খালেদা জিয়া দাঁড়ালেও আইভী জিততেন!

শিতাংশু গুহ :
sitangshu-guhaনারায়ণগঞ্জে আইভী জিতেছেন। এ জয় অবধারিত ছিল। সদ্য নারায়ণগঞ্জ ঘুরে এসে একজন জানান, খালেদা জিয়া দাঁড়ালেও ওখানে আইভী জিততেন। আগেরবারও আইভী প্রায় একই পরিমাণ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। তাহলে নৌকার ভোট গেল কই? ফেসবুকে একজন লিখেছেন, নৌকা না নিলে আইভী আরো বেশি ভোটে জিততেন, যদিও এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন। তবে আরেকজন বলেছেন, এটা কোনো নির্বাচন হলো? কেন? একটা পটকাও ফুটলো না! নির্বাচনটি আসলে ভালোই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আইটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, ‘সুন্দর নির্বাচন হয়েছে, এমনকি বিএনপির কোনো অভিযোগ নেই’। খেলার মতো নির্বাচনেও জয়-পরাজয় থাকবে, কথা হলো নির্বাচনে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে কিনা? নারায়ণগঞ্জে হয়েছে। প্রমাণ হয়েছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব।
আইভীও একই কথা বলেছেন যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, নারায়ণগঞ্জ এর প্রমাণ। তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি প্রতিদ্ব›দ্বীর বাসায় গিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যদিও গয়েশ্বর রায় কিছু উল্টাপাল্টা বলেছেন এবং ওবায়দুল কাদের এর যথার্থ জবাব দিয়েছেন। রাজনীতিতে এটা স্বাভাবিক, কিন্তু নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন প্রমাণ করেছে, দুই পক্ষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব। মাগুরা নির্বাচন যেমন বিএনপির জন্য কাল হয়েছিল, নারায়ণগঞ্জ ঠিক ততটাই আওয়ামী লীগের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। এদিকে রাজনৈতিক সংলাপ শুরু হয়েছে। রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আবদুল হামিদ এবং খালেদা জিয়ার হাস্যোজ্জ্বল ছবি জনমনে আশার সঞ্চার করেছে। এরশাদ চাচার হাসি তো আছেই। রাজনৈতিক নেতারা সবাই মিলে হাসতে পারলে দেশের মানুষ খুশিতে হাসবে।
দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাটা পাকাপোক্ত হলে সবারই লাভ। সংবিধানে নির্বাচন কমিশন নিয়ে যে আইন করার কথা বলা হয়েছে, জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার এটি করলে ক্ষতি কি? এই সরকারের অনেক অর্জনের ঝুলিতে এটিও আর একটি অর্জন হিসেবে সংযোজিত হবে। আব্দুল গাফফার চৌধুরী বলেছেন, শেখ হাসিনা না থাকলে দেশ আফগানিস্তান হতো। কথাটা সত্য। একইভাবে এ কথাও বলা যায়, শেখ হাসিনাই পারেন বাংলাদেশকে একটি উন্মুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামক একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র জন্ম নেয়। সেই সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র থেকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশের জন্ম। দেশের মানুষ মোটামুটিভাবে পাকিস্তানবিরোধী হলেও পাকিস্তানি চেতনা বা ধ্যান-ধারণার ততটা বিরোধী নয়। সেই চেতনার যদি পরিবর্তন আনা না যায়, তাহলে বাংলাদেশ তো আর একটি মিনি পাকিস্তানই থাকল। তাই দরকার মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় দিবসের চেতনার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
নিঃসন্দেহে দেশ অনেকটা এগিয়ে গেলেও চেতনার দিকটায় তেমন অগ্রগতি চোখে পড়ে না, বরং হচ্ছে উল্টোটা। সেই পঁচাত্তরে মহানায়কের তিরোধানের পর স্বাধীনতা বিরোধীরা চেতনার রশি টেনে ধরেছে, আমরা পিছু হটেছি। এদের অনেকেই এখন চেতনার পতাকাতলে। জামায়াত এ বছর ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ পালন করেছে। সামনে হয়তো শহীদ বুদ্ধিজীবীর তালিকায় গোলাম আযম, মীর কাসেম বা নিজামীর নাম দেখা যাবে? যেমন যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর কারো কারো কবরে ‘শহীদ’ লেখা হয়েছে। প্রশাসন অবশ্য বলছে, ওগুলো সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো- এবারকার বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানমালায় জামায়াতের একটি ব্যানারে দেখলাম, ‘স্বাধীনতা এনেছি, স্বাধীনতা রাখবো’ লেখা। চমৎকার! এ জন্যেই হয়তো দেশে ঘনঘন বিমানে ত্রুটি ধরা পড়ছে। এতে শংকিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে বৈকি। একমাত্র গণতান্ত্রিক চেতনাই পারে ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে।
চেতনার কথা উঠলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আসে। সদ্য বিজয় দিবস চলে গেল। বিজয় দিবস ছিল, আছে; কিন্তু এর চেতনা অনেকাংশে ¤øান। হয়তো জামায়াতকে তাই স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব নিতে হচ্ছে? একাত্তরের বিজয় দিবসের চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, আমরা সবাই বাঙালি ছিলাম। সবার হৃদয়ে ছিল রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় নজরুল। এখনো কি তা আছে? রথীন্দ্রনাথ রায় এখনো প্রায়শ এ গানটি গাইতে পছন্দ করেন- ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার মুসলিম, বাংলার ক্রিস্টান, বাংলার বৌদ্ধ- আমরা সবাই বাঙালি’। ২০১৬-তে এসে আসলে কি সত্যিই এ কথা বলা যাবে? দেশ অনেক এগিয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে বাংলাদেশ। কিন্তু চেতনার জায়গাটি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।
নারায়ণগঞ্জে নির্বাচন ছিল গণতান্ত্রিক চেতনার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে গণতান্ত্রিক চেতনার তেমন তফাৎ নেই। কিন্তু সাঁওতাল পল্লীতে পুলিশ আগুন দিচ্ছে, এটা কেমন চেতনা? পুলিশ অবশ্য বলেছে, আগুন দেয়া নয়, পুলিশ আগুন নেভাচ্ছিল। এই ভিডিওটি প্রকাশ করেছে ‘আল-জাজিরা’, আমাদের ন¤্রভদ্র সুশীল, মিডিয়া এটি পেল না কেন? একটি বিদেশি মিডিয়া এটি পেল কী করে? দেশে বিদেশি মিডিয়া বন্ধের জন্য আন্দোলন করছেন কেউ কেউ। অথচ এ ঘটনা প্রমাণ করে বিদেশি মিডিয়ার প্রয়োজন আছে। দেশি মিডিয়াকে বিদেশি মিডিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে যোগ্যতার বিচারেই টিকে থাকতে হবে। ষাটের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের স্বার্থে ভারতীয় ম্যুভি আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। পঞ্চাশ বছর পর আমাদের চলচ্চিত্রের দুর্দশার কথা আর নাইবা তুললাম। বিশ্ব ছোট হয়ে গেছে, সব কিছু বন্ধ করে দিয়ে কিছু হবে না, বাংলাদেশকে প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা করে মেধা ও যোগ্যতার মাপকাঠিতে এগিয়ে যেতে হবে।
সাঈদীর ছেলে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা দেন বা জামায়াত পিতার সন্তান হয় ছাত্রলীগের সভাপতি, তখন চেতনার বড়াই করে লাভ নাই! মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নামে আছে, কামে নাই। কারো দোষ দিয়ে লাভ নেই, দায় সবার। আমরা সবাই মিলে ব্যর্থ হয়েছি। ব্যর্থ হয়েছি, তাও বলা যায় না, আমরা চাইনি। আমরা বিজয় চেয়েছি, চেতনা চাইনি। হয়তো এ জন্য এখন বিজয় আছে, চেতনা নেই! আবার দেখলাম প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম অন্য এক চেতনার কথা বললেন। তিনি বললেন, পর্নো-সাইটে প্রবেশকারীদের নামধাম প্রকাশ করা হবে। ভাবলাম, এ কেমন চেতনা? ভাগ্য ভালো, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই আবার তারানা হালিম বলেছেন, তিনি ওকথা বলেননি। এও বললেন, প্রশ্নই ওঠে না, টেকনিক্যালিও সম্ভব নয়। আসলে আমাদের দেশে বহুবিধ চেতনা আছে, শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছাড়া! কেউ কি কখনো ভেবেছেন, যারা জিন্নাহকে খুশি মনে ‘জাতির পিতা’ মানতে অতিশয় উৎসাহী ছিলেন, তাদের কেন বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা মানতে এতটা আপত্তি? এটাও চেতনা, তবে ভিন্নধর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। সম্ভবত এই চেতনা দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে?
নিউইয়র্ক, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৬
শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।

You Might Also Like