দাউদ মার্চেন্টকে গোপনে ভারতের কাছে হস্তান্তর

গোপনীয়তার সঙ্গে আলোচিত সন্ত্রাসী আবদুর রউফ মার্চেন্ট ওরফে দাউদ মার্চেন্টকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আসাদুজ্জামান খান কামাল শুক্রবার এই খ​বরের সত্যতা স্বীকার করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকার অনলাইন সংস্করণের এক খবরে বলা হয়, ওই​ দিনই দাউদ মার্চেন্টকে বাংলাদেশ থেকে মুম্বাইয়ে নেওয়া হয়। ওই সন্ত্রাসীর ঠাঁই এখন মুম্বাইয়ের কারাগারে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গুলশান কুমার হত্যা মামলা ছাড়াও হত্যা প্রচেষ্টা ও অস্ত্র আইনে দাউদ মার্চেন্টের বিরুদ্ধে দশটি মামলা রয়েছে।

গত রবিবার বিকেলে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে দাউদ মার্চেন্টকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির পর তার অবস্থান সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি।

দাউদ মুম্বাইয়ের সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান টি-সিরিজের মালিক গুলশান কুমার হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি। সে মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের সহযোগী।

১৯৯৭ সালের ১২ আগস্ট আন্ধেরি এলাকার একটি মন্দির থেকে বের হওয়ার সময় গুলশান কুমারকে হত্যা করা হয়। ওই হত্যা মামলায় ভাড়াটে খুনি দাউদ গ্রেপ্তার হয়। ২০০২ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় ভারতীয় আদালত। সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে দাউদ।

২০০৯ সালে ১৪ দিনের প্যারোলে মুক্তি পেয়ে পালিয়ে যায় দাউদ। ওই বছরের ২৮ মে ভারত সীমান্তবর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এক সহযোগীসহ তাকে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশের পুলিশ। এরপর জাল পাসপোর্ট তৈরি ও অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে দাউদ জামিনে কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পায়। এরপর তাকে আটক করে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গত ৩ নভেম্বর দাউদ মার্চেন্টকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারার অভিযোগ থেকেও অব্যাহতি দেয় আদালত। সাত বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর দাউদ মার্চেন্ট মুক্তি পায়।

এরপর তার গন্তব্য সম্পর্কে সরকারি কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির গত সোমবার বলেন, রবিবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে দাউদকে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর তার অবস্থান সম্পর্কে তাদের কাছে তথ্য নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপ–কমিশনার মাসুদুর রহমান শুক্রবারও বলেন, দাউদ সম্পর্কে তাদের কাছে তথ্য নেই।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুক্রবার রাতে বলেন, বাংলাদেশে সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ায় দাউদকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কারণ এমন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে রাখার সুযোগ নেই।

দাউদ মার্চেন্ট ভারতের মুম্বাইয়ের অপরাধ জগতের ‘ডন’ হিসেবে পরিচিত দাউদ ইব্রাহিম ও ছোটো শাকিলের সহযোগী বলে এর আগে ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জে বোমা হামলার মূলত হোতা ছিল দাউদ।

দাউদ ছাড়া এর আগে বাংলাদেশ থেকে একইভাবে উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে সাজার মেয়াদ শেষে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অনুপ চেটিয়া প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশের জেলে ছিলেন। তার বদলে সাত খুনের আসামি নূর হোসেনকে ফেরত পায় বাংলাদেশ।

দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়েছে, দাউদকে দেশে ফেরাতে অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলছে ভারত। ভারতের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পরই বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ দাউদ মার্চেন্টকে মেঘালয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে তুলে দেয়।

খবরে আরো বলা হয়, ইন্টারপোলের সহায়তায় সীমান্তে দাউদ মার্চেন্টের হস্তান্তর-প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছে, দাউদ মার্চেন্ট অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় বিএসএফের হাতে আটক হন।

এ ব্যাপারে পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) সঞ্জয় সাক্সেনা দ্য হিন্দুকে বলেন, দাউদ মার্চেন্টকে জিজ্ঞাসাবাদের পরই বিএসএফ জানতে পারে যে সে মুম্বাইয়ে গুলশান কুমার হত্যা মামলার আসামি। ওই মামলায় কারাবাসের সময় প্যারোলে মুক্তি পেয়ে লাপাত্তা হয়ে যায় সে।

এদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়, হাই কোর্টের নির্দেশনা অনুসারে দাউদ মার্চেন্টকে শুক্রবার মুম্বাইয়ের দায়রা আদালতে তোলা হলে বিচারক তাকে আর্থার রোড জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

নাম প্রকাশ না করে ভারতীয় পুলিশের এক কর্মকর্তার বরাতে হিন্দুস্থান টাইমসের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে খবর পেয়ে মুম্বাই পুলিশের অপরাধ শাখার চারজন কর্মকর্তা পশ্চিমবঙ্গে যান কয়েকদিন আগে। দুই দেশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মধ্য দিয়ে দিন ও স্থান গোপন রেখে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন জানান, দাউদ বা অনুপের মতো আসামি বাংলাদেশের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। দ্বিপক্ষীয় সম্প​র্কের মাধ্যমে তাদের ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক।

তিনি বলেন, দুই প্র​তিবেশি দেশের কেউই এখন সন্ত্রাসীকে আশ্রয়–প্রশ্রয় দিচ্ছে না। এটা ভালো লক্ষণ বলে মনে করেন ওই অধ্যাপক।

You Might Also Like