বিশ্বকাপের আনন্দ এবং প্রকৃত আনন্দ

১২ জুন থেকে পৃথিবী নামক ছোট্ট এই গ্রহটির মানুষ মেতে উঠবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শো বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে। খেলবে ৩২টি দেশ। তবে ১২ জুনের আগে থেকেই পৃথিবীর দেশে-দেশে উড়ছে প্রিয় দলের পতাকা। বাংলাদেশেও বিশ্বকাপের উত্তাপ। অপহরণ, গুম, হত্যা আর দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষের জন্য বিশ্বকাপ ফুটবল যেন আনন্দের আবহ নিয়ে আসছে। তবে এই আনন্দ যে তাদের আসল আনন্দ নয়, তা তারা উপলব্ধি করবে বিশ্বকাপের দিনগুলোতেও। কারণ প্রতিটি দেশেরই থাকে আনন্দ ও বিষাদের কিছু মৌলিক কারণ। আনন্দের মূল শর্তগুলো পূরণ করতে না পারলে কোনো দেশের মানুষের আনন্দ স্থায়ী হতে পারে না।

আমরা জানি, এবারের ফিফা বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতার আয়োজক দেশ দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল। বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় দলের তালিকায় দীর্ঘদিন ধরেই জায়গা করে নিয়েছে ব্রাজিল। ম্যারাডোনার দেশ আর্জেন্টিনার সমর্থকও কম নয়। খেলা চলে অন্য মহাদেশে আর প্রিয় দলের পতাকা ওড়ে বাংলাদেশে। বিশ্বকাপ ফুটবলতো হচ্ছে ব্রাজিলে। তাই আমাদের অনেকেরই ধারণা, পুরো ব্রাজিলেই উৎসবে টইটম্বুর হয়ে আছে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে। কিন্তু আসলে কি তাই? লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, সাময়িক আনন্দ আর প্রকৃত আনন্দ এক জিনিস নয়। নইলে ব্রাজিলের সর্ববৃহৎ সাও পাওলোর বাসচালকরা ২০ মে ধর্মঘট পালন করতে যাবে কেন? ধর্মঘটে ১১টি প্রধান টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। আটকে পড়ে বহু মানুষ। ধর্মঘট প্রসঙ্গে স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম ছিল, ‘প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হচ্ছে, রাঘব-বোয়ালদের নয়।’কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, বাসে চড়েন সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা ধনীরা নয়। উল্লেখ্য যে, ব্রাজিলের সমাজে উচ্চবিত্ত ও নি¤œবিত্তের মধ্যে পার্থক্য সবসময়ই বেশ স্পষ্ট। ১২ জুন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী খেলার আয়োজক সাও পাওলো। শহরটি ব্রাজিলের সবচাইতে ধনী শহর। বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ এসে জড়ো হয়েছে এখানে। অপেক্ষাকৃত গরীব উত্তরাঞ্চল থেকেও এসেছে অনেকে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ব্রাজিলের প্রদেশগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক পার্থক্য ছাড়াও রয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। ব্রাজিলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বিভক্তি সত্ত্বেও সবাই মনে করে যে, এখানে খাদ্য, পোশাক ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য অনেক বেশি। অবশ্য এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলেন সম্ভ্রান্ত রাজনৈতিক শ্রেণী। আর ব্রাজিলে জিনিসপত্রের উচ্চমূল্যের প্রধান কারণ ট্যাক্স। অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের আসল মূল্যের ৮০ ভাগ ট্যাক্স ধরা হয়ে থাকে। ব্রাজিলিয়ানদের সাধারণ ধারণা হলো, যে পরিমাণ অর্থ তারা ব্যয় করে সে তুলনায় প্রতিদান পায় কম। সম্প্রতি একটি পিউ গবেষণা সমীক্ষায় দেখা গেছে, জীবনযাত্রার চড়ামূল্যের পাশাপাশি অধিকাংশ ব্রাজিলিয়ানই বিদ্যালয়-ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ক্ষুব্ধ। বেসরকারি হাসপাতালের অবস্থাও ভাল নয়। ওই সমীক্ষায় আরো বলা হয়, ৮৩ শতাংশ ব্রাজিলিয়ানই মনে করেন, অপরাধ কর্ম ব্রাজিলের একটি গুরুতর সমস্যা। ফলে বিশ্বকাপের সময় রিওডি জেনিরো এবং সাও পাওলোর রাস্তায় টহল দেবে সেনাবাহিনী। প্রসঙ্গত এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়, ব্রাজিলের সরকার যখন বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নতুন স্টেডিয়াম ও বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে, তখন অনেক ব্রাজিলিয়ান মনে করছেন, এভাবে তাদেরকে স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলো থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ব্রাজিল যেহেতু বিশ্বকাপের কারণে এখন পৃথিবীর গণমাধ্যমের দৃষ্টিতে আছে, তাই অনেকেই দুনিয়ার সামনে নিজেদের দুঃখ-কষ্টের কথাগুলো তুলে ধরার সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিষয়টিও তাদের বিবেচনায় আছে। বিশ্বকাপের জন্য নতুন স্টেডিয়াম তৈরি করতে গিয়ে অনেক নাগরিককে ঘরছাড়া হতে হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু রিপোর্ট আছে। অনেক ব্রাজিলিয়ান আবার বিশ্বকাপের সময় প্রতিবাদের ঘটনায় মর্মাহত। তারা এসব প্রতিবাদকে সাধারণ মানুষের তৎপরতার চাইতে বরং রাজনৈতিক খেলার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন। অনেকে আবার ভীত। তবে কম নাগরিকই বিশ্বকাপকে সমর্থন করছেন। তারা মনে করছেন, ব্রাজিলের ওয়ার্ল্ড কাপ জয় অক্টোবরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দিলমা রুসেফের বিজয়কে নিশ্চিত করে দিতে পারে। রাজনৈতিক বিবেচনায় তাই এরা এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের পরাজয় কামনা করছেন। রাজনীতির কারণেই এবারের বিশ্বকাপকে নিয়ে ব্রাজিলিয়ানদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা বেশ জটিল বলেই মনে হচ্ছে।

ব্রাজিলের ফুটবল, সমুদ্রসৈকত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুবই দৃষ্টিনন্দন। তবে ব্রাজিলে দৃষ্টিকটু বিষয়ও আছে। আছে অপরাধ কর্মের দৌরাত্ম্যও। এ কারণেই হয়তো বিশ্বকাপ কাভারেজ করতে যাচ্ছেনÑ এমন সব সাংবাদিকের জন্য রয়টার্স গ্লোবাল সংস্থার প্রধান একটি ই-মেইল পাঠিয়েছেন। ই-মেইলটির বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে বিদেশের ইংরেজি পত্রিকাগুলোতে। বাংলা পত্রিকাতেও ওই বক্তব্য মুদ্রিত হয়েছে।

যেমন : ১. প্রকাশ্যে ছিনতাই হয়ে যেতে পারে আপনার ওয়ালেট, ফোন অথবা ল্যাপটপ। খুব সাবধানে থাকুন। ২. আপনার সর্বস্ব কেড়ে নেয়া হচ্ছে দেখলে টুঁ-শব্দটি করবেন না। কোনোরকম বাধা দেবেন না। ওরা যা চাইছে, কথা না বলে ওদের হাতে তুলে দিন। ৩. বেশি দামি জামা-কাপড় পরে ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন না। রাস্তায় ফোনে কথা বলতে বলতে হাঁটবেন না। ৪. রাস্তায় হেড ফোনে গান শুনতে শুনতে হাঁটবেন না। ব্রাজিলের রাস্তা আর যাই হোক, রিল্যাক্স করার জায়গা নয়। ৫. এটিএম মেশিন থেকে টাকা তোলার সময় খুব সতর্ক থাকবেন। ব্রাজিলের ডেভিড কার্ড জালিয়াতি ঘরে ঘরে। বিদেশীরা এয়ারপোর্ট এটিএম-এ টাকা তোলার সময় জানতেও পারবেন না, কার্ডটা যে তাদের অজান্তে কপি হচ্ছে। ৬. পাসপোর্ট নিয়ে রাস্তায় বের হবেন না। একমাত্র প্রেসপাস সংগ্রহ করার দিন পাসপোর্ট আনবেন। তারপর ওটা যেন ব্যাংকের লকারে থাকে। ৭. ক্রেডিট কার্ড সঙ্গে নিয়ে না ঘোরাই ভালো। ঠিক যত টাকা দরকার সেটা সঙ্গে রাখুন। সবচেয়ে ভালো হয় দুটি ওয়ালেট ব্যবহার করতে পারলে। দুটিতে টাকা যেন অল্প অল্প করে ভাগ করা থাকে। ৮. রাতে পারতপক্ষে একা বের হবেন না। বারে গেলেও বেশি মদ খাওয়ার দরকার নেই। কারণ আপনাকে যে সবসময় সাবধান থাকতে হবে। ৯. প্রধান সড়ক ধরে চলুন। ব্রাজিল এমন এক অদ্ভুত দেশ, যেখানে আকাশচুম্বী ঐশ্বর্য আর অতলস্পর্শী, দারিদ্র্য পাশাপশি হাঁটে। একটা দারুণ অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের পাশে লুকিয়ে থাকতে পারে সবচেয়ে সাংঘাতিক বস্তি। ভুল করে মোড় ঘুরলেই কিন্তু সমস্যা। ১০. ট্যাক্সি যদি নিতেই হয় নিজের হোটেল বা ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে নিন। এয়ারপোর্টেও তাই। ১১. মেট্রোরেল বা বাসে পকেটমার থেকে সাবধান। ১২. হোটেলরুমে কেউ ধাক্কা দিলেও উল্টো দিকে কে আছে ভালো করে না জেনে দরজা খুলবেন না। ১৩. কোনো বিচ বা পার্কে সন্ধার পর হাঁটাহাঁটি না করাই ভালো। ১৪. ট্যাক্সির পেছনে বসে ল্যাপটপ, আইফোন বা আইপ্যাডে কাজ করবেন না। কারণ মোটারবাইকে করে ছিনতাইকারীরা ঘোরে আর ট্রাফিক জ্যামের অপেক্ষায় থাকে। ১৫. প্রেসবক্সে নিজের জিনিসের ওপর সবসময় নজর রাখবেন। লাতিন আমেরিকায় স্টেডিয়ামের সংরক্ষিত এলাকা থেকে চুরি খুব চালু। প্রেস রিপোর্টার হিসেবে কোনো দুষ্কৃতকারী ঢুকেছে কিনাÑ কী করে বুঝবেন? তাই সাবধানের মার নেই। ১৬. ব্রাজিলে রিওর মতো শহরে সন্ধ্যা নামে খুব তাড়াতাড়ি, ৬টা বাজতে না বাজতেই। অন্ধকারে সতর্ক থাকুন। এতগুলো সতর্কবার্তার পর ব্রাজিলে বিশ্বকাপ উপভোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন ফুটবল দুনিয়ায় অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি মাইক কলেট। মাইক কলেট ই-মেইলের মাধ্যমে যে বার্তা পাঠিয়েছেন তাতে ব্রাজিলের সমাজ, অপরাধপ্রবণতা ও আইনশৃঙ্খল পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। অবশ্য ব্রাজিলের ইতিবাচক জিনিসগুলো এমন সতর্কবার্তায় না আসারই কথা। আর এই সতর্কবার্তায় এমন অনেক বিষয় উঠে এসেছে, যা নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাবান যে কোনো দেশের নাগরিকরাই চর্চা করতে পারেন।

ব্রাজিলের সমাজে অপরাধ প্রবণতার যে চিত্র উল্লেখ করা হয়েছে, তার মূলে রয়েছে অসম অর্থনীতির সঙ্কট। সেখানে ধনী-গরীবের ব্যবধান এতটাই প্রকট যে, একটা চমৎকার অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের পাশেই বিরাজ করছে সাংঘাতিক এক বস্তি। বৈষম্যমূলক এমন সমাজ ব্যবস্থায় শুধু মুখের বুলিতে অপরাধপ্রবণতা দূর হবার নয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হতে হলে যথা কর্তব্য পালন করতে হবে ব্রাজিল সরকারকে। এরপরই ব্রাজিলবাসী আশা করতে পারে, অপরাধমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ সুষম সমাজ। ব্রাজিলিয়ান সমাজের যে চিত্র আমরা লক্ষ্য করলাম, তার অনেক উপাদানই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশও এর থেকে আলাদা কিছু নয়। বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক বেষম্য প্রকট। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে অপরাধকর্মের মাত্রা বাড়ছে। গণতন্ত্রের বুলি আছে; কিন্তু চর্চার সঙ্কট ক্রমবর্ধমান। বাংলাদেশে সম্ভাবনাও কম নয়। কিন্তু সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নেতিবাচক প্রবণতা থেকে মুক্ত হতে হবে আমাদের নেতা-নেত্রীদের। বিশ্বকাপ ফুটবলের এই আনন্দঘন পরিবেশেও ব্রাজিলের রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কটগুলো সেখানকার জনগণ ভোলেনি। তাহলে দর্শক দেশ হিসেবে আমরা আমাদের সঙ্কটগুলো ভুলব কেমন করে? তাই বিশ্বকাপ ফুটবলে কে চ্যাম্পিয়ন হবে, সেই কৌতূহলের পাশাপাশি আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, দেশের সঙ্কট সমাধানে সরকার ও রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা কী ভূমিকা পালন করেন? কারণ সতর্ক জনতার দেশে ক্ষমতাবানরা বেশি দিন চাতুর্যের মাধ্যমে টিকে থাকতে পারে না।

You Might Also Like