দেশের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত কবি শহীদ কাদরী

গত ৩১ আগস্ট বুধবার বাংলাদেশ সময় সকাল নয়টায় এমিরেটসের একটি বিমানে শহীদ কাদরীর মরদেহ ঢাকা পৌঁছায়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে গ্রহণ করতে উপস্থিত ছিলেন রামেন্দু মজুমদার, আবুল হাসনাত ও মফিদুল হক। বিমানবন্দর থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বারিধারা ডিওএইচএসে কবির বড় ভাই শাহেদ কাদরীর বাড়িতে। কবির মরদেহ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছেন তাঁর স্ত্রী নীরা কাদরী ও ছেলে আদনান কাদরী।
আগের পরিকল্পনা ছিল, বিমানবন্দর থেকে কবিকে প্রথেম বাংলা একাডেমিতে আনা হবে। কিন্তু তাঁর বড় ভাই অসুস্থ। তাই আগের পরিকল্পনা একটু বদল করে মরদেহ নেওয়া হয়েছিল বারিধারায় আত্মীয়স্বজনের সান্নিধ্যে। সেখান থেকে সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বেলা ১১টা ২০ মিনিটে সরাসরি আনা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। শববাহী গাড়ি থেকে কফিনটি যখন বয়ে আনা হচ্ছিল শোকমঞ্চের দিকে, তখন শিল্পী বুলবুল ইসলাম গেয়ে চলেছেন, ‘সমুখে শান্তি পারাবার/ ভাসাও তরণী হে কর্ণধার…’। মেঘলা হয়ে এসেছিল আকাশ। তার নিচে এই সুর কেমন যেন বিষণ্নতা ছড়িয়ে দেয় পরিবেশে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন এবং বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক প্রথমে কবিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। কবির ইচ্ছা ছিল দেশের মাটিতে ফেরার। অনেক দিন থেকেই কিডনিসহ গুরুতর রোগে আক্রান্ত কবি গত রোববার নিউইয়র্কে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি স্বজনদের এমনও বলেছিলেন যে তিনি মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছেন, দেশের মাটি তাঁকে ডাকছে। কবির সেই ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতেই প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়েছেন বলে তাঁর বিশেষ সহকারী জানান।
এরপর বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির তরফ থেকে ছিল শ্রদ্ধা নিবেদন, কবির জীবন ও কাব্যকৃতি নিয়ে টুকরো টুকরো কথা; তাঁর কবিতার আবৃত্তি, গান। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বললেন, ‘আধুনিক নাগরিক বোধ, তির্যকতা, শ্লেষ এবং দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা যুক্ত করে তাঁর কবিতার যে বিন্যাস, তা অত্যন্ত নান্দনিক ও চিত্তাকর্ষক।’ প্রাবন্ধিক মফিদুল হক বলেন, ‘জাতির ধারাবাহিক সংগ্রাম ও ব্যক্তিজীবনের সংগ্রাম দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তিনি তুলে ধরেছেন।’
কবিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, জাতীয় কবিতা পরিষদ, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সংস্থা, উদীচী, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (একাংশ), কণ্ঠশীলন, আওয়ামী লীগ, সিপিবিসহ বিভিন্ন সংগঠন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এই শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করে। সঞ্চালনা করেন জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ।
শ্রদ্ধা নিবেদনের শেষ পর্যায়ে কিছু বলতে এসে কবি-পত্নী নীরা কাদরীর কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, কবির চলে যাওয়ার বেদনা তাঁর পক্ষে ভাষার প্রকাশ অসাধ্য। কবির ছেলে আদনান কাদরী প্রথমেই কবির শেষ ইচ্ছা পূরণ করে তাঁকে দেশে আনতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে যাবতীয় ব্যবস্থা করায় পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিন কবি দেশে অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও মানুষ কবির প্রতি যে গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন, তা দেখে তিনি অভিভূত বলে কবিপুত্র জানান।
শহীদ মিনার থেকে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে আনা হয়। বাদ জোহর জানাজার পর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে বেলা তিনটা নাগাদ কবিকে দেশের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

You Might Also Like