মুসলিম বিশ্বের প্রধান ইস্যু

shah-a-hannanমুসলিম বিশ্বের জন্য অন্যতম প্রধান ইস্যু হলো শিক্ষা। এ বিষয়টিকে আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।Islamization of Knowledge-এর লেখক ড. ইসমাইল রাজি আল ফারুকির দৃষ্টিতে উম্মাহর জন্য শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।আমাদের একটি উত্তম শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড় করাতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমেরিকা ও পশ্চিমাদের চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক যেটিই হোক- এর মোকাবেলায় দাঁড়ানোর জন্য আমাদের একটি ভালো শিক্ষাব্যবস্থা দরকার। সভ্যতার দ্বন্দ্বে ইসলাম জয়ী হবে, নামে হোক বা বেনামে হোক, যদি আমাদের একটি ভালো শিক্ষাব্যবস্থা এবং ভালো শিক্ষিত জনশক্তি (পুরুষ ও নারী উভয়ই) থাকে। কিংবা যদি আমরা তা গড়তে পারি, তবেই তা সম্ভব হবে বলে মনে করা যায়।
এখানে শিক্ষার কয়েকটি জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই। একটি হলো, এর সংজ্ঞাগত বিষয়। ইসলামি শিক্ষার ক্ষেত্রে কতগুলো সংজ্ঞাগত বিষয় রয়েছে। ইসলামি শিক্ষা কী? এটি কি শুধুই কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকাহর জ্ঞান? নাকি এটি সব প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের ইসলামি মূল্যবোধ, জ্ঞানের ইসলামীকরণ আন্দোলনের সমন্বয়? মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি বিষয় বেরিয়ে এসেছে, সেটি হলো- সব শিক্ষাই ইসলামি মূল্যবোধকে ধারণ করবে, ইসলামি শিক্ষার আওতার মধ্যে হবে, মূল্যবোধভিত্তিক হবে অথবা এর আওতাবহির্ভূত হবে না। তারা এটি মেনে নিয়েছেন যে শুধু কুরআন পড়া, হাদিস পড়া, শুধু ফিকাহ পড়া, আরবি পড়া ইসলামি শিক্ষা নয়। যদি আমাদের ছেলেরা কম্পিউটার সায়েন্স, ফিজিক্স ও অন্যান্য সায়েন্স পড়ে এবং তাতে যদি গ্রহণীয় বিষয়ও ইসলামি শিক্ষায় সংযোজিত করা হয় অথবা অন্য কোনোভাবে রাখা হয়, তাও ইসলামি শিক্ষার আওতার মধ্যে আসবে। কাজেই বলা যায়, যেকোনোভাবেই হোক বর্তমানে সংজ্ঞাগত সমস্যাটি নেই। কিন্তু হতে পারে, যারা দুনিয়া সম্পর্কে জানেন না তারা হয়তো বিতর্ক করতে পারেন। কিন্তু আমরা মনে করি, এলিটদের মধ্যে এ সমস্যাটি নেই এবং আল্লাহ তায়ালা চাইলে সেভাবেই বিষয়টি এগিয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
এখন আমাদের স্কুল সিস্টেম সম্পর্কে বলছি। স্কুলের ওপর অনেক কাজ হয়েছে। বিশেষভাবে পাকিস্তান, ইরান ও সুদানে। সৌদি আরবে স্কুল সিস্টেমে ইসলাম ও আধুনিক শিক্ষার দারুণ সমন্বয় ঘটেছে। সুতরাং বলা যায়, আজ আমাদের স্কুলশিক্ষার যথেষ্ট কারিকুলাম আছে, যা আমরা বাংলাদেশের জন্য চিন্তা করতে পারি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আজ আমরা যেখানে এসেছি, তার ফলে এখানে ইসলামি শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় গড়ে ওঠা সম্ভব। বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্ব মালয়েশিয়া বা ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ভিত্তিতে শিক্ষা প্রোগ্রাম সাজানো উচিত। প্রয়োজন মনে করলে এ মডেলকে একটু রিফাইন্ড করে, প্লাস-মাইনাস করে আমরা সেটি নিতে পারি। এটি মুসলিম বিশ্বে উচ্চশিক্ষার ইসলামীকরণে মডেল হতে পারে। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন, অমুসলিমদের জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প খোলা রাখতে হবে। এটি আমাদের মনে রাখতে হবে এবং যদি কেউ নাও করে থাকে, তবুও আমাদের তা করতে হবে। ইসলামের ‘লা ইকরাহা ফিদদ্বীন’, অর্থাৎ ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই এবং ‘জাস্টিস’-এর যে স্পিরিট তা সামনে রাখতে হবে। ‘লা ইকরাহা ফিদদ্বীন’ ও ‘জাস্টিস’-এর মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। একে সামনে রেখে অমুসলিমদের জন্য প্রচুর অপশন (যেখানে যা প্রয়োজন) দেয়া উচিত। এখানে কোনো আন্দোলন সৃষ্টি করা, কারো দাবির সুযোগ সৃষ্টি করা অথবা পত্রিকায় ওঠার পরেই ব্যবস্থা নেয়ার দরকার যেন না হয়। এটি ইসলামের ন্যায়নীতি বা জাস্টিসের দাবি এবং এটিই আমাদের জন্য কল্যাণকর।
এখানে মাদরাসা স্ট্রিম সম্পর্কে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। মাদরাসা স্ট্রিম সম্পর্কে ব্যাপকভাবে চিন্তা করেছি। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি মাদরাসাকে শুধু আলেম তৈরি করার জন্যই চাচ্ছি? তার উদ্দেশ্য কী? নাকি শিক্ষার একটি মূলধারা করতে চাচ্ছি? প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি শুধু আলেম তৈরি করাই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে তো এত মাদরাসার দরকারই নেই। এত কওমি কিংবা এত আলিয়া মাদরাসার তাহলে প্রয়োজন কী? যদি আমরা চাই মাদরাসা শিক্ষার ধারা অন্যতম মূলধারা হবে, তাহলে রেডিক্যাল পরিবর্তন করতে হবে। এই পরিবর্তনটি কী? আমাদের দেশে কামিল মাদরাসায় চারটি কোর্স আছে- আদব, তাফসির, ফিকাহ ও হাদিস। সংক্ষেপে বলব, আরো কয়েকটি কামিল কোর্স তাতে যোগ করতে হবে। কামিল ইকোনমিকস, কামিল পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং অন্য কয়েকটি প্রয়োজনীয় বিষয়ে কামিল কোর্স খুলতে হবে। চারটির জায়গায় ছয়টি, আটটি বা দশটি করতে হবে। তাতে বর্তমান কোর্সটি আলিম, ফাজিল পর্যন্ত মোটামুটি এক থাকতে পারে। তারা বর্তমানে কী করেন? এক পর্যায় পর্যন্ত এ রকম পড়েন, তারপর আলাদা হয়ে যান।
তেমনি ফাজিল পর্যন্ত ঠিক রেখে আমাদের আরো চারটি বা ছয়টি কোর্স যোগ করতে হবে। সেই সাথে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। কওমি মাদরাসার ক্ষেত্রেও একই কথা। যদি মসজিদ আর মাদরাসার জন্যই শুধু আলেম তৈরি করা মাদরাসার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তো হাজার হাজার কওমি মাদরাসার দরকার নেই। কিন্তু তাদের যদি উদ্দেশ্য থাকে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি তৈরি করা, তাহলে তাদেরকেও নতুন নতুন বিভাগ খুলতে হবে। এখন কেবল দাওরায়ে হাদিস আছে। তাদের শেষের চার বছর পরিবর্তন করতে হবে। এখানে দাওরায়ে একতেসাদের (অর্থনীতি) মতো আরো তিন-চারটি ‘দাওরা’ বাড়াতে হবে যাতে তারা জাতি, সমাজ, অর্থনীতি ও প্রশাসনের জন্য আরো বেশি উপযোগী হতে পারেন। তাহলেই তারা সমাজ, অর্থনীতি ও প্রশাসনের জন্য যোগ্য লোক তৈরি করতে পারবেন। এ ধরনের সংস্কার করলেই কওমি মাদরাসা ও আলিয়া মাদরাসা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দু’টি মূল শাখা হিসেবে টিকে থাকবে এবং জাতির জন্য অবদান রাখতে পারবে।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সহশিক্ষা নিয়ে আলোচনা করছি। সহশিক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমানে দু’টি পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় ড্রেসকোডসহ (হিজাবসমেত) একত্রে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে এবং ইসলামাবাদে ক্যাম্পাস আলাদা করে দেয়া হয়েছে। ইসলামি শিক্ষাবিদরা দু’টিকেই বৈধ গণ্য করেছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সহশিক্ষা খুব সুবিধাজনক মনে করতে পারি না। আমাদের বর্তমান সমাজ পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ার তুলনায় অধিক সেকুলার। এখানে আলাদা ক্যাম্পাস করাই সঙ্গত। তবে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইসলামি শিক্ষাবিদরা যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সে কথা আলাদা। কিন্তু অবশ্যই ছেলেমেয়েদের জন্য আলাদা ক্যাম্পাসই লক্ষ্য হওয়া উচিত। হাইস্কুল ও কলেজ পর্যায়ে সহশিক্ষা একেবারেই থাকা উচিত নয়। এর ফলাফল খুব খারাপ হয়ে থাকে।
এখন অন্য ইস্যু, যেমন আধুনিকীকরণের দিকে নজর দিই। Islamic Awakening Between Rejection and Extremism নামে ড. কারজাভির একটি বই আছে। এতে তিনি চরমপন্থার (Extremism) কুফল, বিপদের আশঙ্কা এবং এর কারণগুলো তুলে ধরেছেন। এ বইয়ের বাংলা অনুবাদ বেরিয়েছে ‘ইসলামী পুনর্জাগরণ সমস্যা ও সম্ভাবনা’ নামে। কারজাভির মতো মুসলিম বিশ্বের প্রধান চিন্তাবিদেরা মনে করেন, মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন রকম চরমপন্থা বা উগ্রতা রয়েছে। এদের স্বভাব সম্পর্কে তিনি বলেছেন, এরা একে অন্যকে সব সময় অভিযুক্ত (Accuse) করে। নিজের মতের বাইরে শুনতে চায় না। ইসলামের স্বভাব মধ্যপন্থা; চরমপন্থা নয়। চরমপন্থার ক্ষতি আমরা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি। এটি দূর করা খুবই জরুরি। সন্ত্রাসকে অবশ্যই নির্মূল করতে হবে।
যেখানে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, সেখানে সময় কোথায় যে আমরা গুরুত্বহীন (Marginal) বিষয় নিয়ে সময় নষ্ট করব? যেখানে মুসলিম বিশ্বে দারিদ্র্যের সমস্যা, শিক্ষার সমস্যা, সেখানে আমাদের কার দাড়ি কত বড়, সেটি কোনো বিষয় হতে পারে না। কিছু লোক আমাদের প্রধান বিষয়গুলোর পরিবর্তে গৌণ বিষয়গুলোকেই বেশি করে তুলে ধরতে থাকে। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে যে, একটি বিল্ডিংয়ের কাঠামো দাঁড় করানোর পর সেটির বিন্যাস বিভিন্ন রকম হতে পারে। তবে আগে বিল্ডিংয়ের কাঠামো দাঁড় করাতে হবেই। তেমনিভাবে যেখানে ইসলাম এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেখানে ইসলামের মূল কাজ করার পরই অন্য বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে, যদি তা জরুরি মনে হয়। আর ততটুকু করা যেতে পারে, যতটুকু ইসলাম জরুরি মনে করেছে। কিন্তু এখানে বাস্তবে ইসলামের মূল স্পিরিটই নেই। সেটি উপড়ে ফেলা হয়েছে। তাহলে এ অবস্থা কি সেসব মার্জিনাল বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকার সময়? এ প্রসঙ্গে অন্য কিছু বলার চেয়ে বিষয়টি উপলব্ধির জন্য আমাদের ড. কারজাভির Islamic Awakening Between Rejection and Extremismবইটি পড়া উচিত।
ইসলামের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো, বিভিন্ন রকম চরমপন্থা (Various type of extremism), যা ইসলামকে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যারা চরমপন্থী তাদের অবস্থান কারো হয় এ পাশে, নয় ওই পাশে, যেকোনো এক প্রান্তে। ফলে তারা কখনো সমন্বয় করতে জানে না। সমন্বয় করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সমন্বয় করা তখনই সম্ভব যখন মানুষ মডারেট হয়, মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। যখন তারা একে অন্যের সাথে কথা বলে, আলাপ করে, একজন আরেকজনের কথা শোনে- তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েই কাজ করে। কিন্তু কট্টরপন্থা হলো উম্মাহর মধ্যে এমন অবস্থান সৃষ্টি করা, যাতে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে না পারে।
এরপর ইসলামের যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি তা হলো জেন্ডার ইস্যু। এটি ইসলামে নারী-পুরুষের স্থান এবং পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়। মেয়েদেরকে পেছনে রেখে ইসলাম কিংবা উম্মাহ অগ্রসর হবে, তা দিবাস্বপ্ন দেখা। ড. সাঈদ রামাদান, যাকে ‘লিটল হাসান আল বান্না’ বলা হতো- তিনি উম্মাহর তিনটি সমস্যার কথা বলেছিলেন। একটি হলো শরিয়াহ ও ফিকাহর মধ্যে পার্থক্য করতে না পারা। কুরআন-সুন্নাহর বাধ্যতামূলক প্রকৃতির (Binding Nature) সাথে ফিকাহ বাধ্যতামূলক নয়, এমন প্রকৃতির পার্থক্য করতে না পারা এবং দু’টিকে এক করে ফেলা। দ্বিতীয় সমস্যা হলো মুসলিম নারীদের দুর্দশা। এ কথাগুলো তিনি বলেছিলেন ১৯৬৫ সালের দিকে। অর্থাৎ, আজ থেকে অনেক আগেই তিনি এটি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এটি বর্তমানে যেমন ড. ইউসুফ আল কারজাভির উপলব্ধি, তেমনি মুহাম্মদ আল গাজ্জালির মতো বিখ্যাত আলেমরাও একই কথা বলে গেছেন। আল গাজ্জালি মিসরের লোক, যিনি দুই বছর আগে মারা গেছেন। তৃতীয় সমস্যা হলো, শাসকদের আনুগত্য সম্পর্কে ভুল ধারণা (Wrong notions of obedience to rulers)। নারীদেরকে তার যথাযোগ্য স্থান দিতে হবে। তাদেরকে সমাজ ও ইসলামের কাজে পুরোপুরি সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদেরকে মানবিক মর্যাদায় সমান মানুষই মনে করতে হবে। তাদের সব অধিকারই দিতে হবে। ‘দ্রষ্টব্য : ১. ইসলামের সামাজিক বিধান, ড. জামাল আল বাদাবি, ২. রাসূলের যুগে নারী স্বাধীনতা, আল্লামা আবদুল হালিম আবু শুক্কাহ এবং ৩. দি স্ট্যাটাস অব মুসলিম উইমেন, ড. ইউসুফ আল কারজাভি)।
এরপর যে সমস্যা উল্লেখযোগ্য মনে করি, তা হলো গণতন্ত্রের অভাব। স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্র মুসলিম বিশ্বে রয়েছে। এটি পাশ্চাত্যের কাছে মুসলমানদের খারাপ ইমেজই তুলে ধরে। তাদের কাছে মনে হয়, মুসলমানদের স্বভাবই হলো এমন। দোষটা আমাদের আর তারা ভাবছেন, ইসলামই এমন। এর খারাপ প্রভাবটিই মুসলমানদের ওপর পড়ে। কিন্তু এর সমাধান কী? এ সম্পর্কে এক লেখায় বলেছিলাম, ইসলামি আইনের আওতায় ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি বহু আগেই স্বীকৃত হয়ে গেছে। ১৯৪৮ সালে যখন পাকিস্তানের সংবিধান তৈরির কাজ শুরু হয়, সেখানে Democracy, freedom, equality, social justice as enunciated by Islam shall be fully observed বলে একটি ধারাই আলেমদের পরামর্শে যোগ করা হয়। আমি লক্ষ করেছি, মাওলানা মওদূদী ‘ডেমোক্র্যাসি’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। সেখানে তিনি ঞযবড় উবসড়পৎধপু শব্দ ব্যবহার করলেও ডেমোক্র্যাসি শব্দটি পরিহার করেননি। আল্লামা ইকবালও গণতন্ত্রের চেয়ে ভালো বিকল্প নেই বলেছেন। ড. ইউসুফ আল কারজাভি Islamic Movement, Political Freedom and Democracy লেখায় বলেছেন যে, গণতন্ত্রই ইসলামের নিকটতম পন্থা। যারা সন্দেহ করে ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস’, এ ধারণার কী হবে? এ সন্দেহের উত্তরে তিনি বলেছেন- আপনারা যদি এতই ভয় পান, তাহলে সংবিধানের একটি ধারায় লিখে দিন, কুরআন ও সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস করা যাবে না, তাহলেই সমস্যার সমাধান হবে।
কাজেই গণতন্ত্র সম্পর্কে যারা বেশি ভয় পান, তারা যদি গণতন্ত্র না বলতে চান, তাহলে ‘ইসলামি গণতন্ত্র’ শব্দ ব্যবহার করতে পারেন। অনেকে ‘খেলাফত’ শব্দ ব্যবহার করতে চান। কিন্তু প্রতিটি ইসলামি রাষ্ট্রকে আলাদা আলাদা খেলাফত বলবেন কি না। তারপর সুস্পষ্ট করতে হবে, খেলাফতের
বিস্তৃত রূপ কী? পার্লামেন্ট থাকবে কি না। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করা হবে কি না। মৌলিক অধিকার কী কী থাকবে? এসব ধারণা সুস্পষ্ট না করে ‘খেলাফত’ কায়েমের দাবি করায় জটিলতা সৃষ্টি হবে। যত দিন তা না করা হবে তত দিন পর্যন্ত ইসলামি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা ইসলামি রাষ্ট্র এবং গণতন্ত্র পরিভাষা ব্যবহারের পক্ষে।
আমাদের সমস্যার আরেকটি দিক হলো, কুরআন ও সুন্নাহর ভুল ব্যাখ্যা। এমন এক সময় ছিল যখন কুরআন ও হাদিসের পর্যাপ্ত অনুবাদ ছিল না। এখন অনেক অনুবাদ হওয়ায় সমস্যা হয়েছে, প্রত্যেকে হাদিস পড়ে তার একটি ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করেন, কিন্তু তারা জানেন না হাদিস কত ধরনের। তারা জানেন না যে, হাদিসের মধ্যে যদি সঙ্ঘাত দেখা দেয়, তাহলে তা কিভাবে দূর করতে হবে। আবার কুরআনের সাথে হাদিসের যদি বিরোধ দেখা দেয়, তাহলে তা কিভাবে দূর করতে হবে? এর ব্যাখ্যা পদ্ধতি না জেনেই তা করতে থাকেন। কিভাবে ‘তারুদ’ (বিরোধ) দূর করতে হবে? হুকুমের মূল্য কী? সব হুকুমই কি ফরজ, না মুস্তাহাব মাত্র? ‘আমল’ হলেই কি ফরজ হয়ে যায়? এখন যারা শব্দের বিভিন্ন শ্রেণী (যেমন- আম, খাস, হাকিকি, মাজাজি ইত্যাদি) সম্পর্কে জানবেন না, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পদ্ধতি জানবেন না, উসুল আল ফিকাহ পড়বেন না- তারা যদি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন তাহলে তা ভুল হবে। এ জন্য উসুলের জ্ঞান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
উম্মাহর মধ্যে সমস্যা বেড়েছে। ধর্মীয় খুঁটিনাটি বিষয়ে মতবিরোধ বেড়েছে। এ জন্য প্রয়োজন বিপুলসংখ্যক বড় আলেমের। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, আমরা যারা ইসলামের মূল বিষয় জানি না, তারা এক ধরনের মূর্খ। এ মূর্খতা থেকে যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়, সেটি ইসলামের জন্য বিপজ্জনক। এ অবস্থা থেকে বাঁচার উপায় হলো, উসুল আল ফিকাহর জ্ঞান এবং নির্ভরযোগ্য ইসলামি সাহিত্য প্রচার। আর সাথে আধুনিক সমস্যা ও সভ্যতা সম্পর্কে জানেন এমন গ্রেট আলেম তৈরি করা, যারা লোকদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারবেন। উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে যে, ড. কারজাভির মতো কিছু গ্রেট আলেম থাকার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সবাই একটি মতে এসে পৌঁছেছেন। বাংলাদেশ ও অন্যান্য মুসলিম দেশে আধুনিক সমস্যা ও সভ্যতা সম্পর্কে অবহিত অত্যন্ত উচ্চমানের আলেমের উদ্ভব হতে হবে। সেটিই মুসলিম বিশ্বের জন্য কল্যাণকর।
আশা করি, মুসলিম বিশ্বের এসব প্রধান সমস্যা সমাধানে আমরা সবাই উদ্যোগী হবো।
শাহ্ আব্দুল হান্নান : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

You Might Also Like