রাজনীতির সময় এবং অসময়ের সাতকাহন

ঘটনাটি ঘটেছিল সোভিয়েত রাশিয়ায়। জোসেফ স্টালিন মারা যাওয়ার পর নিকিতা ক্রুশ্চেভ নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় আরোহণ করলেন। তার ক্ষমতা লাভ নিয়ে রাশিয়ার লোকজন তথা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে কেউ কোনো প্রশ্ন করলেন নাÑ কেউ আশ্চর্যও হলেন না। বিশ্বের অপরাপর প্রান্তের লোকজন বিশেষ করে সোভিয়েত সমর্থিত পূর্ব ইউরোপের ওয়ারশ চুক্তিভুক্ত দেশগুলো এবং তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা ও ক্রুশ্চেভের ক্ষমতা লাভে অবাক হয়নিÑ কারণ তেমন হওয়ার কথা ছিল। স্ট্যালিন নিজ হাতে বহু কষ্ট করে ক্রুশ্চেভকে গড়ে তুলেছিলেন। অন্য দিকে, ক্রুশ্চেভও প্রাণপণ চেষ্টা তদবির করে স্টালিনের এক নম্বর পছন্দের মানুষে পরিণত হতে পেরেছিলেন। তারা উভয়ে জীবদ্দশায় একে অপরের পরিপূরক ও হরিহর আত্মা ছিলেন। ক্রুশ্চেভ স্টালিনকে পিতা বলে সম্বোধন করতেন এবং আড়ালে আবডালে দশমুখে প্রচার করতেন, সোভিয়েত-রাশিয়া নামে দেশটির প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা মূলত স্টালিনই। কাজেই রুশ জাতির পিতা হিসেবে ভøাদিমির লেলিনের পরিবর্তে তার ধর্মপিতা স্টালিনের নাম অভিসিক্ত হওয়া উচিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতি এবং সোভিয়েত রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নির্ঝঞ্ঝাট করার জন্য স্টালিনকে ব্যাপকভাবে গুপ্তহত্যা, মৃত্যুদণ্ড, প্রকাশ্য হত্যা, গুম ইত্যাদির আশ্রয় নিতে হয়। এক হিসেবে দেখা গেছে, স্টালিনের শাসনামলে তার হাতে প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রাণ হারায়। তার রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের পথে তিনি যাকে বাধা মনে করেছেন তাকেই তিনি নির্বিচারে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। এ অবস্থায় স্টালিনবিরোধীরা প্রকাশ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর পরিবর্তে অতিমাত্রায় স্টালিন সমর্থক হওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। স্টালিন যতটা কঠোরতা ও দুর্দমনীয় কৌশল নিয়ে তার বিরোধীদের নির্মূলের চেষ্টা করতে লাগলেন, তার চেয়েও বেশি কৌশল এবং মিষ্টিমধুর বাণী নিয়ে তার বিরোধী পক্ষ নিজেদের জোসেফ স্টালিনের রক্ত-মাংস, বিশ্বাস-ভালোবাসা এবং মন-মানসিকতার সাথে মিশিয়ে দিতে লাগলেন।
বিবিসি নির্মিত একটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে, মৃত্যুর কয়েক বছর আগে থেকেই স্টালিন এক জটিল শারীরিক ও মানসকি অবস্থার গ্যাঁড়াকলে পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি একসময় দেখলেনÑ তার একজনও বিরোধী নেই। অন্য দিকে, রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব বলতে তিনি কাউকে জীবিত অথচ তার নিকট রয়েছে এমন কাউকে দেখলেন না। তিনি সন্দেহ করার, রাগ করার, অভিমান করার এমনকি ক্রোধান্বিত হওয়ার সুযোগ না পেয়ে অদ্ভুত এক মানুষে রূপান্তরিত হলেন। প্রায় দুই কোটি লোককে নির্বিচারে হত্যা করার পরও তার জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী। লাখো মানুষের সমাবেশে তিনি উপস্থিত হলে লোকজন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নীরব হয়ে যেত। তিনি মুচকি হাসলে লোকজন উল্লাসে ফেটে পড়ত। আবার তার মুখে সামান্য বিরক্তির রেখা ফুটে ওঠামাত্র উল্লসিত জনতা মুহূর্তের মধ্যে নীরব হয়ে যেত। লক্ষ লোকের প্রকাশ্য জনসভায় এমনতরো কয়েকটি দৃশ্যও বিবিসির প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটিতে সংযুক্ত করা হয়েছে।
অতিরিক্ত প্রাপ্তি, সীমাহীন ও শর্তহীন আনুগত্যের জোয়ার, চতুর্মুখী প্রশংসা এবং একের পর এক সাফল্যের ফাঁদে পড়ে স্টালিনের স্বাভাবিক মানবিক সত্তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তিনি মানুষের স্বাভাকি হাসি-কান্না, ক্রোধ, কাম, ভালোবাসা, আবেগ-উচ্ছ্বাস ইত্যাদি হারিয়ে পরিপূর্ণভাবে নিঃসঙ্গ অথচ নির্মম একটি অদ্ভুত জৈবসত্তায় পরিণত হন। তিনি সব সময় একা থাকতেন। নিজ কামরার মধ্যে কখনোসখনো নিজেকে মাসের পর মাস বন্দী রাখতেন। ঠিকমতো খেতেন না, ঘুমাতেন নাÑ এমনকি কথাও বলতেন না। তার শোয়ার জন্য কোনো কামরা ছিল না, ঘুমানোর জন্য খাট ছিল না। অফিস রুমের এক কোণে ছোট্ট একটি সোফার ওপর শুয়ে তিনি দীর্ঘ দিন ঘুম ও বিশ্রামের কাজটি সেরেছেন। হাতেগোনা দু-একজন ছাড়া তার কামরায় কেউ প্রবেশ করতে পারতেন না। আর দু-একজনের মধ্যে অবশ্যই নিকিতা ক্রুশ্চেভ ছিলেন প্রধান ব্যক্তি।
স্টালিনের মৃত্যুর পর রাশিয়ার পার্লামেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে ক্রুশ্চেভকে স্টালিনের স্থলাভিষিক্ত করে বিপুল করতালির মাধ্যমে। নেতা নির্বাচিত হওয়ার পরপরই ক্রুশ্চেভ বক্তব্য দেয়ার জন্য উঠে দাঁড়ান এবং দীর্ঘ সময় ধরে অকথ্য ভাষায় স্টালিনকে গালাগাল দিয়ে তার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করেন। উপস্থিত পার্লামেন্ট সদস্যরা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যান। এরই মধ্যে এক সদস্য টিপ্পনি কেটে বলেন, এখন তো বেশ গালাগাল পাড়ছেনÑ তো সেদিন আপনি কই ছিলেন? টিপ্পনির শব্দ ক্রুশ্চেভের কানে যায়। তিনি কর্কশ স্বরে চিৎকার করে ওঠেনÑ এই কে বলল! কে বলল! সাহস থাকলে আবার বলোÑ অথবা উঠে দাঁড়াও! মুহূর্তের মধ্যে পুরো পার্লামেন্ট ভবনে সুমসাম নীরবতা নেমে এলো। সবাই নিশ্চুপ এবং সবাই মাথা নত করে রাখলেন। এবার ক্রুশ্চেভ মুচকি হেসে বললেনÑ প্রিয় ভদ্র মহোদয়। এবার আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন সেদিন আমি কই ছিলাম! আজ আপনি যেখানে আছেন আমিও সেদিন ঠিক আপনার জায়গাটিতে ছিলাম।
পরের ঘটনা তো সবারই জানা। পার্লামেন্টের বক্তব্য শেষ করে ক্রুশ্চেভ তার জন্য নির্ধারিত অফিসে গিয়ে সেই চেয়ারে বসলেন, যেখানে এতকাল তার ধর্মপিতা বসতেন। চেয়ারে বসে তিনি জীবনের প্রথম এবং ইতিহাসের ভয়াবহতম সিদ্ধান্তটি ডিক্রি আকারে জারি করলেন। ক্রুশ্চেভের সেই ডিক্রিবলে লেলিন টম্বে সমাধিস্থ স্টালিনের লাশটি বের করে আনা হলোÑ এবং ভলগা নদীতে ছুড়ে ফেলা হলো। শুধু সোভিয়েত রাশিয়া নয়Ñ মানবজাতির ইতিহাসের এমনতরো হাজার হাজার কাহিনী রয়েছে যেখানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সাথে সাথে ইতিহাসের চাকা উল্টোপথে ঘুরতে শুরু করেছিল। সমসাময়িক বিশ্বের সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফি, রেজাশাহ পাহলভি, মিসরের বাদশাহ কারুন, রোমানিয়ার চসেস্কু, ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো, মিসরের হোসনি মোবারক প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যেতে পারেÑ যারা তাদের ক্ষমতাকালীন জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন এবং ক্ষমতা হারানোর পর তারা হয়েছিলেন পচা দুর্গন্ধময় জীবন্ত লাশ!
মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতা, পদ, পদবি এবং সুসময় অনেকটা যেন বায়ুভর্তি বেলুনের মতো। মানুষ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন সে বেলুনের মতো শূন্যে ভাসতে থাকে। কিন্তু কোনো কারণে যদি বেলুনটি ফুটো হয়ে যায় তবে ফাটা বেলুনের ছিন্নবিচ্ছিন্ন টুকরো যেমন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, তেমনি ফুটো করা ফাটা বেলুনে পুনরায় বাতাস ভরে সেটিকে আগের মতো স্ফীত করে শূন্যে ভাসানো একেবারে অসম্ভব। রঙিন বেলুনের শূন্যে ভেসে বেড়ানো এবং রাজনীতির মাঠের চাটুকারিতার স্তূতিবাক্য শুনে নিজের ভারসাম্য হারানো ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতার কল্পনার রাজ্যে ভেসে বেড়ানোর মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। রঙিন বেলুনের নিয়ন্ত্রণের সুতোটি কখনোসখনো কোনো অবোধ বালক বা বালিকার হাতে থাকে, যারা ইচ্ছে করলে বেলুনটিকে নিচে নামিয়ে আনতে পারে। কিন্তু রাজনীতিবিদেরা যদি একবার কল্পনার রাজ্যে উড়তে আরম্ভ করেন, তবে তাদের নামিয়ে আনার মতো সুতোটি ধারণ করার মতো কাউকে তারা আশপাশে রাখেন না।
প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে সুসময় বা দুঃসময় আসে। প্রকৃতির চিরায়ত নিয়মে সময় কখনো একই রূপে প্রবহমান থাকে না। সময় বিবর্তিত হয় এবং সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পারিপার্শ্বিক সব কিছু আবর্তিত হতে থাকে। মানুষদের মধ্যে তারাই সবচেয়ে দুর্ভাগা যারা সময়কে নিজের জন্য চিরস্থায়ী নিয়তি হিসেবে মেনে নেয় অথবা গ্রহণ করে। অর্থাৎ দুঃসময়ের আবর্তে ঘুরপাক খাওয়া মানুষগুলো যদি মনে করে যে দুর্ভাগ্যই তাদের নিয়তি এবং দুঃসময়কে চিরস্থায়ী রূপে বরণ করার জন্য যারা নিজেদের মানিয়ে নেয়, সে ক্ষেত্রে তারা মূলত দ্বিগুণ অপরাধের আসামি হিসেবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় নিজেদের দাঁড় করায়। অন্য দিকে, যারা সুসময়কে চিরস্থায়ী এবং নিজেদের একান্ত পাওনা হিসেবে বিবেচনা করে তারাও সময়ের বিবর্তনে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং মানবসভ্যতার কিংবদন্তির রাষ্ট্রচিন্তকেরা একবাক্যে জুলুম, অন্যায়, অত্যাচার ও অনাসৃষ্টির জন্য যতটা না রাজনীতিবিদদের দায়ী করেছেন, তার চেয়েও বেশি দায়ী করেছেন রাজনীতির আওতাভুক্ত জনগোষ্ঠীকে। স্পষ্ট করে বলতে গেলে তারা অন্যায়কারীর চেয়ে অন্যায় সহ্যকারীকে বেশি দায়ী করেছেন। তাদের মতে, অন্যায়কারী তার কৃত ভুলভ্রান্তি, অন্যায় অত্যাচার ও অবিচারের দায় পরাজিত হওয়ার পর কেবল নিজের জীবন দিয়ে শোধ করেন। অন্য দিকে, অন্যায় সহ্যকারীকে বংশপরম্পরায় যুগ যুগ ধরে তার ওপর কৃত অন্যায়ের বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়। আজকের ইরাক, লিবিয়া, মিসর, ইয়েমেন ও সিরিয়ার দিকে তাকালেই অন্যায়কারী এবং অন্যায় মেনে নেয়া জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ, দুর্দশার মাত্রা, দীর্ঘস্থায়িত্ব ইত্যাদি কারা কত গুণ ভোগ করছেন তা স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইতিহাসের দায় সব সময় বোবা জনগণকেই বহন করতে হয়। মানুষ কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে অথবা অন্যায় অবিচার মেনে নিয়ে মূলত প্রকৃতির আইনকে ভঙ্গ করে। প্রকৃতি মানুষের বোবা স্বভাব এবং নীরবতা একদম সহ্য করতে পারে না। কেবল প্রতিবাদ না করার কারণে পৃথিবীর বহু জাতি যেমন ধ্বংস হয়েছে, তেমনি অন্যায় অত্যাচারের আধিক্যের কারণে পৃথিবীর অনেক নামকরা জাতিও বিলীন হয়ে গেছে। হিসাব করলে দেখা যাবে, অন্যায় ও জুলুম মেনে নেয়া ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা অন্যায়কারী জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক গুণ বেশি। ইতিহাসের আরো তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো পরাভব মেনে না নেয়া জাতিগোষ্ঠীগুলোই মহাকালের সাক্ষী রূপে হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মোঙ্গল, হুন, রোমান, গ্রিক, ভাইকিং, বার্বার প্রভৃতি প্রবল যোদ্ধা জাতি-গোষ্ঠীর অস্তিত্ব যেমন আজ নেইÑ তেমনি এদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো পারস্য জাতি, চীন জাতি এবং আফগান জাতির লোকেরা আজো পৃথিবীর বুকে স্বগর্বে বেঁচে আছেন বিপুল বৈভবে।

You Might Also Like