নির্বাচনটা করবে কে?

মেয়াদের শেষে বা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যখনই নির্বাচন হোক না কেন, নির্বাচনটা করবে কে? সরকার বা রাজনৈতিক দল নির্বাচন পরিচালনা করে না। নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে বর্তমান যে কমিশন আছে, সেই কমিশনের মেয়াদ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাঁরা কোনোভাবেই নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার সুযোগ পাবেন না। এ কারণে নতুন নির্বাচনের পাশাপাশি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনেরও দাবি উঠেছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন স্বাধীন হলেও তাদের কাজ, কথা ও আচরণে তার প্রতিফলন নেই।
বাংলাদেশে কাজী রকিবউদ্দীন কমিশনসহ ১১টি নির্বাচন কমিশন হয়েছে; যাদের মধ্যে খুব কমই বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পেরেছে। এর জন্য কতটা কমিশনের পদাধিকারীরা আর কতটা ক্ষমতাসীনেরা দায়ী, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। অভিজ্ঞতা বলছে, আরও অনেক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মতো নির্বাচন কমিশনেও মেরুদণ্ড সোজা করা লোক নেহাতই কম। পদাধিকারীরা আর পাঁচটি চাকরির মতো সিইসি বা ইসির পদটিকে দেখছেন।
বাংলাদেশের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি মোহাম্মদ ইদ্রিস। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেমন তিয়াত্তরের নির্বাচন করেছেন, তেমনি জিয়াউর রহমানের গণভোটও হয়েছে তাঁর হাত দিয়ে। এরপর সিইসি হয়ে আসেন বিচারপতি এ কে এম নূরুল ইসলাম, যিনি পরে এরশাদের উপরাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন। বিচারপতি এম এ রউফের কমিশন ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির ও মোহাম্মদ আবু হেনার কমিশন ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের, এম এ সাঈদের কমিশন ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের এবং এ টি এম শামসুল হুদার কমিশন ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করেছে। কিন্তু কোনোবারই পরাজিত পক্ষ সেই ফলাফলকে হৃষ্টচিত্তে মেনে নেয়নি। কেউ বলেছেন, সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে। কেউ বলেছেন, স্থূল কারচুপি। এই চারটি নির্বাচনই হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের অধীনে। তার আগে ও পরের সব নির্বাচনই অধিক প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত।
তবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ওই চার পদাধিকারীর পরবর্তী ভূমিকা এক থাকেনি। বিচারপতি রউফ মাগুরা উপনির্বাচনে এসে মহা কেলেঙ্কারি করে বসলেন। কিন্তু আবু হেনা কাদের সিদ্দিকীর ছেড়ে দেওয়া আসনের উপনির্বাচনে কারচুপি মেনে নেননি। তিনি গেজেট প্রকাশ না করেই নির্বাচন কমিশন থেকে বিদায় নিয়েছেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন করার তিন মাসের মাথায় বিচারপতি এম এ সাদেককে পদত্যাগ করতে হয়েছে। আর বিএনপির অতি আস্থাভাজন এম এ আজিজ কমিশন তো নির্বাচনই করতে পারেনি। অন্যদিকে হুদা কমিশন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর প্রভাব খাটাতে এবং তাদের অনেকটা বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনতে সক্ষম হয়। তাদের তৈরি পরিচয়পত্রসহ ভোটার তালিকা আমাদের নির্বাচনী ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।
কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন নানা কারণে আলোচিত ও সমালোচিত। অতীতে তিনজন কমিশনার থাকলেও তাঁরা পাঁচজন নিয়ে কমিশন গঠন করেছিলেন। ফলে এটা আরও শক্তিশালী হওয়ার কথা। কিন্তু এখন সম্ভবত সবচেয়ে দুর্বল নির্বাচন কমিশনে পরিণত হয়েছে। ২০০৮ সালে বিএনপি ও তাদের জোট প্রথমে নির্বাচনে না আসার সিদ্ধান্ত নেয় এবং নানা শর্ত জুড়ে দেয়। হুদা কমিশন দফায় দফায় তাদের সঙ্গে আলোচনা করে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আনতে পেরেছিল (এ ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়াসও ছিল প্রশংসনীয়)। শেষতক সব দলের অংশগ্রহণেই ২০০৮ সালের নির্বাচন হয় এবং আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ২০১৪ সালেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে সচেষ্ট থাকলেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগই ছিল না। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের অন্যতম প্রধান শর্ত সব প্রতিদ্বন্দ্বীর জন্য মাঠ সমতল রাখা। সেখানে যদি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী সংশয় প্রকাশ করে, তাহলে কমিশনেরই দায়িত্ব সেই সংশয়ের অবসান ঘটানো। কিন্তু রকিবউদ্দীন কমিশন ‘কানে দিয়েছি তুলো চোখে পরেছি ঠুলো’ চরিত্রে অভিনয় করে দেশবাসীর ওপর ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন চাপিয়ে দিল। কোনো দলকে নির্বাচনে আনার দায়িত্ব কমিশনের না থাকলেও নির্বাচনের সুষ্ঠু ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করার দায় তারা এড়াতে পারে না।
সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশন নিয়োগের বিষয়ে বলা হয়েছে: ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলি-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ ধারা (৫)-এ বলা হয়, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হইতে পারেন, সেইরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত কোন নির্বাচন কমিশনার অপসারিত হইবেন না।’ ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাজী রকিবউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের ইসি নিয়োগ পায়। ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁরা শপথ নিলেও ইসিতে যোগ দেন ১২ ফেব্রুয়ারি। নিয়োগ অনুসারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক, মোহাম্মদ আবু হাফিজ ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলীর মেয়াদ শেষ হবে ২০১৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। আর নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজের মেয়াদ শেষ হবে ১৫ ফেব্রুয়ারি।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে সাড়ে ৬ হাজার নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন-২০১৩, নবম জাতীয় সংসদের শূন্য ঘোষিত সাতটি আসনের নির্বাচন, দশম জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন (৩০০ আসনে)। দশম জাতীয় সংসদের শূন্য ঘোষিত আসনের কয়েকটি এবং সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচন। স্থানীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো হলো—বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের সাধারণ নির্বাচন, উপজেলা পরিষদের সাধারণ নির্বাচন ৪৮১, পৌরসভার তিন ধাপের ২৫৩, উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচন, পৌরসভার উপনির্বাচন ৫৯, ইউনিয়ন পরিষদ সাধারণ নির্বাচন ৪৬ ও ইউনিয়ন পরিষদ উপনির্বাচন ৯৪৮টি। এ ছাড়া ছয় ধাপে ৪ হাজার ২৭৯ ইউনিয়নে নির্বাচন। বিচারপতি রউফ মাগুরা উপনির্বাচন করে বদনাম কামিয়েছিলেন। কাজী রকিবউদ্দীন ও তাঁর বাহিনী সারা দেশে সেই মাগুরাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। জিয়াউর রহমান রাজনীতিকে কঠিন করার কথা বলেছিলেন। রকিবউদ্দীন কমিশন নির্বাচনকে এমন কঠিন করেছেন যে ভবিষ্যতে যাঁদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন হোক না কেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক এবং ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করা কঠিনতর চ্যালেঞ্জ হবে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এই আদেশের ৫ ধারাবলে নির্বাচন কমিশন যেকোনো ব্যক্তি অথবা কর্তৃপক্ষকে তার যেরূপ দায়িত্ব পালন এবং যেরূপ সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন, সেরূপ দায়িত্ব বা সহায়তার নির্দেশ দিতে পারেন। নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত কোনো কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বাধা দান বা নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করার মতো কোনো কাজ করলে, নির্বাচন কমিশন যেকোনো সময় নির্বাচনের দায়িত্ব থেকে তাঁকে বা তাঁদের অব্যাহতি দিতে পারবে এবং প্রয়োজনে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিতে পারবে। কিন্তু সেই নির্দেশদাতাই যদি অন্য কারও নির্দেশের অপেক্ষায় থাকেন, তাহলে কীভাবে নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও অবাধ হবে?
বিএনপি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলেছে। প্রশ্ন হলো এই স্বাধীন ও শক্তিশালী কমিশনটা কীভাবে গঠিত হবে? রকিবউদ্দীন কমিশনের আগে রাষ্ট্রপতি দলীয় সরকার কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরামর্শে সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দিতেন। রকিবউদ্দীন কমিশনই গঠিত হয়েছিল সার্চ কমিটির মাধ্যমে। সার্চ কমিটির মাধ্যমে হোক আর সরকারের পরামর্শেই হোক রাষ্ট্রপতিকে এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মধ্য থেকেই একজন সিইসি ও চারজন ইসিকে নিয়োগ দিতে হবে। বাইরে থেকে কাউকে আনা যাবে না। তবে বাংলাদেশে নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তি নেই, সে কথাও বলা যাবে না। কথা হলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই যোগ্য লোকদের যোগ্য পদে বসাতে চান কি না? দ্বিতীয়ত, যোগ্য লোককে যোগ্য পদে বসানোর পর তাঁকে বা তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেবেন কি না। যদি স্বাধীনভাবে কমিশনকে কাজ করতে না দেওয়া হয়, তাহলে টি এন সেশনের মতো লোককে সিইসি পদে বসিয়েও লাভ হবে না।
আমরা যদি গণতন্ত্র চাই, নির্বাচন হতে হবে। আর যদি সেই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ করতে চাই, তাহলে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ভোট কারচুপি কিংবা হরতাল অবরোধ করে ভোট বানচাল করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে জনরায়ের ওপর ভরসা রাখতে হবে। ক্ষমতাসীনেরা বিরোধী দলের ‘অসাংবিধানিক আবদার’ না মানুন অন্তত ন্যায়সংগত দাবিগুলো তো মানবেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেটুকু করতে প্রস্তুত আছে কি?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

You Might Also Like