উদার রাজনৈতিক পরিবেশে ফিরতে চায় আওয়ামী লীগ

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে একধরনের উদার পরিবেশ সৃষ্টি করে বিরোধী দলের আস্থা অর্জন করতে চায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দিকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি দল ও দলের বাইরে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের কাছে টানার কৌশল নিচ্ছে দলটি। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ডা: সেলিনা হায়াৎ আইভীকে মেয়র হিসেবে সমর্থন প্রদান এ কৌশলের অংশ ছিল। ভবিষ্যতে বিরোধী দলের সাথে আলোচনার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দল আগ্রহ দেখাবে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ নিয়ে রাষ্ট্রপতির সাথে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর আলোচনা আওয়ামী লীগের নেতারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে একধরনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে উদার পরিবেশের আবহ সৃষ্টি করতে চায় ক্ষমতাসীন দল।
অতীতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, কাদা ছোড়াছুড়ি, দোষারোপের রাজনীতির অভিযোগ যাতে না ওঠে সে ব্যাপারেও দলের নেতাদের সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার সাথে দেখা করেছেন। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে দেখতে গেছেন বলে ওবায়দুল কাদের দাবি করলেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা দলের সাধারণ সম্পাদকের এই সাক্ষাৎকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন।
আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করেন হরতাল-অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো সহিংস রাজনৈতিক কৌশল আর কার্যকর হবে না। বিএনপিসহ কোণঠাসা হয়ে পড়া বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আর এ ধরনের কর্মসূচির দিকে ফিরতে পারবে না। ফলে নিয়ন্ত্রিত রাজনীতির সুযোগ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যেমন আনা যাবে, তেমনি সরকারের ভাবমর্যাদা বাড়বে।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, এত আলোচিত নির্বাচন এর আগে হয়নি। শঙ্কা ছিল নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে কি না। সেই শঙ্কা থেকে মুক্তি পেয়েছি। সবার কাছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। রাজনীতিতে একটি নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, বিজয়ের খবর পাওয়ার পরই আইভী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বাড়িতে ছুটে গেছেন, তাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন, মিষ্টিমুখ করিয়েছেন। সাখাওয়াত হোসেনও বিষয়টি ভালোভাবে নিয়েছেন। শুভকামনা করেছেন। এই যে ধারা দেখলাম, এ সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে আমাদের রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন আসবে। এটি ভালো সংস্কৃতি, ভালো দিক। সেনাবাহিনী না থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এটি হয়েছে। আগামীতে এই ধারা বজায় থাকবে, এটি আমরা আশা করি।
ক্ষমতাসীন দলের নেতারা মনে করেন নির্বাচন সঙ্ঘাতমুক্ত পরিবেশে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ায় মানুষের আস্থা বেড়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর বিজয়ে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড জনগণের আস্থা অর্জনে কিছুটা হলেও সক্ষম হয়েছে। রাজনীতির এই ধারা অব্যাহত রাখার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে বিরোধী দলকেও বার্তা দিতে চেয়েছে আওয়ামী লীগ।
দলের একাধিক নেতার সাথে আলাপকালে তারা জানান, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিজয়ের প্রথম কারণ হলো আওয়ামী লীগ ও সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা এখনো আছে এবং সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
তারা জানান, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যে আন্দোলন করেছিল, এটি ছিল ভুল। দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে, নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করার মাধ্যমে নির্বাচন যে সুষ্ঠু হতে পারে এ ধারণা বিএনপি নেতারা মানতে পারেনি। উন্নত দেশগুলোতে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত নির্বাচনে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাবস্থায় নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। কিন্তু তার দল নির্বাচনে জেতেনি। তারা বলেন, গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকে সংলাপের আহ্বান করেছিলেন। সহিংস রাজনীতির মূল্য এখন বিএনপিকে দিতে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব:) মুহাম্মদ ফারুক খান নয়া দিগন্তকে বলেন, সুষ্ঠু ও সুন্দর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় তার একটি সংস্করণ আমরা দেখেছি। তিনি বলেন, আমরা যে যাই বলি না কেন আমাদের দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন তার প্রমাণ। আশা করি আগামীতে বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর হবে। আমরা যারা গণতন্ত্রের পক্ষে তাদের এখান থেকে অনেক কিছু শিক্ষা নেয়ার আছে। ফারুক খান বলেন, আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের জন্য শিক্ষা হলো নির্বাচন সুষ্ঠু হলে গণতন্ত্রের বিজয় হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে সহিংস রাজনীতি পরিহার করতে হবে। গণতন্ত্রের পথে, সংবিধানের পথে থাকতে হবে। তিনি বলেন, বিএনপির সাথে সংলাপের বিষয়ে আমরা কখনো ‘না’ বলিনি। আমরা সব সময় সংলাপের পক্ষে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে বিএনপিকে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারা আসেনি। আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ শুরু করেছেন। রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী যে পদক্ষেপ নেবেন, আমরা তা মেনে নেবো।
আওয়ামী লীগের নতুন রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতিতে একটি নতুন ধারা লক্ষ করেছি। এই ধারাটার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘আস্থার সম্পর্ক’। এই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আইভী বিজয়ী হওয়ার পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেনের বাসায় দেখা করতে গেছেন। তখন সাখাওয়াত হোসেন মেয়র আইভীকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই আস্থার সম্পর্কটা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এটি নির্ভর করছে সরকারের ওপর। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে ২০১৯ সালের নির্বাচন। ওই নির্বাচনে নাসিক নির্বাচনের একটি প্রভাব পড়বে। তখন পর্যন্ত দু’টি বড় দলের মধ্যে যদি আস্থার সম্পর্ক থাকে তাহলে রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ধারা সৃষ্টি হবে। তাহলে আমরা ২০১৯ সালে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন দেখতে পাবো।

You Might Also Like