দুর্নীতি দমন কমিশনই দুর্নীতিগ্রস্ত

দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বাঁচিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে রাজধানী গুলশানের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩৭ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দু’জন উপ-পরিচালক। বিষয়টি কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শুধু গোলাম মোস্তফা ও জাহিদ হোসেনই নন, দুর্নীতির অভিযোগে গত ৫ বছরে দুদকের প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, গুলশানের ব্যবসায়ী মোবারবক হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছিলেন দুদকের উপ-পরিচালক হারুনুর রশিদ। কিন্তু ওই ব্যবসায়ীকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বাঁচিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ৫৭ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক গোলাম মোস্তফা ও বগুড়া সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. জাহিদ হোসেন। ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন দুদকের ওই দুই কর্মকর্তাকে ৩৭ লাখ টাকা দেন। বাকি টাকা কিছু দিনের মধ্যে পরিশোধের প্রতিশ্রুত দেন।

কিন্তু মোবারক হোসেন কাজের নিশ্চয়তা পেতে টাকা লেনদেন-সম্পর্কিত কথাবার্তা মোবাইল ফোনে রেকর্ডও করে রাখেন। বিষয়টি নিয়ে সুরাহা না হওয়ায় মোবারক হোসেন ঘুষ নেওয়া-সংক্রান্ত কথোপকথনের অডিও সিডিসহ দুদকে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর ১৭ জুন দুদকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা  নিতে অফিস আদেশ জারি করেন।

দুদক সূত্র জানায়, ওয়ান-ইলেভেনের পর ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে গোলাম রহমানের নেতৃত্বাধীন কমিশনের যাত্রা শুরু হয়।

গোলাম রহমানের কমিশন ৪ বছর দায়িত্ব পালন করে। ওই সময় থেকে শুরু করে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত দুদকের ৭৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কমিশনে অভিযোগ জমা পড়ে। অভিযুক্তরা দুর্নীতির অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকির মাধ্যমে টাকা আদায়, টাকার বিনিময়ে অভিযুক্তকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা, ঘুষ নিয়ে অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়া ও চার্জশিট থেকে নাম বাদ দেওয়া, গোপন রেকর্ড পাচার করে টাকা নেওয়া, ঘুষের বিনিময়ে তথ্য গোপন করে অভিযোগ দুর্বল করা এবং চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে টাকা আদায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন ৫ সদস্যবিশিষ্ট দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন কমিটি অনুসন্ধান চালায়। অনুসন্ধানকালে দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় ৪৭ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয় দুদক।

এর মধ্যে ৮ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত, ১১ জনকে অপসারণ এবং ৭ জনের বেতনস্কেল কমিয়ে দেওয়াসহ মোট ২৬ জনকে দেওয়া হয় গুরুদণ্ড। পাশাপাশি ২১ জনকে দিয়েছে লঘুদন্ড। বাকি ২৯ জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়। বর্তমানেও দুজনের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। এসব অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বাইরেও দুদকের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর নিজস্ব গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হচ্ছে।

দুদক সূত্রে জানায়, দুদকের লোকজনের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ প্রতি মাসেই কমিশনের কাছে কিছু না-কিছু জমা পড়ে। দুদক কর্মকর্তাদের দাবি, হলমার্ক-সোনালী ব্যাংক কেলেঙ্কারি, শেয়ারবাজার ও রেল কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু দুর্নীতি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি, সরকারদলীয় প্রভাবশালী ৭ মন্ত্রী-এমপি ও সচিব থেকে শুরু করে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতির বড়-বড় অভিযোগ অনুসন্ধানে মাঠে কাজ করছে দুদক। দেশের দুর্নীতি বন্ধে অপ্রতিরোধ্য ভূমিকা পালন করছে সেই প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীই জড়িয়ে পড়ছে দুর্নীতিতে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এই প্রতিবেদককে বলেন, দুদকের মূল কাজ দুর্নীতি দমন এবং প্রতিরোধ করা। যে প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমনে কাজ করে, সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাই যদি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য সফল হবে না। দুদকের কোনও কর্মকর্তা যদি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোনও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

You Might Also Like