জন কেরির ঢাকা সফর এবং হাসিনা-নেতৃত্বের প্রভাব ও প্রতিষ্ঠা

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের পর একদল সমালোচক বলতে শুরু করেছিল, এ দেশটির না আছে কোনো খনিজ সম্পদ, না আছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান। এ দেশটির কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ‘ভায়াবিলিটি’ নেই। বঙ্গবন্ধু এই প্রচারণার জবাবে বলেছিলেন, ‘আমাদের খনিজ সম্পদ (তখনো তেল-গ্যাস আবিষ্কৃত হয়নি) না থাকতে পারে, কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, যাকে শিল্প-উপাদানে রূপান্তরিত করে আমরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে অবশ্যই পারি। নেদারল্যান্ডস যদি দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য বিক্রি করে উন্নত হতে পারে, আমরা পাট, চা, তুলা থাকতে ভয় পাচ্ছি কেন?’

বঙ্গবন্ধু আরো বলেছিলেন, ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশ কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নির্ভর করে এই অঞ্চলের রাজনীতিতে আমাদের গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক অবস্থান কতটা শক্তিশালী তার ওপর। একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ একটা ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এ ইতিহাসকে রক্ষা করা ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমাদের ওপর দায়িত্ব পড়েছে। আমি যদি এ ইতিহাসকে রক্ষা করতে ও এগিয়ে নিয়ে যেতে না পারি, তাহলে দীর্ঘকালের জন্য বিস্মৃতিতে তলিয়ে যাব। (ও রিষষ মড় ঃড় ড়নষরারড়হ ভড়ৎ ধ ষড়হম ঃরসব) এই শেষের কথাটা বঙ্গবন্ধু ইংরেজিতে বলেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাঁর সৃষ্ট ইতিহাস ধ্বংস করা এবং তাঁকে বিস্মৃতির অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার বহু চেষ্টা হয়েছে। এখনো হচ্ছে। এটা সম্ভব হয়নি প্রধানত দুটি কারণে। এক. বঙ্গবন্ধু অতি অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটা শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা শুরু করেছিলেন। তাঁকে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে শূন্যতা দেখা দিলে মনে হয়েছিল এশীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশ গুরুত্ব হারিয়েছে এবং এই গুরুত্ব হারানোর ফলে অচিরেই তার সার্বভৌমত্বে আঘাত পড়বে। দেশটির চারদিক ঘিরে রয়েছে ভারত এবং দেড় হাজার মাইল দূরে বসে পাকিস্তান বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র আঁটছে। বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর গড়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির শক্ত অবস্থানের কারণেই রক্ষা পেয়েছে।
দুই. বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মাত্র ছয় বছরের মধ্যে তাঁর সৃষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার এগিয়ে আসা এবং সাফল্য লাভ। বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতাকে হত্যার পর ছত্রভঙ্গ আওয়ামী লীগের অবস্থা দেখে অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন, এটি এখন একটি নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য (unelectable) পার্টি। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বারবারই বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ আগামী ৫০ বছরেও ক্ষমতায় আসতে পারবে না।’ সেই আওয়ামী লীগ ৫০ বছর নয়, ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন।
তখন আবার নতুন রব তোলা হয়েছিল। শেখ হাসিনার মতো অনভিজ্ঞ অল্প বয়সী গৃহবধূ আর কত দিন ক্ষমতায় থাকতে পারবেন? ড. কামাল হোসেন, তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাকের মতো পুরনো অভিজ্ঞ নেতারা শিগগিরই দলের নেতৃত্ব এবং সরকারের প্রধানমন্ত্রিত্ব দুই-ই তাঁর হাত থেকে কেড়ে নেবেন। সে চেষ্টা যে হয়নি, তা নয়। অন্তত ড. কামাল হোসেন সে চেষ্টা করেছিলেন। হালে পানি পায়নি। নতুন দল গড়েছেন। তোফায়েল-রাজ্জাকরা কেউ তাঁর সঙ্গে যাননি।
শেখ হাসিনা এখনো দেশের প্রধানমন্ত্রী। এ নিয়ে তৃতীয় দফা তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে আছেন। দেশের রাজনীতির যে বহমান অবস্থা, তাতে চতুর্থ দফায় নির্বাচনে জিতে তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকলে বিস্ময়ের কিছু নেই। শত ঝড়ঝঞ্ঝা, বাধা ও চক্রান্তের মুখে তাঁর সরকার স্থিতিশীলতা লাভ করেছে। অভাবিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকা এগিয়ে চলছে। সন্ত্রাস দমন চলছে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি দৃঢ় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারসাম্য রক্ষায় হাসিনা সরকার অভূর্তপূর্ব কৃতিত্ব দেখিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের গুরুত্ব এখন প্রশ্নাতীত। বহির্বিশ্বেও হাসিনা-নেতৃত্ব স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত।
তার বড় প্রমাণ ব্রিটেনের বৈদেশিক উন্নয়নসংক্রান্ত প্রতিমন্ত্রী গত রবিবার ঢাকায় এসেছেন। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি সোমবার ঢাকায় এসে আলাপ-আলোচনা শেষে দিল্লিতে চলে গেছেন। আগামী অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট আসছেন ঢাকায়। এঁরা সবাই আসছেন বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমঝোতা, সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির প্রথমে ঢাকায় এসে দিল্লি গমন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে ঢাকা-দিল্লি মৈত্রী অত্যন্ত গুরুত্ব পাচ্ছে এবং এ ব্যাপারে হাসিনা সরকারের ভূমিকার গুরুত্বও আমেরিকা খতিয়ে দেখছে।
এখানে একটি ব্যাপার লক্ষণীয়, বাংলাদেশের গত সাধারণ নির্বাচনটি বিএনপি স্বেচ্ছায় নানা অজুহাত তুলে বর্জন করে। যদিও দেশের অন্যান্য নির্বাচনে তারা অংশ নেয়। এই বর্জনের উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনটিকে অবৈধ বলে প্রচার চালানো এবং এই নির্বাচন দ্বারা গঠিত হাসিনা সরকারকেও অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য প্রমাণ করা। বিএনপির এ প্রচারণায় ধুয়া ধরেছিল আমেরিকার মতো সুপারপাওয়ার। সঙ্গে তার পশ্চিমা মিত্ররা তো ছিলই। দেশের ভেতর তথাকথিত সুশীল সমাজটিও এ ব্যাপারে কম তৎপর ছিল না এবং এখনো তৎপর রয়েছে। ভারত ও আমেরিকা যাতে হাসিনা সরকারের বৈধতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে, জাপান সাহায্যদানে গড়িমসি করে, চীন ও সৌদি আরব হাসিনা সরকারকে চাপে রাখে, সে জন্য চেষ্টা কম করা হয়নি। ড. কামাল ও ড. ইউনূস শিবিরের খেলা তো আমাদের অনেকেরই অজানা।
এ সম্মিলিত চক্রান্ত যে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে এবং হাসিনা সরকারের বৈধতা বিশ্ব স্বীকৃত, তার প্রমাণ এই সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার কার্যক্রম আলোচনার জন্য একই সময়ে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ব্রিটেনের বৈদেশিক উন্নয়নসংক্রান্ত প্রতিমন্ত্রীর ঢাকা সফর। এবং এর এক মাস পরই চীনের প্রেসিডেন্টের ঢাকা আগমন। জাপান বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো বাড়িয়েছে। এমন যে সৌদি আরব, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি যাদের বিরূপতা বহুকাল ছিল সর্বজনবিদিত, সে দেশটিও আজ বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিরাট অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে এবং সৌদি আরবে পাঁচ লাখ বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের ব্যবস্থায় সম্মত হয়েছে।
হাসিনা সরকারের বৈদেশিক নীতির বড় সাফল্য এই যে ভারত, আমেরিকা ও চীন এই তিন শক্তির ত্রিভুজ শীতল যুদ্ধের সময়েও বাংলাদেশের হাসিনা সরকার এই তিনটি শক্তির সঙ্গেই দৃঢ় মৈত্রী ও সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপনে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে এই তিনটি দেশই সমান আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এসেছে। হাসিনা সরকারের দুটি বড় প্রজেক্ট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ও গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সাহায্যদানে কয়েকটি বড় দেশই সমানভাবে আগ্রহী। সন্ত্রাস দমনে হাসিনা সরকারের শক্ত কার্যক্রমে আমেরিকাও সন্তুষ্ট এবং আমেরিকাসহ চীন ও ভারতও হাসিনা সরকারের সন্ত্রাস দমন অভিযানকে সাফল্যমণ্ডিত করার কাজে সাহায্য ও সহযোগিতা জোগাতে প্রস্তুত।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশ এবং হাসিনা-নেতৃত্ব দুইয়েরই গুরুত্ব ও প্রভাব বেড়েছে। যে ভারত কথায় কথায় বাংলাদেশের ওপর ‘দাদাগিরি’ ফলাত, যে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের বাংলাদেশে ভূমিকা ছিল ঔপনিবেশিক আমলের ভাইসরয়ের মতো, যে সৌদি আরব তাদের কথা না শুনলেই বাংলাদেশি কয়েক লাখ শ্রমিক বিতাড়নের হুমকি দিত; তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা আজ অনেকটাই পরিবর্তিত। দিল্লির মোদি সরকার পর্যন্ত ঢাকার মৈত্রীকে এখন সমমর্যাদা দেয়। ঢাকায় নিযুক্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের ভাইসরয়গিরি বন্ধ হয়েছে। সৌদি আরব হাসিনা সরকারের প্রতি বিরূপ তো নয়ই; বরং সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব যুগের বিরোধিতা ত্যাগ করে চীন এখন দেশটির উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের একটি বড় শরিক। বিশ্ব পরিবেশদূষণের বিরুদ্ধে এবং বিশ্বশান্তি রক্ষার সংগ্রামেও হাসিনা-নেতৃত্ব এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
হাসিনা সরকারের কোনো ভুলত্রুটি বা ব্যর্থতা নেই—এমন কথা আমি বলি না। কাজের মানুষেরই ভুলত্রুটি হয়। অকাজের মানুষের হয় না। আওয়ামী লীগ দেশের বহুবিধ উন্নয়নের কাজের সরকার। তাই তার ভুলত্রুটিও আছে। বিএনপি যদি বলে তাদের ভুলত্রুটি নেই; তাহলে তার জবাব হবে দেশের উন্নয়নে বিগত বিএনপি সরকারের কোনো কাজকর্মের রেকর্ডও নেই। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘ভালো বলে, অতি ভালো তুমি হে কোথায়? অতি ভালো বলে আছি অক্ষমের দারুণ ঈর্ষায়।’ বর্তমানে অক্ষমের এই দারুণ ঈর্ষাই বিএনপি রাজনীতির একমাত্র মূলধন।
দেশ এখন বন্যাকবলিত। বহুকাল পর দেশ আবার বড় ধরনের বন্যায় প্লাবিত। দুর্গতদের রক্ষায় সরকার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু বন্যা-সমস্যা সমাধানের একটি স্থায়ী পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বন্যা প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা গ্রহণসহ ভারত, চীন, নেপাল ও বাংলাদেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আবশ্যক। ভারত ও চীনের মধ্যে মনকষাকষি থাকায় এই চার দেশীয় যৌথ কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
শেখ হাসিনা এখন ভারত ও চীন দুই দেশেরই বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। তিনি চেষ্টা করে দেখতে পারেন, বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে এই চার দেশীয় যুক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় কি না। বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাঁর নেতৃত্বের যে গুরুত্ব ও প্রভাব, তাতে একমাত্র তাঁর দ্বারাই বন্যা প্রতিরোধে এই সম্মিলিত ব্যবস্থায় সবাইকে সম্মত করানো সম্ভব। আমার আশা, শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত করেছেন। সন্ত্রাসমুক্ত করতেও চলেছেন। বন্যা ও খরামুক্ত করার ব্যাপারেও তিনিই সবার আগে পদক্ষেপ নেবেন।
লন্ডন, রবিবার, ২৮ আগস্ট, ২০১৬

You Might Also Like