প্রধানমন্ত্রীর চীন ও জাপান সফর থেকে প্রাপ্তি

মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান ও চীন সফর যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হলেও, যে প্রশ্নটি উঠেছে তা হচ্ছে তার এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কী? ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর ওই নির্বাচন সারা বিশ্বেই গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে বিতর্কিত হয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর জাপান ও চীন সফর এই গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে একটি প্লাস পয়েন্ট। দাতা দেশগুলো যে বর্তমান সরকারকে সর্বান্তকরণে মেনে নিয়েছে, এটা তার বড় প্রমাণ। তবে এই দুই সফর নিয়ে প্রশ্ন যে নেই, তা বলা যাবে না। বাংলাদেশের পূর্বমুখী কূটনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির আলোকে এই দুই সফরের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র এখন এশিয়া, বিশেষ করে চীন, জাপান ও ভারত। অনেকেই স্মরণ করতে পারেন, চীন এরই মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং জাপানকে হটিয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে ভারত। ২০০৫ সালে ভারত দশম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ছিল। ২০১১ সালে এসে ভারত জাপানকে পিছে ফেলে দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও শীর্ষ অবস্থানটা ধরে রেখেছে। ইন্টারন্যাশনাল কম্পারিজন প্রোগ্রাম (আইসিপি) এ তথ্য প্রকাশ করেছে। আর বিশ্বব্যাংক গ্র“পের ডেভেলপমেন্ট ডাটা গ্র“প এ কর্মসূচির আয়োজন করেছিল। ফলে প্রধানমন্ত্রীর জাপান ও চীন সফরের যে গুরুত্ব থাকবে, তা কাউকে বলে দিতে হয় না।

বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্ব বাণিজ্যের মাত্র ১ ভাগ জাপান সম্পন্ন করে ঢাকার সঙ্গে। এটা আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতির জন্য কোনো আশাব্যঞ্জক খবর নয়। যেখানে ২০১২-১৩ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ ছিল ৪৯৬০ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলার, সেখানে জাপানে এই রফতানির পরিমাণ মাত্র ৬৭৯ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন ডলার। জাপানের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক ঘাটতির পরিমাণ ৬৪৬ মিলিয়ন ডলার। তবে এটা সত্য, গেল ৫ বছরে জাপানে বাংলাদেশী রফতানি বেড়েছে আড়াইগুণ, আর তৈরি পোশাকের রফতানি বেড়েছে ২০ গুণ। বাংলাদেশের ১১তম পণ্যের বাজার হচ্ছে জাপান। এই রফতানির পরিমাণ আরও বাড়ানো যায়। আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটা বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, আমরা জাপানি বিনিয়োগকে বাংলাদেশে আকৃষ্ট করতে পারিনি। যেখানে ২০০২ সালে জাপানি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলার, ২০০৯ সালে তা বেড়েছে ৫৮ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ডলার। অথচ জাপান ভিয়েতনামে বিনিয়োগ করেছে ৪ বিলিয়ন ডলার। জাপান আমাদের যে ঋণ দেয়, তাও খুব বড় অংকের নয়। ২০০৪ সালে ঋণ দিয়েছিল ৭৯ মিলিয়ন ডলার, ২০১৩ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩১৮ মিলিয়ন ডলারে। জাপান বাংলাদেশে যে পরিমাণ ঋণ দেয়, তা এলডিসিভুক্ত দেশগুলোকে দেয়া ঋণের মাত্র ২৬ ভাগ। এ পরিমাণ অর্থ শুধু কম্বোডিয়ার পরেই। বিনিয়োগ কিংবা বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে জাপানে আমাদের দূতাবাস কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এমনকি আমরা নিজ দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতিরও উন্নতি করতে পারিনি। একাধিক সেমিনারে কিংবা আন্তর্জাতিক পরিসরে বিনিয়োগের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগ সংক্রান্ত পরিস্থিতির খুব যে একটা উন্নতি হয়েছে, তা বলা যাবে না। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি, তার কাঠামোগত উন্নয়ন, লাল-ফিতার দৌরাত্ম্য- কোনো একটি ক্ষেত্রেও আমরা শতভাগ সফলতা অর্জন করতে পারিনি। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। নিঃসন্দেহে বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক বেড়েছে। এখানে দায়বদ্ধতার প্রশ্ন আছে। চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে আমরা নতুন নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে পারিনি। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে পারিনি আমরা। এমনকি তথাকথিত ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রবর্তন করলেও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বিনিয়োগকারীদের জন্য হতাশার অন্যতম একটি কারণ। জাপানি বিনিয়োগকারীরা কম্বোডিয়া কিংবা ভিয়েতনামে যে সহযোগিতা পান, বাংলাদেশে তারা পান না। ফলে জাপানি বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি সাধিত হয়নি। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, জাপানের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুব আশাব্যঞ্জক নয়। রফতানির দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে রয়েছে (শতকরা ২৪ ভাগ)। এমনকি জাপানের অবস্থান স্পেনেরও নিচে (স্পেনে রফতানি হয় ৪ দশমিক ২ ভাগ)। অন্যদিকে বাংলাদেশের আমদানির ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে চীন, শতকরা ১৭ ভাগ। এরপর ভারতের অবস্থান ১৫ দশমিক ৭ ভাগ। জাপানের অবস্থান কুয়েত ও সিঙ্গাপুরেরও পরে। অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সফলতা পেতে হলে এদিকে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী জাপান সফরের সময় ৬০০ কোটি ডলারের সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছেন। নিঃসন্দেহে গত ৩৫ বছর বাংলাদেশ জাপান থেকে যে ঋণ সহায়তা পেয়েছে, তার পরিমাণ এর চেয়ে কম। কিন্তু মনে রাখতে হবে এটা প্রতিশ্র“তি। এই ঋণ প্রতিশ্র“তি শর্তমুক্ত নয়। শর্তযুক্ত। আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে এই ঋণ খরচ করতে হবে। জাপানিরা যেসব প্রকল্পে এই ঋণ ব্যবহৃত হবে, তা মনিটর করবে। এর সঙ্গে দুর্নীতির প্রশ্ন যদি থাকে, বাস্তবায়নে যদি শ্লথ গতি আসে, তাহলে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়ার ইতিহাস আছে। সুতরাং ৬০০ কোটি ডলারের আশ্বাসে উৎফুল্ল হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে যে যৌথ ইশতেহার প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে কিছু কিছু বক্তব্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে একটা বক্তব্য ছিল এ রকম : ৫ জানুয়ারির নির্বাচন জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন হিসেবে মেনে নেয়নি জাপান। সবার উচিত জনগণের ভোটদানের সুযোগ সৃষ্টি করা। এ ধরনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে জাপানের মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। এখন জাপানি ঋণের ব্যাপারে এই মনোভাব আদৌ প্রতিফলিত হয় কিনা, সেটা দেখার বিষয়। প্রতিশ্র“তি পাওয়াই সব কথা নয়। প্রকল্পগুলোর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করে আমরা কতটা দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে এই ঋণ ব্যবহার করছি তার ওপর। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং একটু বেশিই।

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। স্বাধীনতা আন্দোলনে চীনের বিরোধিতা, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দুই কুকুরের লড়াই-এর তত্ত্ব উপস্থাপন, ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর স্বীকৃতি এবং তারও পরে ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে জেনারেল জিয়ার প্রথম চীন সফরের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো চীনের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ে সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৬ জুন তার চীন সফর শুরু করেন। তবে মূল সফর শুরু হয় ৮ জুন থেকে, যখন তিনি চীনা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বিষয়াদি নিয়ে আলাপ-আলোচনা শেষ করেন ও একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলেও, সেই পঞ্চম শতাব্দী থেকে আজকের যে বাংলাদেশ, এই অঞ্চলটির সঙ্গে চীনা সাম্রাজ্যের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। ওই সময় চীনা ধর্মগুরু ণরলরহম এবং ঢঁধহুধহম বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এসেছিলেন বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। তবে বহুল আলোচিত বৌদ্ধ ধর্মগুরু অতিশ দীপংকরের ৮ম শতাব্দীতে তিব্বতে ধর্ম প্রচারের জন্য গমন ও দেহত্যাগ ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। চীনারাও তার এই অবদানকে স্মরণ করেন। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলেই অতিশ দীপংকরের দেহভস্ম বাংলাদেশে ফেরত আনা হয়েছিল। যারা চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের কিছুটা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন এডমিরাল ঝোং হে (আসল নাম মা হে) ইউনান রাজ্যের প্রতিনিধি হয়ে ১৪২১-১৪৩১ সময়সীমায় দুদুবার বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ে এসেছিলেন। তিনি ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ সাল এই ২৮ বছর প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগরভুক্ত বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে ইউনান রাজ্যের সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। চীন এখন এডমিরাল বেনাং-এর সেই অবদানকে স্মরণ এবং সম্মান করে। এখন প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর সেই পুরনো সম্পর্ককেই আবার স্মরণ করিয়ে দিল।

স্পষ্টতই প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মধ্য দিয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট জি জিং পিং-এর বাংলাদেশ সফরের একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হল। বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট জি জিং পিং ভালো ধারণা রাখেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গেও তার ব্যক্তিগত পরিচয় রয়েছে। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী ও খালেদা জিয়ার চীন সফরের পরপরই ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আসেননি। ভারতের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এরই মধ্যে চীনা প্রেসিডেন্টকে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং ধারণা করছি চলতি বছরের যে কোনো এক সময় এই সফর হতে পারে। এই সুযোগটি বাংলাদেশ নিতে পারে এবং ওই সময় প্রেসিডেন্ট জি জিং পিংও যাতে ঢাকা সফর করতে পারেন, সে ব্যাপারে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। মোদির ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের রাজনীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসবে। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেও চীন তথা ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে গুরুত্ব দেবে বেশি। বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের বাইরে থাকতে পারে না। তাই প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ছিল সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ।

চীন বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার। বাংলাদেশের বেশ কটি বড় প্রজেক্টে চীন অর্থায়ন করেছে। বেশ কটি ব্রিজও চীন তৈরি করে দিয়েছে, যা চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু নামে পরিচিত। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের সময় চীনের কাছ থেকে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো ও বিশেষ ছাড়ের দাবি বাংলাদেশ উত্থাপন করেছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে চীনের ঋণের ক্ষেত্রে পরিশোধের মেয়াদ ১০ থেকে ১৩ বছর, এছাড়া আরও ৩ বছর গ্রেস পিরিয়ড দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী এই ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ২০ বছরের পাশাপাশি গ্রেস পিরিয়ড ৫ বছর বৃদ্ধি করার অনুরোধ করেছেন। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাণিজ্য চীনের অনুকূলে। বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য চীনে রফতানি করে, তার চেয়ে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ গুণ পণ্য বেশি আমদানি করে। ১৯৯৭-৯৮ সালে বাংলাদেশ রফতানি করেছিল ৪৮.৫১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, আর আমদানি করেছিল ৫৯২.৬৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ২০০১-২০০২ সময়সীমায় প্রায় ৬১ গুণ বেশি মূল্যের পণ্য আমদানি করতে হয়েছিল (১১.৬৭ মি.-এর বিপরীতে ৭০৮.৯৪ মি.)। ২০১২-১৩ সালে এটা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫৮.১২ মি. (রফতানি) ও ৬৩২৪ মি. (আমদানি)। অন্যদিকে চীনের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ তেমন বেশি নয়। ২০০৫ সাল পর্যন্ত চীন ঋণ দিয়েছিল ১৮১ মি. ডলার, যা ছিল সুদমুক্ত। একই সঙ্গে ৭৫ মি. কম সুদে, ৭৬৪ মি. সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট ও ৩২.৯৪ মি. অনুদান দিয়েছিল। ২০১৩ সালে চীন তার নিজ দেশে ৫০০০ আইটেমের বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ করে দিয়েছিল। বাংলাদেশ মূলত ফ্রজেন ফুড, পাটজাত দ্রব্য, চা, চামড়া, তৈরি পোশাক চীনে রফতানি করে। চীনা বিনিয়োগের যে পরিসংখ্যান আমরা পাই, তাতে দেখা যায় ২০০৯ সালে চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে ৮৮ মিলিয়ন ডলার। আর ২০১৩ সালে এসে ১৮৬ জন উদ্যোক্তা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে ৩২০ মিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সেক্টরের কথা বলা যায়। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের ৭৫ ভাগের উৎস হচ্ছে চীন। চীন থেকে ট্যাংক, সাঁজোয়াযান, আর বিমান বাহিনীর জন্য ফাইটার প্লেন ক্রয় করা হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগেই বাংলাদেশ-চীন সামরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জীবদ্দশায় জিয়া একাধিকবার চীন সফর করেছেন। ২০০৯ সাল পর্যন্ত চীনের ঊর্ধ্বতন জেনারেলদের বাংলাদেশ সফর ছিল নিয়মিত। এখন ওই প্রবণতা কিছুটা কম। ২০০২ সালে খালেদা জিয়ার সময়সীমায় বাংলাদেশ ও চীন একটি সামরিক সহযোগিতামূলক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।

তবে এটা স্বীকার করতেই হবে যে, চীনের সঙ্গে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ সংক্রান্ত চুক্তি না হওয়ায় আমাদের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির জন্য তা একটি দুঃখজনক সংবাদ। যদিও উভয় পক্ষই বলেছে তারা এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা আরও চালিয়ে যাবে। এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন আসবে। চীন ও ভারত এ সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে পারবে। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রচুর। পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের গাওদারে, শ্রীলংকার হামবানতোতা ও কলম্বোতে একাধিক সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে চীন। এসব ক্ষেত্রে চীন কী ধরনের ঋণ দিয়েছে কিংবা বন্দর পরিচালনা কাদের হাতে ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালানো উচিত ছিল। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেও যখন চুক্তিটি হল না, তখন এটা নিয়ে নানা কথা উঠবে এখন এবং প্রধানমন্ত্রীর সফরের সাফল্যকে কিছুটা হলেও তা ম্লান করেছে। চীনের সঙ্গে অন্য যেসব চুক্তি হয়েছে, তা অত্যন্ত সাধারণ।

বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে জাপান ও চীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এমন কথাও বলা হচ্ছে যে, ২০১৮ সালে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে জাপানের প্রার্থিতাকে সমর্থনের বিনিময়ে বাংলাদেশ জাপান থেকে প্রচুর সাহায্যের আশ্বাস পেল। বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদে জাপান ও ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের যুক্তিকেও সমর্থন করে। তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার আদৌ সম্পন্ন হবে কিনা, সে প্রশ্ন রয়েই গেছে। অস্থায়ী সদস্য পদে জাপানের প্রার্থিতাকে বাংলাদেশ সমর্থন করতেই পারে। জাপান বৈদেশিক সাহায্যের অবমুক্তির সময় দুর্নীতি আর স্বচ্ছতাকে বেশি প্রাধান্য দেয়। আর চীন প্রাধান্য দেয় ব্যবসাকে। সুতরাং আগামীতে বাংলাদেশ কত
স্বচ্ছতার ভিত্তিতে জাপানি ঋণ ব্যবহার করতে পারবে, সে প্রশ্নটি থেকেই গেল।

ড. তারেক শামসুর রেহমান, অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

You Might Also Like