন করে মিসরীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবেন। এ দখলদারিত্বের সমঝোতায় আলজেরিয়াকে দেশটির সংলগ্ন লিবিয়ার বিরাট অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়া হবে। এভাবে লিবিয়াকে অস্থির করে ভাগবাটোয়ারার নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে। এর পেছনে সৌদি আরবের প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এতে চূড়ান্তভাবে লিবিয়ার ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে কি না তাতে সংশয় রয়েছে। যদিও খুব সহজে যে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে, এমনটি হয়তো নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে পাল্টা রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি রয়েছে। এসব পরস্পরবিরোধী শক্তির সঙ্ঘাতে রক্ত ঝরতে থাকবে লিবিয়ায়।

বিভাজন মানচিত্র ও নতুন পরিস্থিতি
মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে নতুন বিন্যাসের ব্যাপারে আমেরিকান ডিফেন্স জার্নালে প্রকাশিত এক নিবন্ধ ও মানচিত্র নিয়ে এক সময় তোলপাড় শুরু হয়েছিল। তখন অবশ্য যে পরিস্থিতি ছিল, তাতে এ ধরনের পরিবর্তন অবাস্তব মনে হতো। ইরাক ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশে এখনকার মতো অস্থিরতা ছিল না। এর পর মধ্যপ্রাচ্যে দেখা দেয় আরব জাগরণ। শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন ও প্রতিপরিবর্তন আসে তিউনিসিয়া, মিসর, লিবিয়া ও ইয়েমেনে। সঙ্ঘাত-বিধ্বস্ত অবস্থা সিরিয়া ও লেবাননের। অন্য দেশগুলোতেও দেখা দিয়েছে এর প্রভাব। এখন যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাতে মধ্যপ্রাচ্যের নববিন্যাস অনিবার্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আলোচিত সেই মানচিত্রে ইরাককে শিয়া ইরাক, সুন্নি ইরাক ও কুর্দিস্তানÑ এই তিন ভাগে বিভক্ত দেখানো হয়েছিল। সুন্নি ইরাক হিসেবে যে ভূখণ্ড দেখানো হয়েছিল তার অনেকটাই এখন আইসিসের দখলে। সুন্নি বিদ্রোহীরা যেভাবে এ এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, তাতে মনে হয়নি এ অভিযানে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কোনো প্রতিরোধ হয়েছে। একটি বড় এলাকায় তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সামনে এগোতে দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইরানের একটি কৌশল এ হতে পারে যে, সুন্নি বিদ্রোহীদের সামনে এগোতে দিয়ে তাদের আমেরিকান স্বার্থের মুখোমুখি আনা গেলে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হবে। তা না হলেও ইরাক ইস্যুতে ইরানের সাথে ওয়াশিংটনের সমঝোতার একটি সুযোগ সৃষ্টি হবে। এটি এ কারণেও হতে পারে যে, তেল ও অন্যান্য সম্পদ সীমিত, এমন সুন্নি এলাকায় কোনো অজ্ঞাত সমঝোতার অংশ হিসেবে সুন্নিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়া হয়েছে। ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ইরাক প্রসঙ্গে সর্বশেষ যে ভাষণ দিয়েছেন, তাতে দেশটির অখণ্ডতা রক্ষায় সহযোগিতার কথা না বলে উল্লেখ করেছেন, শিয়াদের পবিত্র শহরগুলো রক্ষায় ইরান সহযোগিতা করবে। এতে ইরান পুরো অঞ্চল পুনর্দখলে ইরাকের পেছনে না থাকার ইঙ্গিতই পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে শিয়া ইরাক ও সুন্নি ইরাক গঠনকে মেনে নেয়া হবে। অন্য দিকে ইরাকের কুর্দি অঞ্চলকে শুরু থেকে এক ধরনের আধা স্বাধীনভাবে চলতে দেয়া হয়েছে। কুর্দিরা নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী গঠন করেছে। আইসিস কুর্দি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় না গিয়ে তাদের সাথে সঙ্ঘাত এড়িয়েছে। এতে ইরাকি কুর্দিস্তানকে স্বাধীন ঘোষণা করা হলে তা নিয়ে বড় কোনো সঙ্ঘাত সৃষ্টির সম্ভাবনা ক্রমেই কমে আসছে। কুর্দিস্তানের সিরিয়া অংশে আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সৃষ্টির পর থেকে কুর্দি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ দুই কুর্দি অঞ্চল একসাথে মিলে একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো সৃষ্টি হতে পারে। তুরস্ক তাদের কুর্দি অঞ্চলকে সহজে আলাদা হতে হয়তো দেবে না। তবে পরিস্থিতি অদূর ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেবে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। ইরানি কুর্দি এলাকার বেশির ভাগ অধিবাসী শিয়া হওয়ায় তারা সুন্নিপ্রধান কুর্দিরাষ্ট্রে কতটা যোগ দিতে আগ্রহী হবে তা নিশ্চিত নয়। আর ইরান সহজে এটি হতেও দিতে চাইবে না। তবে এখন যে উত্তপ্ত অবস্থা এ অঞ্চলে দেখা দিচ্ছে, তাতে ইরাক ও সিরিয়ার বিভাজন অনেকটা অনিবার্য মনে হচ্ছে।

বৃহত্তর ইসরাইলের সুযোগ আসছে!

মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে আজ যে অস্থিরতা তার সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি হলো ইসরাইল। দেশটির নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হলো, প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোর ভেতরে এবং পরস্পরের মধ্যে সঙ্ঘাত বাধিয়ে রেখে এক দিকে তাদের নিরাপত্তার জন্য ইসরাইলের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল করে রাখা, অন্য দিকে দেশটির ভূখণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করা। প্রথম দিকে আরব জাগরণে বিভিন্ন দেশে শাসন পরিবর্তনে ইসরাইলকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন মনে হয়েছিল; কিন্তু এর রেশ ধরে যে পরিবর্তন সেখানে ঘটছে, তাতে এর বড় সুবিধাভোগী মনে হচ্ছে তেলআবিব। ইসরাইল ২০ বছর ধরে অসলো চুক্তির ধারাবাহিকতায় দুই রাষ্ট্র সমাধানের ব্যাপারে ফিলিস্তিনের সাথে আলোচনা করে চললেও কখনো এ ফর্মুলায় সমাধানে কার্যকরভাবে উদ্যোগী হয়নি; বরং কট্টরপন্থীরা অদ্ভুত এক সমাধান ফর্মুলা দিয়েছেন। সেটি হলো পশ্চিম তীর এবং গাজা থেকে ফিলিস্তিনিরা সরে গিয়ে জর্ডানে চলে যাবে। সেখানে জর্ডান-ফিলিস্তিন যৌথ সরকার হবে। এ অদ্ভুত ফর্মুলা কোনো সময় আলোচনায় সেভাবে আসেনি; কিন্তু যেভাবে বেপরোয়া গতিতে পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, তাতে সেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ইসরাইল রাজি না হওয়ার ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে। অন্য দিকে, শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে যে সিনাই উপত্যকা মিসরকে ছেড়ে দিয়েছিল ইসরাইল, সেটি আবার দখল করে নেয়ার কথা বলছে কট্টরপন্থী ইসরাইলিরা। এ জন্য সিনাইয়ে জঙ্গি তৎপরতার কথা বেশ ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠার পর গাজায় হামাসের সরকার এখন আর নেই; কিন্তু ইসরাইলের হামলা সেখানে চলছে নিয়মিতভাবে। এ জন্য তিন ইসরাইলি যুবক অপহরণের নতুন একটি নাটক তৈরি করা হয়েছে। ইসরাইল তার ভূখণ্ড সম্প্রসারণের পথে প্রধান বাধা মনে করত মিসরকে। মিসরের শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং দেশটির জনপ্রিয় ইসলামি দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে মুখোমুখি করে দু’টি শক্তিকেই দুর্বল করার ব্যবস্থা হচ্ছে। হত্যা ও দমন তৎপরতায় সেনাবাহিনী বিতর্কিত ও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, অন্য দিকে ব্রাদারহুডের হচ্ছে শক্তি ক্ষয়। ইহুদি মায়ের সন্তান হিসেবে জেনারেল আল সিসির ইসরাইলের প্রতি আনুকূল্য এখন এক ধরনের ওপেন সিক্রেট বিষয়। নতুন অবস্থায় ইসরাইল তার রাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারণের জন্য অনুকূল অবস্থা সৃষ্টির জন্য কাজ করছে দ্রুত। আপাতদৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা এ ধরনের উদ্যোগে সমর্থন করবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে এর বিরুদ্ধে তারা কার্যকর কোনো ভূমিকা নেবে বলেও মনে হয় না। মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নি যে সঙ্ঘাত এখন চরম আকার নিয়েছে, তার পেছনে কলকাঠি নেড়েছে ইসরাইলি গোয়েন্দারা। যেসব আরব দেশ এখনো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়নি, তাদের অনেকের সাথে গোয়েন্দা সংস্থাপর্যায়ে নিয়মিত আলোচনা হতে দেখা যাচ্ছে ইসরাইলের।

টার্গেট কেন তুরস্ক?
আরব বসন্তের সময় তুরস্ক ও কাতারকে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে দেখা গিয়েছিল। এখন এ দু’টি দেশই বেশ সংবেদনশীল একটি পরিস্থিতি পার করছে। ব্রাদারহুডকে সমর্থন করাকে কেন্দ্র করে কাতারের সাথে সৌদি আরবের দূরত্ব এমন পর্যায়ে গেছে যে, একসময় কাতারে শাসন পরিবর্তনে রিয়াদ উদ্যোগ নিয়েছে বলেও বিশ্লেষকেরা ধারণা করেন। এখনো সেই বিরোধের অবসান ঘটেনি। তুরস্কে এরদোগানের একেপি শাসনের অবসান ঘটানোর জন্য একাধিকবার প্রচেষ্টা চালানো হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে এরদোগান ও তার মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির একের পর এক টেপ প্রকাশ, তার আগে গাজি পার্কে বিক্ষোভ ও এরদোগানবিরোধী আন্দোলন দিয়ে বড় ধরনের আঘাত হানার চেষ্টা করা হয়। আগামী আগস্টে এরদোগানের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ইরাকে তুর্কি কূটনীতিকদের আটক করা এ ধরনের আরেকটি পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। এতে আইসিসের সাথে তুরস্ক সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়লে যেমন ক্ষতি হবে, তেমনিভাবে তুর্কি কূটনীতিকদের কোনো কিছু হলে সেটাও এরদোগানের জন্য হবে বিপর্যয়কর। এর মধ্যে আবদুল্লাহ গুলকে এরদোগানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রার্থী করার উদ্যোগ ব্যর্থ হলে নতুন একজনকে বাছাই করা হয়েছে আগস্টে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়াইয়ের জন্য। বিরোধী পিএইচপি এবং এমএইচপি দুই দলই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাদের যৌথ প্রার্থী ঘোষণা করেছে ওআইসির সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ড. একলেমুদ্দিনকে।

ফতেহ উল্লাহ গুলেনের ঘনিষ্ঠ এ ব্যক্তিকে ওআইসিতে সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিল একেপি সরকার। গুলেনের সাথে এরদোগানের দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার পর একলেমুদ্দিনের সাথেও দূরত্ব সৃষ্টি হয় তুর্কি সরকারের। তিনি সৌদি শাসকদের আস্থাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হন। একলেমুদ্দিনকে এরদোগানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে একেপির সামনে আরেকটি বড় পরীক্ষা হাজির করা হলো। একলেমুদ্দিনের রক্ষণশীল পরিচয় নির্বাচনে বিশেষ সুবিধা এনে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অবশ্য এরদোগান ও একেপির সমর্থন তুরস্কের সমাজের অনেক গভীরে পৌঁছে গেছে। ফলে এরদোগান যুগের অবসানের প্রচেষ্টা সফল হয়ে যাবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। তবে আগামী দুই মাসে তুরস্ককে ঘিরে আরো অনেক ঘটনাই ঘটতে পারে।

পাঁচ বছরেই নতুন অবয়ব!
আগামী পাঁচ বছরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি একটি নতুন বিন্যাস নিতে পারে। এর চূড়ান্ত পরিণতি পেতে সময় নিতে পারে আরো পাঁচ বছর। সেখানে সক্রিয় বিভিন্ন শক্তি নিজস্ব পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ইসরাইল যেমন তার নিজস্ব ছক অনুসারে সব সাজাতে চাইছে, তেমনিভাবে কট্টরপন্থী ইসলামিস্ট অথবা মধ্যপন্থী ইসলামি আন্দোলনও তাদের নিজস্ব হিসাব-নিকাশ নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি থেকে যুক্তরাষ্ট্র অথবা পাশ্চাত্য নিজেদের গুটিয়ে নেবে, এমনটা মনে করারও কারণ নেই। রাশিয়া এখানে অধিকতর সক্রিয় হয়ে ঊঠবে। বাণিজ্য স্বার্থের পরিসর ছাড়িয়ে প্রভাবকে আরো বিস্তৃত করতে চাইতে পারে চীন। উপসাগরীয় দেশগুলোর শাসকদের মধ্যে ঐক্য এখনকার মতো না-ও থাকতে পারে। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রভাব বিস্তারে সঙ্ঘাত ও সমঝোতার টানাপড়েন আরো বেশ কিছু দিন চলতে থাকবে। রাজতান্ত্রিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা, সেনাবাহিনীকে কর্তৃত্ব ধরে রাখতে ইন্ধন জোগানো এবং শিয়া-সুন্নি দুই পক্ষের মধ্যে সঙ্ঘাত লাগিয়ে রেখে ইসরাইল তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইবে। আর এ সঙ্ঘাত ও অস্থিরতার পথ ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ায় নতুন রাষ্ট্রবিন্যাস অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। এ পথে এখন রয়েছে সিরিয়া ও ইরাক। এরপর তালিকায় স্থান পাবে লিবিয়া, লেবানন, ইয়েমেনÑ এমনকি উপসাগরের স্থিতিশীল সরকারগুলোও একপর্যায়ে অস্থির হয়ে উঠতে পারে। এর পেছনে বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিগুলোর যে পরিকল্পনা ও ইন্ধন সক্রিয়, তাতে সন্দেহ নেই।

You Might Also Like