লাশে-গুমে বাঙ্গালীর সোনা প্রীতি

গাজী আলাউদ্দিন আহমদ

মাছে-ভাতে বাঙ্গালীর পরিচয়টা আর মনে হয় থাকছে না। বাজারে দেশি মাছ এখন পাওয়াই দুষ্কর। যাও বা মেলে দাম সাধারণের নাগালের বাইরে। আর চালের দাম যে গতিতে বাড়ছে তাতে বাঙ্গালী হয়তো খুব শিগগিরই খাদ্যাভ্যাস বদলাতে বাধ্য হবে। মাছ-ভাত নিয়ে বাঙ্গালীর এই যখন অবস্থা তখন খুন গুম অপহরণ নিয়ে বিশ্বে নতুন ভাবে পরিচিতি পাচ্ছে রক্ত দিয়ে ভাষার স্বীকৃতি ও স্বাধীনতা পাওয়া এ জাতি।
নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা এখন কেবল শীতলক্ষ্মা পাড়ের কোন কাহিনী নয়। একটি সমাজে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কিছু অসৎ কর্মকর্তাকে টাকার বিনিময়ে শাসকদলের নেতার পরিকল্পনা কিভাবে দিনে দুপুরে বাস্তবায়ন করা যায় তার প্রতিচ্ছবি নারায়ণগঞ্জ। যে নারায়ণগঞ্জ এক সময় ব্যবসা বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে দেশ বিদেশে পরিচিতি পেয়েছিল তা এখন লাশের এক নগরী। লাশ ধারণ করতে করতে শীতলক্ষ্মা এখন অনেকটা ক্লান্ত। তাইতো একটি সুপ্রশিক্ষিত বাহিনীর চৌকস সদস্যরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সাত সাতটি লাশ ইটের বস্তা বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিলেও তা ভাসিয়ে দিয়েছে ‘ক্লান্ত শীতলক্ষ্মা’। জানান দিয়েছে, ‘আমি আর পারছি না, তোমরা এসব বন্ধ কর’। কিন্তু কই, খুনের সাথে জড়িত হিসেবে অভিযুক্তদের যখন বিদেশে পালিয়ে যেতে সুযোগ করে দেয়া হয়, গ্রেফতারের ব্যাপারে উচ্চ আদালতের আদেশে উষ্মা প্রকাশ করা হয় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে, এমনকি বির্তকিত ও সন্দেহভাজন কোন পরিবারের পাশে থাকার ঘোষণা দেয়া হয় পবিত্র সংসদে, তখন দেশবাসী শংকিত হয়ে পড়ে নতুন লাশ পড়ার শংকায়।
শুধু কি নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, পাবনা, যশোরে আমরা কি দেখছি। আর সিলেটের পরিস্থিতিতো আরও ভয়াবহ। সেখানে মানসম্পন্ন চিকিৎসক গড়ার একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ। ঐ কলেজের চারটি ছাত্রাবাসের মধ্যে একটি আবুসিনা। নগরীর চৌহাট্টা-মেডিকেল ভিআইপি রোডের পাশেই এর অবস্থান। যেখানে ছাত্রলীগের তত্বাবধানে গড়ে তোলা হয়েছে ‘টর্চার সেল’। ৪ জুন এখানেই পিটিয়ে হত্যা করা হয় ছাত্রদল নেতা তাওহীদকে। কলেজ শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি সৌমেন দে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে। তার স্বীকারোক্তিতেই বেরিয়ে আসে ‘টর্চার সেল’ এ নির্যাতনের কাহিনী। বিরোধী ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী ও টার্গেট ছাত্রদের কাছে চাঁদা না পেলে এ টর্চার সেলে এনেই চলত নির্মম নির্যাতন। মাদক সেবনের আস্তানা আর ছাত্রলীগের অস্ত্রাগারও ছিল সেখানে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সৌমেন দে আরও বলেছে, তাওহীদের কাছে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল ছাত্রলীগ। এ টাকা না দেয়ায় টর্চার সেলে নিয়ে পিটিয়ে খুন করা হয় তাওহীদকে। এর আগেও বহু ছাত্র এ কক্ষে শিকার হয়েছেন নির্মম নির্যাতনের। অথচ মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর এমএজি ওসমানীর নামে প্রতিষ্ঠিত এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কলঙ্কিত করতে একটুও দ্বিধা করেনি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারী হিসেবে দাবিদার এই ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ হত্যার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের ১০ নেতাকর্মীকে ইতোমধ্যে বহিস্কার করলেও ছাত্রলীগ তাদের বিরুদ্ধে কোন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে, এমন খবর জানা যায়নি।
ছাত্রদল নেতা তাওহীদের পরিবার তাদের নিহত ছেলের লাশের জানাজা দাফন ও কুলখানী করার সুযোগ হয়তো পেয়েছে। তবে বঞ্চিত হয়েছেন ঐ সিলেটের আরেক সন্তান সাবেক এমপি ইলিয়াস আলীর পরিবার। ইলিয়াস আলী বেঁেচ আছেন কিনা তা সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন। আর তারা জানেন, যারা তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ‘নারায়ণগঞ্জ ষ্টাইলে’। শুধু কি ইলিয়াস আলী, কাউন্সিলর চৌধুরী আলম, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শামীম, বেনাপোলের পৌর কাউন্সিলর ও আ’লীগ নেতা তারিকুল আলম তুহিনসহ অসংখ্য নেতাকর্মী গুম হয়েছেন গত ৫ বছরে। তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা পরিবারের জানা নেই। অথচ এইসব হতভাগ্য পরিবারের পাশে থাকার ঘোষণা কোন নেতা-নেত্রী মহান জাতীয় সংসদে দিয়েছেন বলে জানা যায়নি।
এদিকে দেশে এখন নদী, খাল, বিল, বন-জঙ্গল, ধান ক্ষেত, রাজধানীর ফ্লাইওভার, রাস্তার পাশ সহ যেখানে সেখানে প্রতিদিনই পাওয়া যাচ্ছে লাশ। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিচয়হীন। গত পাঁচ বছরে শুধু আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামই অজ্ঞাত হিসেবে ৬ হাজার ৪১৩ জনের লাশ দাফন করেছে। রাজধানী সহ বিভিন্ন জেলায় এসব লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পরিচয় না পেয়ে তা আঞ্জুমানে হন্তান্তর করা হয়। গত পাঁচ বছরের মধ্যে রেকর্ড সংখ্যক বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া গেছে গত বছর। চলতি বছরের গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৪৫১টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। পরিচয়হীন লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিকেশন্স-এর চেয়ারম্যান ও ট্রাস্টি আজিম বক্শ বলেন, “দেশে খুন-খারাবি বাড়ছে। অপমৃত্যু ঘটছে। বাড়ছে জনসংখ্যাও। এসব কারণেই বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা বাড়ছে।” তবে মানবাধিকারকর্মী ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, গত পাঁচ বছরে পরিচয়হীন লাশ বেড়ে যাওয়ার পেছনে অপরাধ প্রবণতা, রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতা অন্যতম কারণ। ওই সময় থেকেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। বৃদ্ধি পায় খুন, গুমসহ নানা অপরাধ। এক্ষেত্রে লাশ শনাক্তকরণে আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে মনে করেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, বিকৃত লাশ পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু অপরাধীদের শনাক্ত করা হচ্ছে না। তাদের বিচার হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই নিষ্ক্রিয়তার কারণেই অপরাধীরা সুযোগ নিচ্ছে।
গুম বা অপহরণের শিকার নেতাকর্মীদের ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধীদল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউটে সম্প্রতি একটি সভা করতে চাইলেও তাতে শেষ মুহুর্তে বাধা দিয়ে ভন্ডুল করে দেয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। পরবর্তীতে একই দাবিতে সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে আইনজীবীদের সমাবেশও করতে দেয়া হয়নি। ফলে দেশে বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে যে খুন গুম বা অপহরণের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করাও যেন দুষ্কর। এর বিরুদ্ধে যারা সংবাদপত্রে কলাম লিখছেন বা টেলিভিশনে টক শোতে সোচ্চার তাদের পরিবারের সদস্যরাও আছেন অজানা আতংকে, ‘না জানি কখন কি হয়’। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ‘বিশেষ দূত’ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গত ১১ জুন লালমনিরহাটে বলেছেন, “শান্তিপ্রিয় মানুষ ঘরে থাকলে গুম হয়, আর বাইরে গেলে খুন হয়।” মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, কোন কোন দিন সারাদেশে এই সংখ্যা দুই অংকেও পৌঁছাচ্ছে।
সম্প্রতি সময়ে যেখানে সেখানে শুধু লাশই পাওয়া যাচ্ছে না, বেড়েছে মালিকবিহীন সোনা উদ্ধারের ঘটনাও। বাংলাদেশে সোনার খনি আবিষ্কৃত না হলেও বিমানের টয়লেট, যাত্রীর লাগেজ, পরিবহন, বিমান বন্দর, স্থল বন্দর, বাসা-বাড়ি এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছেও ইদানিং পাওয়া যাচ্ছে মহামূল্যবান এই ধাতুটি। দেশে সোনা চোরাচালানীরা সম্প্রতিকালে কতোটা বেপরোয়া তার জন্য একটি তথ্যই যথেষ্ট। সরকারী হিসেবে, ২০১২ সালে দেশে সোনা উদ্ধারের পরিমাণ ছিল ২৫ কেজি, যা ২০১৩-তে দাঁড়ায় ৫২০ কেজিতে। আর এ বছর প্রথম তিন মাসে উদ্ধার হয়েছে ২২০ কেজি। বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ধারকৃত এই সোনার পরিমান প্রকৃত চোরাচালানের খুব সামান্য মাত্র। আর এক্ষেত্রে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে সোনা পাচারের ‘অনেকটা নিরাপদ’ রুট হিসেবে বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ। এর সাথে বেশ কয়েকটি সংঘবদ্ধচক্র জড়িত বলে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
বাংলাদেশে এখন সোনা চোরাকারবারীদের সাথে সাথে সোনা চোররাও সক্রিয়। চুরি করতে করতে তারা এখন মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশী বন্ধুদের সম্মাননা স্মারক হিসেবে দেয়া ক্রেস্ট থেকেও সোনা খেয়ে ফেলেছে। প্রাথমিক তদন্তে এর সাথে ‘রাঘব বোয়ালরা’ জড়িত বলে তথ্য প্রমাণও পাওয়া গেছে। বিষয়টি এখন দুদক অধিকতর তদন্ত করছে। তবে যে সোনার বাংলার স্বপ্ন একদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন সেখানে তাঁর জীবদ্দশায় এত বড় কেলেংকারী হলে এসব ‘চাটার দলদের’ সম্পর্কে তিনি কি মন্তব্য করতেন জানি না, তবে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি অন্তত ‘রসিকতা’ করতেন না- এটা জোর দিয়ে বলা যায়।
(লেখক : উপ-পরিচালক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী)
ধযসবফশযঁষহধ৫৫৫@মসধরষ.পড়স

You Might Also Like