ফটোর ফাটাল সংক্রমন!

আপনি সকাল-দুপুর-সাঁঝ-মধ্যরাতে রুটিন করে ফেসবুকে সাংঘাতিক ধরণের নান্দনিক ঢংয়ে কয়েকখান ফটো আপলোড করে আপনার সাজ বন্ধুসহ গোটা ভার্চুয়াল জগতে ছড়িয়ে দিয়ে বেশ উৎফুল্ল চিত্তে প্রফুল্লতা পরিস্ফুটিত করতে পারেন বটে কিন্তু ধর্মে ফটোর ফুটানী নিয়ে বেশ কড়াকাড়ি আছে। আপাতত ধর্ম বাদ দিলাম। কেননা ধর্মের কথা শুনলেই যাদের চুলকানী বাড়ে, চারিপাশে তেমন লোকের আনাগোনা বেড়েছে বহুগুন। আপনি আপনার নিজের ছবি ইচ্ছামত ভার্চুয়ালে প্রদর্শনী করার অধিকার রাখেন যদি তা মোটামুটি শালীনের পর্যায়েও পরে। প্রতিদিন ক’খানা নিজের ছবি আপনি ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢোকাবেন তা একান্তই আপনার ব্যাপার। আপনাকে অনুৎসাহিত করা কিংবা উসকে দেয়ার টেন্ডার নিয়ে কথা বলতে আসিনি। আজ কথা হবে অন্য ব্যাপারে ভিন্ন ঢংয়ে ।
…..
অন্যকারো অনুমতি ব্যতীত তার ছবি উঠানো এবং সে ছবি প্রকাশের রাষ্ট্রীয় আইনটা কি আপনার জানা আছে? ভাবছেন, সামান্য ছবি প্রকাশ করবেন তাতে আবার আইন কি! ইভটিংজিয়ের কথা নিশ্চয়ই আপনি শুনেছেন। এ অপরাধে কেউ অভিযুক্ত হলে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে তাকে বিচারের কাঠগোঁড়ায় দাঁড় করানো ছাড়াই কয়েক মাস জেল দিতে পারে। এই ইভটিজিংয়ের অন্যতম একটি সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোন বালিকার, মেয়ের, নারীর অনুমতি ছাড়া তার ছবি তুললে সেটাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রচার-প্রকাশ তো আরও দূরের কথা এবং যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কেউ যদি কারো ছবি প্রকাশ করে তাকে হেনস্তা করে তবে আক্রান্তব্যক্তি আইনের আশ্রয় নিলে সে প্রতিকার পাবে এবং অভিযুক্ত অপরাধী প্রমাণিত হলে সে অবশ্যই শাস্তিদন্ড পাবে। সে শাস্তি লঘুদন্ডে নয় বড় গুরুদন্ডে।
……
আপনি আপনার ছবি ফেসবুকে রাত ১৪টার সময় আপলোড করবেন তাতে কার কি! কিন্তু আপনি ইচ্ছা করলেই অন্যকারো অনুমতি ছাড়া তার ছবি প্রকাশ করতে পারেন না। যদিও সে ব্যক্তি আপনার জন্মদাত্রী মা, সহোদরা বোন, বিবাহিত স্ত্রী, জন্ম দেয়া কন্যাও হয়। ধর্ম এবং আইনের শাস্তির কথা বাদ দিলাম কিন্তু আপনি আপনার নৈতিক বোধের কাছে জিজ্ঞাসা করে দেখুন তো, অনুমতি ছাড়া আত্মীয়-অনাত্মীয় শ্রেণীর ছবি আপলোড করার অনুমিত কি বিবেক দেয়? তাছাড়া আপন বোনের ছবি আপলোড করে তা নিয়ে কি বিব্রতকর অবস্থায় তো কম মানুষকে পড়তে হয়নি? আপনি হয়ত এখানে মানুষের হীনমন্যতাকে দোষ দেবেন। কিন্তু এই সমাজে কি সুস্থতার বায়ু বইছে?
…..
অস্বীকার করার উপায় নাই, ছবি ক্যাপচার এবং তা প্রকাশের ক্ষেত্রে আমরা বেশ অসুস্থ মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছি। ভুলে গেলে চলবে না, আমরা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠজীব। জীববৃত্তি নয় বড় বুদ্ধিবৃত্তিই আমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করেছে। এতদসত্ত্বেও, আচরণে যদি মানবেতর প্রাণীর চেয়ে হীনমন্য হয়ে যাই তবে সেটা কি লজ্জার নয়? সকাল-বিকাল কি কারো ছবির কাঠামো পরিবর্তন হয়, সৌন্দর্য বাড়ে? ছবি দিলেও তো তার একটা ধারাবাহিকতা রাখা উচিত। মৃত ব্যক্তির পাশে, নামাজের সময়, কোরবানীর জবেহকৃত গরুর ওপর চড়ে, কবরের মধ্যে নেমে, ওয়াশরুমে বসে যারা ছবি তোলে এবং তা আপলোড দেয় তাদেরকে কি সুস্থ-স্বাভাবিক বলার উপায় আছে? ভাবুন, ভাবুন এবং বেশি করে ভাবনু। আমরা কিন্তু মানুষ, বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন জীব। নিজেদের অবস্থান যাতে ধরে রাখতে পারি তার জন্য সচেষ্ট হই। কেউ বস্ত্র খুলে দৌঁড়াচ্ছে বলে আমি/আমরাও তাকে অনুসরণ করে দৌঁড়াবো- এতোটা বোকার পরিচয় বোধহয় আমাদের দেয়া উচিত নয়। সমাজের কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্যতা হারিয়েছে বলে আপনি/আমিও তাকে অনুসরণ করবো? যদি এটা করি তবে পাগলে এবং আপনার/আমরা মধ্যে তফাৎ কোথায়?
রাজু আহমেদ, কলামিষ্ট।
fb.com/rajucolumnist/

You Might Also Like