আলোকিত মিডিয়া অঙ্গনের আলোকিত একজন মানুষ

হাফেজ মুফতি সাইফুল ইসলাম। আলোকিত মিডিয়া অঙ্গনের আলোকিত একজন মানুষ। তার হৃদয়কাড়া উপস্থাপনায় আপ্লুত হয়ে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতায় আলোড়িত হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। একাধারে তিনি একজন বিদগ্ধ আলেম, সমাজবিশ্লেষক, মিডিয়াস্কলার এবং সুপরিচিত উপস্থাপক। কামড়াঙ্গীরচর জামেয়া নুরিয়া থেকে ১৯৯৩ সালে হিফজুল কোরআন সমাপ্ত করেন সাইফুল ইসলাম। মাদরাসাতুল মদিনা, চট্টগ্রামস্থ জামেয়া পটিয়া এবং জামেয়া আহলিয়া দারুল উলুম হাটহাজারীতে পড়েছেন তিনি। ইসলামি আইন বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন ঢাকাস্থ দারুল ফিকহি ওয়াল ইরশাদ মাদরাসায়।
শিক্ষকতার মাধ্যমে মুফতি সাইফুল ইসলামের কর্মজীবনের সূচনা ঘটলেও মিডিয়াকে ভালোবেসে এই জগতে গাঁটছাড়া বাঁধেন তিনি। মিডিয়া জগতের প্রথম কর্মস্থল আরটিভি। এরপর দীর্ঘসময় যুক্ত ছিলেন দেশের প্রথম ইসলামিক চ্যানেল ইসলামিক টিভিতে। এছাড়া প্রায় দুই দশক ধরে তিনি বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও রেডিওতে ইসলামিক প্রোগ্রাম পরিচালনা ও উপস্থাপনা করে আসছেন। বর্তমানে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক প্রডাকশন হাউজ রাহবার মাল্টিমিডিয়া লিডিটেডের চেয়ারম্যান। এছাড়া যুক্ত রয়েছেন নানাবিধ সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সাথে। দেশের একমাত্র ইসলামিক মেগা রিয়েলিটি শো আলোকিত জ্ঞানীর স্বপ্নপুরুষ এই মুফতি সাইফুল ইসলাম।
ইসলামের প্রচার প্রসারে মিডিয়ার ভূমিকা ও মিডিয়া ব্যবসার নানা দিক ও বিষয় এবং ইসলাম ও মিডিয়া সম্পর্কিত নানা অজানা ও অচর্চিত বিষয় উঠে এসেছে তাঁর যৌক্তিক ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনায়।
অনলাইন পত্রিকা প্রিয়.কমে তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হয়। ইসলামে মিডিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব রয়েছে এই সাক্ষাৎকারে। এখন সময় পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি হুবহু পুন: প্রচার করা হল।
প্রিয়,কমের পক্ষ থেকে তার দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন প্রিয় ইসলাম বিভাগের এডিটর ইনচার্জ মাওলানা মিরাজ রহমান ও কনটেন্ট রাইটার মাওলানা মনযূরুল হক।

প্রিয়.কম : রাহবার মাল্টিমিডিয়া লিমিটেড আসলে কী? প্রতিষ্ঠানটির সংক্ষিপ্ত পরিচিত, লক্ষ-উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।
মুফতি সাইফুল ইসলাম : আমরা জানি ‘রাহবার’ শব্দটা হলো ফার্সি শব্দ ‘রাহেবর’ অর্থাৎ পথপ্রদর্শক। আসলে পথ তো অনেকগুলোই আছে, কিন্তু সবসময় আমরা দোয়া করি, সরল-সহজ-সঠিক পথে যেনো আল্লাহ আমাদের পরিচালিত করেন। আমরা বিশ্বাস করি, মাল্টিমিডিয়া বা মিডিয়ার অনেক পথের মধ্যে সত্য ও সঠিক পথ যেটা, সেই পথের ওপরই পরিচালক হিসেবে থাকবে রাহবার, পথ দেখাবে এবং রাহবারের সাথে যারা সংশ্লিষ্ট আছে তারা সে পথেই চলবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই আমরা রাহবার মাল্টিমিডিয়া নাম দিয়েছি। আর লিমিটেড দেখে বুঝতেই পারছেন, এটা একটা কোম্পানী। এটা কেনো, তারও একটা কারণ আছে। যেহেতু হুজুগ বলে একটা কথা আছে, তো দেখা যায় অনেক সময় হুজুগে পড়ে খুব ঝাঁপিয়ে কাজ করি, তারপর একটা সময় দেখা গেলো হুজুগটা নেই, আবেগটা কমে গেলো কিংবা কোনো একটা সমস্যা হলো, তখন সেটা ছেড়ে দিই। সুতরাং আমরা লিমিটেড এ জন্যেই করেছি যে, ইসলামিক মিডিয়া বা মাল্টিমিডিয়া যা-ই বলেন, এই পথটাতে আমরা থাকতে চাই নেশা এবং পেশা হিসেবে।
আর সংক্ষিপ্ত পরিচিতির কথা যদি বলেন, আমরা এই বিশাল ময়দানে ক্ষুদ্র সেবক হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছি। টুকটাক ভালো কিছু ইসলামিক প্রোগ্রাম করার চেষ্টা করছি। আমাদের মূল বিষয়টা হলো দাওয়াভিত্তিক কাজ করা। এবং আমাদের মূল চাবিকাঠি হলো কোরআনের সেই আয়াত আপনি আল্লাহর পথে ডাকুন প্রজ্ঞা ও সুন্দর কথার মাধ্যমে। মানুষকে ভালোবাসার সাথে দরদের সাথে উদারতা দিয়ে দীনকে সামনে রেখে আমরা খেদমত করতে চাই। এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। আল্লাহ যেনো কবুল করেন।
প্রিয়.কম : আপনাদের কাজের সূচনা এবং বর্তমানে আপনাদের কী কী কার্যক্রম চালু আছে?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : ২০০৮ সাল থেকেই আমরা কাজ করে আসছি এবং আপনি দেখবেন, আলহামদুলিল্লাহ বর্তমানে রমজান এলে প্রত্যেকটা চ্যানেলেই প্রচুর পরিমাণে ইসলামিক প্রোগ্রাম দেখানো হয়। বিকাল ৩টা থেকে নিয়ে একদম সেহরি পর্যন্ত। আমরা যখন ২০০৮ সালে প্রোগ্রাম শুরু করি, তখন হাতে গোণা দু-একটা চ্যানেল প্রোগ্রাম করতো এবং সেটা তাদের নিজস্ব প্রডাক্টশন হাউজ থেকেই হতো; বাণিজ্যিকভাবে তারা করতেন না। আমরা বাংলাভিশনের সঙ্গে কথা বললাম, তাদেরকে আমরা বোঝানোর চেষ্টা করলাম আপনারা যদি এই সময়ে ইসলামিক প্রোগ্রাম করেন বাণিজ্যিকভাবে, তবে আমরা সময়টা কিনে নিয়ে করতে চাই, আমাদের মনে হয় আপনারা লাভবান হবেন। তখন তারা বিষয়টা বুঝতে পারছিলেন না যে, এটা কিভাবে হতে পারে। যা হোক, আমরা শুরু করলাম। এবং আমরা অভূতপূর্ব সাড়া পেলাম। প্রচুর দর্শক প্রোগ্রামটা দেখলো এবং তাদের ভিউয়ার্স বেড়ে গেলো। ২০০৯ সালে আরও দুটা চ্যানেলে আমরা আমাদের কাজের পরিধি বাড়ালাম। এরপর ২০১০ সাল থেকে দেখা গেছে বিভিন্ন চ্যানেলে বাণিজ্যিকভাবে ইসলামিক প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গেলো। এখনতো আল্লাহর রহমতে রমজানে প্রতিটি চ্যানেই বাণিজ্যিকভাবে ইসলামিক প্রোগ্রাম পরিচালনা করে থাকে। আমরা দোয়া করি আল্লাহর কাছে, এর উত্তম প্রতিদান যেনো রাহবার মাল্টিমিডিয়া পায়।
বর্তমানে আমরা কয়েকটা চ্যানেলেই বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ইসলামিক টকশো করছি। পাশাপাশি একটা বড় কাজ আমরা হাতে নিয়েছি, যেটা কেবল বাংলাদেশের ইসলামিক মিডিয়া জগতেরই নয় বরং ইসলামিক জ্ঞানের একটা বিশাল রিয়েলিটি শো- এটা আমরা অলরেডি দুবছর করেছি এবং ভবিষ্যতেও আমরা কন্টিনিউ করবো ইনশাআল্লাহ। যে প্রোগ্রামটির নাম ‘আলোকিত জ্ঞানী’। আপনারা জানেন যে, এটা একটা বিগ বাজেটের প্রোগ্রাম। যেখানে সারা বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য প্রতিযোগীকে অনেকভাবে বাছাই করে তাদেরকে আমরা আমাদের গোল্ডেন চেয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলাম। এ ছাড়াও আরও কিছু প্রোগ্রাম আমাদের এফএম রেডিওতে চলছে এবং বেসরকারি টিভি চ্যানেলে চলছে।
প্রিয়.কম : এই টিভি বা রেডিও প্রোগ্রামের বাইরে আপনাদের কোনো কার্যক্রম আছে কি না?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : অনলাইন এফএম রেডিও- রেডিও ইসলাম.এফএম নামে আমরা একটা কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে কিছু কাজ করেছি, ভবিষ্যতে আরও করবো। আমাদের একটা প্রকাশনা নিয়ে চিন্তাভাবনা আছে। আল্লাহর মেহেরবানী যে একটা অনবদ্য কাজ হয়েছে, প্রায় ১১ হাজার তিনশ’ প্রশ্নের উত্তর সম্বলিত একটা বই রাহবার মাল্টিমিডিয়া থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘হতে চাই আলোকিত জ্ঞানী’ নামে। বইটা বেশ সমাদৃত হয়েছে সবার মাঝে।
প্রিয়.কম : ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে মিডিয়ার ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তা কী – এ সম্পর্কে আপনি কিছু বলেন।
মুফতি সাইফুল ইসলাম : মিডিয়ার কাজটা কি ? মিডিয়ার কাজ হলো সত্যকে প্রকাশ করা। আর সত্যের উৎস হলো ওহি। এই ওহি যাদের ওপর নাজিল হয়েছে, তাদের আমরা নবি বলে থাকি। নবি মানে হলো, যিনি সংবাদ গ্রহণ করেন এবং প্রচার করেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে যে ওহি এসেছে, সে ক্ষেত্রে যিনি মিডিয়া হিসেবে কাজ করেন, তিনিই মূলত নবি। অর্থাৎ মূল যে সংবাদ, মূল উৎস থেকে যে সংবাদ এসেছে নবি সেটা পৌঁছে দেন সত্য সত্য। সুতরাং যেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের মহান রাব্বুল আলামিন তিনিই মিডিয়ার সূচনা করেছেন, সেখানে ইসলাম প্রচার প্রসারে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে আর কোনো কথা বলার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। কেননা, আমাদের ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে মিডিয়াই সব চাইতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা রাসুলের [সা.] ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাবো, সেই সময়ও মিডিয়া ছিলো। পক্ষে ছিলো, বিপক্ষেও ছিলো। সেই সময়ও প্রোপাগান্ডা হতো। মিডিয়ার অপপ্রচার যেমন হতো, একই ভাবে সত্য প্রচারের জন্যে একদল সাহাবায়ে কেরাম পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন। তারা নবুয়তের সংবাদ প্রচার করেছেন। রাসুল [সা.] বলেছেন, আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত, একটি শব্দ, একটি বাক্য হলেও তা পৌঁছে দাও। এই যে দায়িত্ব এটা কারা পালন করবেন? আমাদেরকেই তো পালন করতে হবে। সুতরাং আমরা বলতে চাই, ইসলাম প্রচার-প্রসারে মিডিয়ার ভূমিকা অপরিসীম এবং মিডিয়া লাইনে যতগুলো পথ আমাদের সামনে আছে, প্রত্যেকটি পথই আমাদের গ্রহণ করা উচিত।
প্রিয়.কম : অর্থাৎ আপনি বলতে চান যে, মিডিয়ার মাধ্যমে যারা সত্য সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন, তারা আসলে নবিঅলা কাজই করছেন?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : হ্যাঁ, বলা যায়। আপনি যদি আরও সহজ করে দেখেন, কোরআনে কারিমের সূরা হুজরাতের দিকে যদি তাকান, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন ‘মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও।’ আপনি যে কথাটা বলেছেন এবং এই আয়াত উভয় কথার মধ্যে একটা সমন্বয় হয়। অর্থাৎ আমরা যখন কোনো সংবাদ পরিবেশন করবো বা কাউকে কিছু বলবো, তখন সেটা আমি সত্য সত্য প্রকাশ করবো। এটাই নবিঅলা কাজ ছিলো। যেমন- আল্লাহর নবি [সা.]-এর ব্যপারে এমন কিছু আয়াতও এসেছে, যেখানে আল্লাহর নবিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে তিরস্কার করা হয়েছে। আল্লাহর নবি তো চাইলে চিন্তা করতে পারতেন যে, এই আয়াতটা যদি সাহাবিদের সামনে বলি, তবে সেটা আমার জন্যে ডিসক্রেডিট হতে পারে। যেমন- “তিনি ভ্রূকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কারণ, তাঁর কাছে এক অন্ধ আগমন করল।” এ ধরনের যে আয়াতগুলো আছে। তখন তিনি তো না-ও প্রকাশ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি শিক্ষা দিয়েছেন যে, যেটা সত্য, সেটা তোমার বিপক্ষে গেলেও এবং তোমার ভালো না লাগলেও তোমাকে প্রকাশ করতে হবে। কিংবা কাউকে আমাদের ভালো লাগে না বলে মিথ্যা বলবো, এটা ইসলাম অনুমোদন করে না।
প্রিয়.কম : কিন্তু ইলেক্ট্রনিক, প্রিন্ট কিংবা মিডিয়ার সব ক্ষেত্রেই আমরা দেখছি, ইসলামপন্থীদের অংশগ্রহণ খুবই কম। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : আমি আপনার সাথে এ ক্ষেত্রে সামান্য দ্বিমত পোষণ করতে চাই। হ্যাঁ, এক সময় কম ছিলো, কিন্তু এখন আলহামদুলিল্লাহ, যথেষ্ট পরিমাণে আলেম-ওলামা ভাইয়েরা এগিয়ে আসছেন। যার ফলে দেখা যাচ্ছে এখন প্রত্যেকটা মিডিয়াতেই আলেমগণ কথা বলছেন। তবে এটার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। লেখালেখির জগতে তো তারা অনেক আগেই এসেছেন। আরও আগে এবং আরও বেশি আসলে আরও ভালো হতো। আমাদের একটু দুর্বলতা আছে। আমরা চট করে কোনোকিছু গ্রহণ করার আগে চিন্তা-ভাবনা করতে গিয়ে আমাদের যথেষ্ট সময় চলে যায়। এই সময়ক্ষেপনের কারণে সেটাকে আবার ওভারকাম করতে গিয়ে আমাদের অতিরিক্ত আরও সময় ব্যয় হয়। এখন আলহামদুলিল্লাহ, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে, টিভি, রেডিও, প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়াতে ইসলামপন্থীদের অংশগ্রহণ আছে।
প্রিয়.কম : আমরা জানি, মিডিয়ায় প্রচারের জন্যে রাহবার মাল্টিমিডিয়া মূলত একটি মধ্যবর্তী প্রসেসের কাজ করে থাকে। এই প্রসেসটা আপনারা কিভাবে করে থাকেন?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : রাহবার মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে আমরা ইসলামের সৌন্দর্যটাকে তুলে ধরতে চাই। এবং এটার জন্যে আমরা প্রোপার ওয়েতে অগ্রসর হতে চাই। এই ক্ষেত্রে আমাদের টুকটাক জানাশোনা থাকার কারণে আমরা সহজভাবে প্রসেসটা করতে পারি। আমাদের প্রসেসটা হলো, বিভিন্ন চ্যানেল থেকে তাদের সময়টা আমরা কিনে থাকি। এরপর আমরা একটা মানসম্মত প্রোগ্রাম তৈরি করি| এ ক্ষেত্রে অনেক সময় আমরাই স্পন্সর কালেক্ট করি, অনেক সময় টিভি চ্যানেলের পক্ষ থেকে আমাদের স্পন্সর দেয়া হয়ে থাকে এবং আমরা বাকি বিষয়গুলো অর্গানাইজ করে থাকি। অনেক সময় দেখা যায়, চ্যানেলই প্রোগ্রাম তৈরি করে, কিন্তু পার্টি জোগাড় করা, কারা কারা প্রোগ্রামে আসবেন, তাদের নির্ধারণ করা, এসব কাজ আমরা করি ।

প্রিয়.কম : এখানে আমরা দুটি বিষয় পেলাম, দাওয়াতের ক্ষেত্রে মিডিয়া হাউস প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রতিষ্ঠিত মিডিয়ায় প্রোগ্রাম প্রচারের জন্যে ব্যবস্থাপনা করা। আমাদের প্রশ্ন হলো, এই দুটি ক্ষেত্রকেই হালাল ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করা যাবে কি না? এ ব্যাপারে ইসলামে দিক-নির্দেশনা কী?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : অবশ্যই করা যাবে। কেননা, আমরা জানি, যিনি শিক্ষক, তার জন্যে কিন্তু সম্মানী নির্ধারণ করতে হয়। এটা ইসলামি শরিয়ার বিধান। যিনি ইমাম, তিনি যদিও ইবাদত করছেন, তারপরও তার জন্যে একটা সম্মানি থাকে। যদি ইসলামি শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র হয়ে থাকে, তবে এটা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাকে দেয়ার বিধান। মূলত এখানে তার যে একটা সময় ব্যয় হয়, সেই সময়টার একটা মূল্য আছে। আমরা যে কাজটা করছি, এখানে লম্বা একটা সময়ের প্রয়োজন হয়। কেননা, এটা আমাদের নেশা প্লাস পেশা। সব মিলিয়ে এখানে আমাদের সময় ব্যয় হয়, যথেষ্ট অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। এই ক্ষেত্রে আমরা যখন দাওয়াতি কাজ করবো, আমার নিয়ত যদি ঠিক হয়, সেই নিয়তকে সঠিক রেখে যদি আমরা দাওয়াতি কাজ করি, সেই দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে ইসলামি হালাল বিজনেস অবশ্যই করা সম্ভব। সুতরাং এই কাজগুলো যারা করতে চান, তারা পেশা হিসেবে করতে পারেন। কিন্তু বিষয়গুলো সুন্দরভাবে বুঝেশুনে তাদের অগ্রসর হওয়া উচিত। কেননা, প্রত্যেকটি বিষয়ের ভালো এবং মন্দ দিক তো থাকেই।
প্রিয়.কম : ব্যবসা প্রসঙ্গে জানতে চাই, আমরা যে প্রোগ্রাম মেকিং করছি, এর জন্যে যে টাকা খরচ হলো, এর থেকে কত পরিমাণে বেশি লাভ আমি নিতে পারবো আমার প্রতিষ্ঠানের জন্যে? যেমন আমি একটা প্রোগ্রাম বানালাম এক লক্ষ টাকা খরচ করে। এর থেকে কত গুণ বেশি দিয়ে আমি সে প্রোগ্রাম বিক্রি করতে পারবো? এ ক্ষেত্রে ইসলামের কোনো বিধিনিষেধ আছে কি না?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : প্রথম কথা হলো, এখন সে সময়টা নাই যে, আমি একটা প্রোগ্রাম এক লক্ষ টাকায় নির্মাণ করে সেটা দশ লক্ষ টাকায় বিক্রি করবো। আপনি যাদের কাছ থেকে স্পন্সরশিপ নেবেন, দেখবেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ। দ্বিতীয় কথা হলো, ইসলামের দিক-নির্দেশনা হচ্ছে, যেসব পণ্য বহুল ব্যবহৃত ও নিত্য প্রয়োজনীয়, সেগুলো সহজলভ্য হতে হবে।
পাশাপাশি আরেকটি বিষয় বলবো, আমাদের অনেক ভাই আছেন, দেখা গেলো তিনি অনেক ভালো স্পন্সর পেয়েছেন। তখন দেখা যায়, যেটার দাম দশ টাকা, তিনি কোনো চ্যানেল থেকে সেটা বারো টাকা বা পনেরো টাকায় কিংবা বিশ টাকা দিয়ে ক্রয় করে ফেলেন। ফলে আমরা মিডিয়ায় দাওয়াহর যে কাজটা করি, সে ক্ষেত্রে একটা অস্থিরতা তৈরি হয়। আমি বলবো, যারা দাওয়াহর কাজ করেন, তারা যেনো এদিকে একটু লক্ষ রাখেন। কারণ, আজকে আমি দুই টাকার যে জিনিসটি দশ টাকায় ক্রয় করছি, সেটি আগামিদিন আমার জন্যেই বুমেরাং হবে।
প্রিয়.কম : আমরা দেখেছি, মাল্টিমিডিয়ার জগতে ইসলামিক মিডিয়া হিসেবে রাহবার মাল্টিমিডিয়াই প্রথম। একজন আলেম হিসেবে জেনারেল মিডিয়ার জগতে এমন একটি ইসলামি মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে আপনার অভিজ্ঞতা কী— এ সম্পর্কে যদি আমাদের একটু বলেন।
মুফতি সাইফুল ইসলাম : ইসলামিক মাল্টিমিডিয়ার জগতে রাহবার মাল্টিমিডিয়াকে আমি প্রথম বলবো না। এর আগেও অনেক ভাই কাজ করেছেন। যারা নেশা হিসেবে কাজ করেছেন, কিন্তু পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন নি। যার ফলেই হয়তোবা তারা এখন আর কাজ করছেন না। তবে ইসলামিক মাল্টিমিডিয়া জগতে আমরা এটা পেশা হিসেবে নিয়েছি এবং এই পেশা হিসেবে নেয়াটা প্রথম। এ জন্যে এটাকে আমরা কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছি। আর অভিজ্ঞতা ও অর্জনের কথা যদি জানতে চান, তাহলে বলবো, এখানে আমাদের যেমন কিছু সুখস্মৃতি আছে, ঠিক তেমনি বেদনাদায়ক অনেক বিষয় আছে; যা স্মরণ করলে এখনও কষ্ট লাগে। সর্বক্ষেত্রেই তো ভালোমন্দ আছে। খুব সহজেই তো আমরা এ পর্যন্ত আসি নি। অনেক চড়াই-উৎরাই পার হতে হয়েছে। অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে। অনেক পার্টি দেখা গেছে আমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু আমাদেরকে পাওনাটা দেন নি। অনেকে চুক্তির অর্ধেক টাকা দিয়ে আমাদের ভয়বহ লসের মুখে ফেলেছেন, আমাদের কোমর ভেঙে গেছে— এমন অনেক ঘটনা আমাদের জীবনে ঘটেছে। আবার হ্যাঁ, অনেক পার্টি আমরা পেয়েছে, যারা প্রোগ্রাম শুরুর আগেই পাওনা আমাদের দিয়েছেন, যার ফলে আমরা আমাদের প্রোগ্রামগুলো করতে পেরেছি। এই ধরনের নানা অভিজ্ঞতা আমাদের আছে এবং এগুলো স্মরণে নিয়েই আমাদের অগ্রসর হওয়া উচিত। কারণ আপনি যখন একটা পিচ্ছিল পথে হাঁটবেন, সেখান সাবধানতার সাথেই আপনাকে হাঁটতে হবে, এটাই স্বভাবিক।
প্রিয়.কম : ব্যক্তিগত জীবনে আপনার অর্জন কী­— সেটা যদি আমাদের একটু বলেন।
মুফতি সাইফুল ইসলাম : ব্যক্তিগত অর্জনের কথা যদি বলেন, তবে সেটা আমার কাছে বেশ কঠিন প্রশ্ন বলে মনে হবে…
প্রিয়.কম : মানে আমরা এই ইসলামিক মিডিয়ার জগতে আপনাকে একজন পথিকৃৎ হিসেবে জানি। এই লাইনে এসে এই সময় পর্যন্ত আপনার পার্সোনাল অর্জন কী?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : একজন অযোগ্য লোক হিসেবে আল্লাহ তায়ালা আমাকে এতো বেশি দিয়েছেন, যার শুকরিয়া আদায় করে আমি শেষ করতে পারবো না। আর যদি বলেন, আপনি কতটুকু কী করেছেন ? তাহলে বলবো, যা করার কথা ছিলো, বা যা করা দরকার আমি আসলে কিছুই করতে পারি নি। কেবল ছাত্র হিসেবে আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি।
প্রিয়.কম : বর্তমানেও বহু আলেমকে দেখা যায়, যারা টিভিতে অনুষ্ঠান করাটা বৈধ মনে করেন না। এ ব্যাপারে আপনার অভিব্যক্তি কী?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : অবশ্যই তারা বিজ্ঞ আলেমে দীন। তারা বহু গবেষণা করছেন। তারা যে চিন্তা লালন করছেন, অবশ্যই এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ আছে, যে কারণে এই মত তারা ব্যক্ত করছেন। তবে সেটা কী কারণ, তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে দেখেছি, তাকি উসমানি সাহেবের মতো আলেমে দীনগণ যারা আগে মিডিয়াতে যেতেন না, কিন্তু এখন অহরহ মিডিয়াতে যাচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, তাবলিগ জামাতের মুহতারাম তারিক জামিল প্রচুর প্রোগ্রাম করছেন মিডিয়াতে; যা আমরা অ্যাভেইলএ্যাভেল দেখতে পাচ্ছি। জুনায়েদ জামশেদ প্রোগ্রাম করছেন। তিনি আগেও মিডিয়ার লোক ছিলেন। সম্প্রতি পাকিস্তান ও দেওবন্দ থেকেও শুনেছি একটা ফতোয়া এসেছে। আমার ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে দেখেছি, যে বিজ্ঞ ওলামায়ের কেরাম আগে শরিয়ার ভিত্তিতেই মিডিয়াতে আসা অপছন্দ করতেন, তারা এখন শরিয়ার ভিত্তিতে সে-মত থেকে সরে এসেছেন। এমন ব্যক্তির সাথেও আমার প্রোগ্রাম করার সুযোগ হয়েছে, যিনি একসময় টেলিভিশনের বিরুদ্ধে বই পর্যন্ত লিখেছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কেনো এখন প্রোগ্রামে এসেছেন ? তিনি বলেছেন, আসলে মিডিয়াটা অনেক বড় একটা মাধ্যম। আর এই ইস্যুতে কথা বলতে গেলে মিডিয়ার কোনো বিকল্প নেই, তাই আমি চ্যানেলে এসেছি। আমি মনে করি, এই আপত্তিটা আর থাকবে না। যারা এখনও মিডিয়াতে আসছেন না বা আসাটা ভালো মনে করছেন না, ইনশাআল্লাহ, তারা অদূর ভবিষ্যতে চলে আসবেন। মিডিয়া তো আজ থেকে না, মিডিয়া কোনো নতুন বিষয় না। রাসুল [সা.]-এর যুগ থেকেই মিডিয়া ছিলো এবং তিনিও প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের দেখিয়েছেন।
প্রিয়.কম : বাংলাদেশে টিভি চ্যানেলগুলোতে ইসলামি প্রোগ্রাম প্রচারের বিষয়ে অনেকেই বলে থাকেন যে, টিভি মালিকরা কেবল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই এইসব প্রোগ্রাম প্রচার করে থাকেন এবং আলেমদেরকে তারা তাদের ব্যবসার স্বার্থসিদ্ধির জন্যে ব্যবহার করেন। যেমন রমজান মাস এলে দেখা যায় প্রচুর ইসলামি অনুষ্ঠান হয়, কেননা দর্শক বেশি হওয়ায় তাদের টিআরপি বাড়ে তখন। কিন্তু অন্য সময় ইসলামি অনুষ্ঠান তেমন হয় না, কারণ তারা মনে করেন, এখন এই সব অনুষ্ঠানের ভিউয়ার্স কম। আমরা জানতে চাচ্ছি, আলেমদেরকে টিভি মালিকরা ব্যবহার করেন বলে মানুষের এই যে এক ধরনের মন্তব্য রয়েছে, এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : সর্বক্ষেত্রে কথাটি সঠিক নয়। বাণিজ্যিকভাবে ইসলামিক প্রোগ্রাম চালু হওয়ার পূর্বেও কিছু চ্যানেল নিয়মিত ইসলামিক প্রোগ্রাম প্রচার করেছে। এখনও আপনি দেখবেন কয়েকটি চ্যানেল নিয়মিত ইসলামি প্রোগ্রাম করছেন এবং এ ক্ষেত্রে তাদের কোনো স্পন্সর নেই। তাই আমি বলবো, যারা এমন মন্তব্য করেন, তাদের কথা অনেকাংশে ঠিক আছে, আবার কিছু ব্যতিক্রমও আছে। তবে এটা টিভি মালিকদের একান্ত বিষয়, তারা ব্যবসার উদ্দেশ্যে যদি করে থাকেন, তবে তো ‘প্রত্যেক কাজই নিয়তের ওপর নির্ভর করে’। আল্লাহ তায়ালা তাদের নিয়তকে দেখছেন। এবং ওলামায়ে কেরাম কেনো যাচ্ছেন, বা আমরা কেনো যাচ্ছি, আমাদের সে-নিয়তও তো আল্লাহ তায়ালা দেখছেন। আমাদের নিয়ত হলো এমন যে, আমি যে মিডিয়াতে বসে কথা বলি, সেই জায়গাটাতে যদি ইসলামি প্রোগ্রাম না হয়, তা হলে সেই জায়গাটা ফাঁকা থাকবে না । সেখানে কোনো গানের অনুষ্ঠান বা নাচের অনুষ্ঠান হবে । আমাদের অনুষ্ঠানের আগে-পিছেও হয় । কিন্তু মধ্যখানে আধাঘণ্টা সময় হোক, সেই সময়টাতে তো আমরা একসঙ্গে লক্ষকোটি মানুষের সামনে ইসলামকে তুলে ধরার একটা প্রয়াস পাচ্ছি। তো এই সুযোগটাকে কেনো আমরা হাতছাড়া করবো? যেই ময়দানে নাচ-গান হয়, সেই ময়দানে কি মাহফিল হতে পারবে না ? অনেকে বলে থাকেন, যেখানে নাচ-গান হয়, সেখানে আমরা কেনো যাই। আমরা তো তখন যাই না। তবে আমরা ভাবি, যেখানে একটা চ্যানেলে ২৩ ঘণ্টা মানুষ নাচ-গান দেখেছে বা অনৈসলামিক প্রোগ্রাম দেখেছেন, সেখানে অন্তত একটা ঘণ্টা হলেও তো তিনি কিছু ইসলামিক আলোচনা পেয়েছেন। এখন সেখানেও যদি আমরা না যাই, তাহরে তো পুরো জায়গাটাই অন্ধকার হয়ে গেলো। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আলেম-ওলামাদের অবশ্যই যাওয়া উচিত।
প্রিয়.কম : কিন্তু কোনো আলেম যদি শুধু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কোনো ইসলামিক প্রোগ্রাম করেন, তার ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী? তার ব্যবসাটা হালাল হবে কি না?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : যদি কেউ শুধু ব্যবসার উদ্দেশ্যে ইসলামি প্রোগ্রাম করেন, সে-ক্ষেত্রে তা কোরআনের মতে, ‘আল্লাহর আয়াতকে অল্পমূল্যে বিক্রি করার মতো কোনো বিষয় হয়ে যায়’ কি না— তা আল্লাহ তায়ালাই ভালো বলতে পারবেন। আমি সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবো না। তবে আমি তাকে অনুরোধ জানাবো, ধরুন, আপনার চট্টগ্রাম যেতে হবে কোনো কাজে, একই সাথে আপনার রসমালাই কেনার জন্যে কুমিল্লাতেও থামতে হবে, তাহলে আপনার সেই গাড়িই ধারা উচিত, যা চট্টগ্রাম যাবে এবং কুমিল্লাতেও থামবে; তাহলে আপনার একসাথে দুই কাজই হয়ে যাবে। সেভাবে আপনি যদি এই ইসলামি প্রোগ্রামটাকে আপনার ইবাদাহ হিসেবে নেন, খিদমাহ হিসেবে নেন, তাহলে কিন্তু আপনার খেদমতও হবে, একই সাথে আপনার বাণিজ্যও হয়ে যাবে। দুনিয়া এবং আখেরাত উভয় দিকটিই তখন আপনি পাবেন। আমরা মাসআলা জানি, কোনো ব্যক্তি যদি হজে যান, তিনি যদি নিয়ত করেন যে, আমি হজের জন্যে যাবো বটে, তবে আমি কিছু পণ্যও নিয়ে যাবো, মাঝপথে আমি সামান্য বাণিজ্যও করবো। এটা কিন্তু তাকে নিষেধ করা হয় নি। এভাবে কেউ যদি ইসলামি প্রোগ্রাম করেন, তবে তিনি একটা ভালো কাজ করছেন। সে ক্ষেত্রে তিনি যদি মনে করেন আমি একটা খেদমত করছি, পাশাপাশি এতে আমার দুই পয়সা আসবে। এই মানসিকতা ও নিয়তের কারণে কাজটা তার ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু যদি শুধু তিনি ব্যবসার চিন্তা করেন, তবে ব্যবসা হালাল হবে বটে, কিন্তু চিন্তার দৈন্যতার কারণে তিনি যে সাওয়াব পেতেন, তা থেকে বঞ্চিত হবেন।
প্রিয়.কম : অর্থাৎ আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, শুধুমাত্র যদি ব্যবসায়িক মানসিকতা নিয়ে কেউ ইসলামিক প্রোগ্রাম করে, তবে তার ব্যবসা হালাল হবে।
মুফতি সাইফুল ইসলাম : ব্যবসাটা হালাল হবে। কেননা, তিনি তো হারাম কিছু করছেন না। একজন ব্যবসায়ী যদি কোনো উন্নত পণ্য দেন, হালালান তায়্যিবা দেন প্রোডাক্ট হিসেবে তাহলে তো হারাম হওয়ার কিছু নেই। আপনারা হয়তো জানলে অবাক হবে, যিনি ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানেন না, তিনিও ইসলামিক প্রোগ্রাম করছেন কেবল ব্যবসার উদ্দেশ্যে। এমনকি মুসলিম নন, এমন ব্যক্তিও বাণিজ্যিক কারণে ইসলামিক প্রোগ্রাম করছেন। এটা অনেকটা ইসলামিক ক্যাসেট বিক্রির মতো বিষয়।
প্রিয়.কম : ইসলামিক প্রোগ্রাম পরিচালনা কিংবা নির্মাণের ক্ষেত্রে আমরা যদি কোনো অবৈধ বিজ্ঞাপন গ্রহণ করি কিংবা যদি কোনো ইসলাম পরিপন্থী স্পন্সর নিই, সেটা কতটা হালাল হবে? এ ব্যাপারে ইসলামের দিক-নির্দেশনা কী?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : আপনি যেই কথাটা বলেছেন, এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ জন্যেই অনেক ওলামায়ে কেরাম এ পথে অগ্রসর হতে চান না। হ্যাঁ, কোনো প্রোগ্রাম করার ক্ষেত্রে যদি এমন কোনো বিজ্ঞাপন আসে যা শরীয়তসম্মত নয়, অবশ্যই সেটা গ্রহণ করা বৈধ হবে না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিরুপায় হয়ে যেতে হয়। দেখা যায় যে, আমরা আমাদের প্রোগ্রাম চালানোর সময় সে বিজ্ঞাপন আমরা চালাই নি, কিন্তু চ্যানেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সেটা চালানো হয়েছে। আমরা সে-সময় সাথে সাথে তাদের অনুরোধ জানাই এ বিজ্ঞাপনগুলো প্রচার না করার জন্যে। তারা কখনো প্রচার বন্ধ করে, আবার কখনো করে না। আমরা তো আমাদের চেষ্টাটা করি। আবার আমাদের প্রোগ্রাম নির্মাণের সময়ও দেখা যায়, এমন কোনো বিজ্ঞাপন আমাদের কাছে চলে আসে যা শরীয়তসম্মত নয়, তখনও সেই চেষ্টাটা করা হয়, যেনো এ বিজ্ঞাপনটা গ্রহণ না করে প্রোগ্রাম নির্মাণ করা যায়। এটাই উচিত। তবে আরেকটা বিষয় হলো, কখনো আমরা প্রোগ্রাম নির্মাণ করতে গিয়ে দেখি প্রচুর টাকার দরকার। যেমন ‘আলোকিত জ্ঞানী’। এখানে প্রায় কোটি টাকার মামলা ছিলো। এমন কোনো প্রোগ্রাম করার সময় যদি কোনো ভাই এগিয়ে আসেন যে, ফি সাবিলিল্লাহ তিনি প্রয়োজনীয় টাকাটা দেবেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে এবং দাওয়াহর জন্যে দেবেন, তাহলে কিন্তু আর কষ্টটা হয় না। কিন্তু যেহেতু আমরা এমন পাই না, তাই বাধ্য হয়ে বিভিন্ন স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রোপজাল সাবমিট করতে হয়। চেষ্টা করা হয়, এমন কোনো প্রোডাক্ট যেনো না আসে, যা শরীয়তসম্মত নয়। তারপরও অনেক সময় এমন প্রোডাক্ট চলে আসে যা জায়েয নয়, কিন্তু প্রোগ্রামের খাতিরে সেটা চলে এসেছে। এ সময় আনতে অনেকেই বাধ্য হন। বাধ্য হয়ে এভাবে নিতে হলে আমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করি। যেহেতু এটা আসলেই গোনাহের কাজ। আল্লাহ যেনো আমাদের এই অপারগতাটুকু ক্ষমা করেন। তাই আমি উদাত্ত আহ্বান জানাবো, যারা স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠান আছেন, একজন মুসলিম হিসেবে একটা ইসলামিক প্রোগ্রামে এমন কিছু যেনো না দেন, যা দর্শক ভালোভাবে নেবে না।
প্রিয়.কম : এই রকম পরিস্থিতিতে ইসলাম মতে কতটুকু ছাড় দেয়া যায়?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : আমি বলবো, এই পরিমণ্ডলে একটা আগাছা তৈরি হয়েছে। আমরা জানি যে, এখানে একটা সুন্দর পথ তৈরি হতে পারে। কিন্তু আগাছা যদি পরিষ্কার কেউ না করেন, তবে তো এ পথে হাঁটা সম্ভব নয়। তো আগাছার পরিষ্কার করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে নামতে হচ্ছে। আমরা বর্তমানে সেখানেই আছি। আমরা দোয়া করি যেনো অচিরেই পরিবেশটা সুন্দর হয়ে আসে।
প্রিয়.কম : যদি কারও আকিদা ভ্রান্ত হয়, তার স্পন্সর নিয়ে ইসলামিক প্রোগ্রাম করা যাবে কি না?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : আমার কাজ হলো একটা ইসলামিক প্রোগ্রাম করা। ইসলামিক প্রোগ্রামের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা। হ্যাঁ, এমন কোনো প্রতিষ্ঠান আসতে পারে, যার আকিদা ভ্রান্ত, কিংবা তিনি হয়তো মুসলিম নন। এখানে কিন্তু সবকিছুই নিয়তের ওপর নির্ভর করে। আমরা দেখেছি, রাসুলের [সা.] আমলে জাকাতের অর্থ অমুসলিমদেরও দেয়ার বিধার ছিলো, যাতে করে তারা ইসলামের সৌন্দর্য দেখে, উদারতা দেখে এবং ফলশ্রুতিতে তারা যেনো ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এবার প্রশ্ন হলো, ইসলামিক প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে যদি ভ্রান্তি আকিদা পোষণ করেন কিংবা মুসলিম না হন, তার স্পন্সর আমরা নেবো কি নেবো না— এটা পুরোটাই মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। তিনি হয়তো একটা ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে একটা ইসলামিক প্রোগ্রামে অ্যাটেন্ড করেছেন। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিকোণটা কী ? এখানে প্রথম বিষয় হলো, তিনি নিশ্চয়ই এই প্রোগ্রামটা দেখবেন। আমরা যদি আমাদের প্রোগ্রামে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে পারি, তিনি যদি কথাগুলো শুনে বুঝতে পারেন যে, এতো চমৎকার জীবন-বিধান ইসলাম, তাহলে আমি কেনো সেই কাতারে শামিল হবো না! এমন হলে তো মনে হয়, সেটা আমাদের জন্যে সাওয়াবের কাজ হবে। এটাও একটা দাওয়াহ হয়ে যাবে।
প্রিয়.কম : আমরা কি তার অর্থ নেয়ার সময় তাকে বলবো যে, যদিও আপনার আকিদা সঠিক নয়, কিন্তু দাওয়াতের খাতিরে নিচ্ছি?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : এটার কি কোনো দরকার আছে? আমরা জানি যে, জাকাত দেয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধান আছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনি হয়তো বলে দিতে পারেন যে, আমি তোমাকে জাকাতের অর্থ দিলাম। আবার সর্বক্ষেত্রে বলতে নিষেধও করা হয়েছে, কারণ, তাতে তিনি কষ্ট পেতে পারেন। ঠিক এমনি করে দাওয়াতের পদ্ধতি অনুযায়ী আমার বলার দরকার নেই যে, ভাই, আপনি যা করছেন, তা ঠিক করছেন না। বরং এটা না বলে যদি আমার কথার মাধ্যমে এবং আমার কাজের মাধ্যমে তিনি বুঝতে পারেন যে, তিনি যেটা করছেন সেটা ঠিক হচ্ছে না, তাহলে তিনি আশা করা যায়, ফিরে আসবেন।
প্রিয়.কম : আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনি একজন আলেম হয়েও কেনো একটি প্রডাকশন হাউজ গড়ে তুললেন, এই প্রডাকশন হাউজ করার সময় আপনার ভেতকার প্রেরণাটা কী ছিলো?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : আমি লক্ষ্য করেছি, বর্তমান সময়টা চলছে মিডিয়ার সময় এবং বর্তমান যুগকে বলা হয় মিডিয়ার যুগ। আমাদের অনেক পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আছেন, তারা চমৎকারভাবে দারস দিয়েছেন। দেখা গেছে, তিনি বিশ বছর, ত্রিশ বছর বা পঞ্চাশ বছরের দারসের জীবনে হয়তো সাকুল্যে একলক্ষ ছাত্র তৈরি করেছেন। কিন্তু মিডিয়া হলো এমন একটি জায়গা, সেখানে যদি আমরা কাজ করতে পারি, তবে আমাদের দাওয়াতি কার্যক্রম এমনভাবে প্রচারিত হবে যে, যদি আপনি বাংলাদেশের চতুর্থ ক্যাটাগরির একটা চ্যানেলেও কথা বলেন, তবে ন্যূনতম দুই লক্ষ মানুষের কাছে আপনার কথাটা পৌঁছে যাবে। এ কারণেই আমি অনুধাবন করলাম যে, দাওয়াতি কাজে মিডিয়ার কোনো বিকল্প নেই এবং এই দাওয়াতি কাজের জন্যে আমাদের একটি প্রডাকশন হাউজ থাকা অপরিহার্য; যেখান থেকে আমরা নিজেরাই কিছু প্রোগ্রাম নির্মাণ করে এই দাওয়াতি কাজে অংশগ্রহণ করতে পারবো। আলহামদুলিল্লাহ, এর ফলাফলও আমরা পাচ্ছি। আমরা প্রচুর সাড়া পেয়েছি। আপনারা শুনলে অবাক হবেন, যখন আমরা প্রশ্ন–উত্তরের কোনো লাইভ প্রোগ্রাম করতাম, কিংবা এখনও যখন কোনো প্রোগ্রাম করি, দেখা যায় যে, প্রোগ্রাম চলাকালে প্রত্যেকটা চ্যানেল থেকে বলা হয়— অন্যান্য প্রোগ্রামে আমরা যে রেসপন্স পাই, তার চাইতে বহুগুণ রেসপন্স পাওয়া যায়, যখন ইসলামিক প্রোগ্রাম হয়। এই চিন্তা-ভাবনা থেকেই আমাদের প্রডাকশন হাউজ তৈরি করা।
প্রিয়.কম : যারা ইসলামিক মুভি বা ডকুমেন্টারি বানায় কিংবা ইসলামিক প্রোগ্রাম নির্মাণ করে, আপনার কথা থেকে ইতোমধ্যে আমরা বুঝেছি যে, এর ব্যবসাটা হালাল। এ বিষয়ে আমাদের প্রশ্ন হলো, এই ব্যবসার ক্ষেত্রে ইসলামের নির্ধারিত কোনো সীমা-পরিসীমা আছে কি না? যেমন দেখা যায়, কেউ একটা ইসলামি বই লিখলো, প্রকাশক তাকে সামান্য অর্থ ধরিয়ে দিয়ে বছরের পর বছর ব্যবসা করে যাচ্ছেন।…
মুফতি সাইফুল ইসলাম : ব্যাপারটা হলো, আপনি যদি হালালভাবে কোনো কাজ করেন, তার সাথে যদি ইবাদত জড়িত হয় এবং তার সাথে যদি অর্থনৈতিক বিষয়ও জড়িত থাকে, তাহলে এখানে হারাম হওয়ার কিছু নেই— সেটা আমরা আগেও বলেছি। যেমন— যারা হজের খিদমত করছেন, আমরা দেখছি, তারা হাজিদের সেবা করছেন, সেবার পাশাপশি কিন্তু অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হয়ে থাকেন। এখন ইসলামিক মুভির কথা বলেন, কিংবা ইসলামিক ডকুমেন্টারির কথা বলেন বা ইসলামিক প্রোগ্রামের কথাই বলেন, এ ব্যাপারে তারা যদি দাওয়াতের পাশাপাশি অবশ্যই ব্যবসায়িক চিন্তা-ভাবনা থেকে করতেই পারেন। এখানে তো আমরা হারাম হওয়ার কিছু দেখি না। যেমন— যারা বইয়ের ব্যবসা করেন, সেখানে একজন লেখক, তিনি তো লিখে থাকেন দাওয়াতের উদ্দেশ্যেই, তিনি কি সম্মানী নিচ্ছেন না ? প্রকাশনী ব্যবসা করছে না? এটা কি তার জন্যে হারাম হবে?
তবে একটা কথা না বললেই নয়, এই ব্যবসার ক্ষেত্রে ইসলাম কোন জিনিসটা আমাদের সামনে মৌলিক ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। সেটা হলো, ব্যবসা বললেই, বা চুক্তি বললেই এখানে দুটি পক্ষ শামিল হয়। ইসলামের বক্তব্য হলো, কোনো পক্ষ যেনো ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। উভয় পক্ষই যেনো লাভবান হয়, উইন উইন সিচুয়েশানে থাকে। এবং তাদের মধ্যে যেনো সবসময় সন্তুষ্টির বিষয় লক্ষ্যণীয় থাকে| অর্থাৎ ব্যবসার ক্ষেত্রে সবার স্বার্থের দিকেই লক্ষ রাখতে হবে।
প্রিয়.কম : বাংলাদেশে যেসব ইসলামিক অনুষ্ঠান নির্মিত হচ্ছে, সেগুলো দেশের অন্য জেনারেল অনুষ্ঠানের তুলনায় কোন পর্যায়ে আছে ? একই সাথে আমাদের দেশে যে ইসলামিক প্রোগ্রাম হচ্ছে, সেগুলো অন্যান্য দেশের ইসলামিক প্রোগ্রামের তুলনায় মানের বিবেচনায় কোন অবস্থানে আছে?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : ধন্যবাদ দারুণ একটা প্রশ্ন করেছেন। আমাদের দেশে বেশ কিছু ইসলামিক ডকুমেন্টারি হয়েছে, ভালো কিছু ইসলামিক নাটক হয়েছে, এখন ইসলামিক বড় বড় রিয়েলিটি শো হচ্ছে। তবে বেশি হয় ইসলামিক টকশো। টকশোর বিষয়ে বলবো, সর্বক্ষেত্রে নয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনও মানসম্মত প্রোগ্রাম তৈরি হয় নি। এ ছাড়া অন্যান্য প্রোগ্রামের কথা যা আমরা বললাম, ইসলামিক ডকুমেন্টারি, ইসলামিক নাটক, ইসলামিক রিয়েলিটি শো— সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ প্রোগ্রামের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। আমরা যদি রিয়েলিটি শো’র কথা যদি বলি, বাংলাদেশে আলহামদুলিল্লাহ বেশ কিছু রিয়েলিটি শো হয়, হাফেজে কোরআনদের নিয়ে কিংবা ‘আলোকিত জ্ঞানী’র কথা বলেন, আল্লাহর মেহেরবানীতে এগুলো কেনো অংশে জেনারেল প্রোগ্রামের চাইতে কম নয়; বরং অনেক অংশে আরও আগানো। আর আন্তর্জাতিক বিবেচনায় যদি বলেন, তবে আমি আমাদের আলোকিত জ্ঞানী’র কথা বলবো, এই প্রোগ্রামটা করার আগে আমরা সার্চ করে দেখেছি কোথায় কী হচ্ছে না হচ্ছে। আমাদের প্রোগ্রামের সাথে খুব একটা মিল কোথাও দেখি নি। শুধু পাকিস্তানভিত্তিক চ্যানেলে একটা শো আমি দেখেছি, তবে আলহামদুলিল্লাহ, সে-তুলনায় আমাদের প্রোগ্রাম অনেক ভালো হয়েছে। আমাদেরকে অনেকেই বলেছেন, আমাদের প্রোগ্রামের যে মান ছিলো এবং যে মেকিংটা ছিলো, তা ইন্ডিয়ান চ্যানেলে প্রচারিত প্রোগ্রামগুলোর চেয়ে কোনো অংশে কম হয় নি।
প্রিয়.কম : রাহবার মাল্টিমিডিয়া নিয়ে আপনাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে আমরা জানতে চাচ্ছি। ভবিষ্যতে আরও কী কী করার পরিকল্পনা আপনাদের আছে?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : রাহবার মাল্টিমিডিয়ার ভবিষ্যত সম্পর্কে এটাই বলবো, রাহবার যেনো রাহবার হয়েই থাকে। এটা যেনো সবসময় আমাদের সকলের জন্যে পথপ্রদর্শকের কাজ করে। আর পথপ্রদর্শক সে-ই হয়, যে আইডল হতে পারে। আমরা আল্লাহর কাছে তাওফিক চাই, যেনো রাহবার মাল্টিমিডিয়া সেইভাবে কাজ করতে পারে, সে যেনো আইডল হতে পারে এবং মিডিয়া জগতে তাকে যেনো ক্ষুদ্র খাদেম হিসেবে আল্লাহ কবুল করেন।
প্রিয়.কম : আমরা দেখেছি বিভিন্ন মুসলিম দেশে নবিদের জীবনী, ওলি-আউলিয়ার জীবনী এবং আমরা যাদের আকাবির বলি, তাদের জীবনী নিয়ে বিভিন্ন মুভি হয়েছে এবং শর্টফিল্ম হয়েছে। এভাবে তাদের জীবনী নির্ভর নাটক-ফিল্ম-মুভি নির্মাণ হওয়াকে আপনি কিভাবে দেখেন?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : আসলে ব্যাপারটা অনেক বড়। আমি অতিশয় ক্ষুদ্র একজন মানুষ। আমার জ্ঞান অতি নগণ্য। আমরা যখন মিডিয়াতে আসি, তখনও অনেকে ভালো চোখে দেখেন নি। অনেকেই অনেক মন্তব্য করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ, এখন এর জন্যে আমাদের অনেকেই ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। কিছু কিছু বিষয় আছে যা আমার মন থেকেই বলে এবং কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তি দেখলে সেটা আমরা গ্রহণ করি। কিন্তু সে-ক্ষেত্রে হ্যাঁ-না কোনোকিছু বলা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করি। আপনি যে প্রশ্ন করেছেন, সে ব্যাপারে বলবো, আমরা দেখেছি ইরান থেকে বিভিন্ন নবি-রাসুলদের জীবনীর ওপর ভিত্তি করে এবং আকাবিরের জীবনীকে নির্ভর করে তারা মুভি তৈরি করেছেন, ডকুমেন্টারি বানিয়েছেন এবং আরও করছেন। কাতার ভিত্তিক একটি চ্যানেলে আছে এমবিসি, তারা হজরত ওমর [রা.]-এর জীবনীর ওপরে ব্যয়বহুল একটি টিভি সিরিয়াল করেছেন, যার নামই রাখা হয়েছে ‘ওমর’। আমি তাদের কিছু পর্ব দেখেছি, হাদিসের ভাষ্যমতে যেভাবে এসেছে হুবহু তারা সেভাবেই নির্মাণ করার চেষ্টা করেছেন। এর আগে তারা একটি ফতোয়াও প্রকাশ করেছেন, সেখানে কাতারের ‘আল-হাইয়াতুল কিবারুল উলামা’ অর্থাৎ কাতারের যে উচ্চ ওলামা পরিষদ আছেন, তারা সেটা সার্টিফাই করে অনুমোদন দিয়েছেন। এরপরেই সেটা প্রচারিত হয়েছে। মিশরের ইউসুফ আল-কারজাবিরও সেখানে স্বাক্ষর রয়েছে বলে শুনেছ। যদিও সৌদি ওলামায়ে কেরাম সেখানে দ্বিমত করেছেন। তাই এটা একটা বড় বিষয় হওয়ার কারণে এ বিষয়ে নীরবতা পালন করাই আমি ভালো মনে করি। তবে একজন ক্ষুদ্র মুসলিম হিসেবে আমি বলবো, খুব সেনসেটিভ বিষয়ে যাওয়ার আগে আমাদের শতবার চিন্তা করা উচিত। কিন্তু আজকাল নাস্তিকতার বিষয়গুলোর যেভাবে প্রচারণা চালানো হয় এবং যেভাবে মানুষের মগজ ধোলাই করা হয়, তাতে দাওয়াতের ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন আনা উচিত বলে আমি মনে করি। যেমন— ইসলামের অনেক সৌন্দর্য আছে, সেটাকে যদি আপনি কথায় বলেন, তার চাইতে অনেক বেশি দর্শক গ্রহণ করবে, যদি সেটাকে নাটকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়, যদি ভিজুয়ালাইজ করা হয়। এমন অনেক বিষয় আছে। সুতরাং খুব চিন্তা-ভাবনা করেই আমাদের অগ্রসর হওয়া উচিত।
প্রিয়.কম : অর্থাৎ সেনসেটিভ বিষয়গুলো বাদ দিয়ে আমাদের নাটক বা শর্টফিল্মের দিকে গেলেই মনে হয় ভালো হয়…
মুফতি সাইফুল ইসলাম : হ্যাঁ, এভাবে আল্টিমেট অনেকেই গিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও যাবেন। কারণ আপনি এক মিনিট, দুই মিনিট বা তিনমিনিটের মধ্যে একজন দর্শককে যে ম্যাসেজ দিতে পারছেন, আপনি আধঘণ্টা আলোচনা করেও সেই ম্যাসেজটা দিতে পারছেন না।
প্রিয়.কম : অভিনয় সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : সার্বিকভাবে আপনি যদি অভিনয়ের কথা বলেন, তাহলে আমাদের জীবনের অনেক ক্ষেত্রে আমরা আসলে অভিনয় করেই যাচ্ছি। যেমন— ইমাম মালিক [রহ.]-এর একটি ঘটনা আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে যে, তিনি মসজিদে নববিতে বসে হাদিসের দারস দিচ্ছেলেন, সে-মুহূর্তে তার পিঠে একটা বিষাক্ত বিচ্ছু অনেকগুলো কামড় দিয়েছিলো। কিন্তু তিনি একটিবারের মতোও উহ-আহ করেন নি। বরং তিনি পুরো দারস শেষ করেছেন। রাসুলের [সা.] হাদিসের সম্মানে তিনি এমন করেছেন বলে পরে প্রকাশ করেছেন। এই যে সেই মুহূর্তে তিনি তার অবস্থাটা প্রকাশ করেন নি, সেটা কিন্তু আমাদের বর্তমান ভাষায় এক ধরনের অভিনয়ই ছিলো। আপনি একজনকে একটা ম্যাসেজ দিতে গেলে আপনাকে তো অঙ্গভঙ্গী করে দেখাতে হয়। অভিনয়টা তো প্রকাশের একটি ভাষা। আমি যা কথায় বলছি, সেটাই আমি অভিনয় করে দেখাচ্ছি। যেমন— সুদাইসির সুরে কোরআন তেওলাওয়াত করছেন, এটা কিন্তু একটা অভিনয়ই হচ্ছে। অর্থাৎ তার মতো করে আমি পড়ছি। বা যেসব সম্মানিত ওয়ায়েজগণ মাহফিল করেন, তারাও তো অনেকটা সুর দিয়ে অভিনয় করেই মাহফিল করেন। সমস্যাটা হচ্ছে, অভিনয় শব্দটা বললেই আমাদের দর্পণে কিছু সিনেমা-নাটকের দৃশ্য চলে আসে, তাই আমরা সেভাবে চিন্তা করি। কিন্তু যদি আমরা পজিটিভলি ব্যাপারটা দেখি, তাহলে আমার মনে হয়, আসলে আমরা সবাই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে অভিনয় করে থাকি। আপনার মন খারাপ, কেউ যখন জিজ্ঞেস করছে— ভাই কেমন আছেন? আপনি কিন্তু নিজের অবস্থা লুকিয়ে মিষ্টি হেসে বলছেন— আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর মেহেরবানীতে ভালো আছি। এটা কি অভিনয় নয়? এটা তো ইসলাম নিষেধ করে নি।
প্রিয়.কম : কেউ যদি কোনো ইসলামিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে সেই মিডিয়ার আকার-অবয়ব লক্ষ-উদ্দেশ্য কেমন হওয়া উচিত?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : অবশ্যই ইসলাম ভিত্তিক হওয়া উচিত। তিনি যা-ই করবেন, ইসলাম ভিত্তিক করবেন, শরীয়া ভিত্তিক করবেন। কারণ তিনি করবেন ইসলামিক মিডিয়া, সুতরাং তার তো শরীয়ার বাইরে যাওয়ার কোনো পথ নেই।
প্রিয়.কম : একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি। টিভি মিডিয়া জগতে আপনার বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে এবং তা আমরা নিজেরাও উপভোগ করেছি। হঠাৎ যখন অপরিচিত কেউ এসে আপনাকে বলে— ভাই, আমি আপনার অমুক প্রোগ্রাম দেখে উপকৃত হয়েছি, কিংবা আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, তখন আপনার কেমন লাগে?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : আমি আসলে নিতান্ত তুচ্ছ ও নগণ্য একজন মানুষ। শুধু টুকটাক খেদমত করার চেষ্টা করছি। আমার তেমন ইলম নেই। আমল নেই। যোগ্যতা নেই। সামান্য কথা বলার প্রয়াস পাচ্ছি আল্লাহর মেহেরবানীতে। নয়তো এটা সম্ভব হতো না। এরপরেও যখন কোনো ভাই আমাদের কথা শুনে আমল করেন এবং তার জীবনকে পরিবর্তন করেন, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শুকরিয়া আদায় করার ভাষা খুঁজে পাই না। যেমন— আমার জীবনে এমন ঘটনা ঘটেছে, আমি কখনো সেটা ভুলবো না। সে-সময় আমাদের একটা নিয়মিত প্রোগ্রাম হতো ‘আল-কোরআনের সহজ সরল অনুবাদ’। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমি চেষ্টা করেছিলাম কোরআনকে সহজভাবে তুলে ধরার। ইসলামিক টিভিতে প্রোগ্রামটা চলতো। যখন ইসলামিক টিভি বন্ধ হয়ে যায়, এক নারী দর্শক আমাকে ফোন দিয়েছিলেন এবং তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন— ভাই, আমার বিয়ে হয়েছে ১৩ বছর। আমার কোনো সন্তান নেই। আমি শিক্ষকতা করি। আমি বাসায় এসে ইসলামিক টিভি অন করতাম এবং আপনাদের ‘জেনে নিন’ অনুষ্ঠান ও ‘আল-কোরআনের সহজ সরল অনুবাদ’ এই দুটি প্রোগ্রাম কিছুতেই মিস করতাম না। এই প্রোগ্রামগুলো যখন চলতো, তখন মনে হতো, আমারা সন্তান যেনো ঘরে দৌড়-ঝাঁপ করছে, হাসি-কান্না করছে। আমি যেখানেই থাকতাম অনুষ্ঠানের সময় আমি টিভি অন করে রাখতাম। এটাকে আমি আমার সন্তান মনে করতাম। এখন আপনাদের প্রোগ্রামগুলো আমি দেখতে পাই না, বলুন— এখন আমি কিভাবে বাঁচবো? মহিলার এই কথাটা শুনে সত্যি কথা বলতে কি আমার চোখ থেকে তখন দরদর করে পানি গড়িয়ে পড়ছিলো। আল্লাহ তায়ালার দরবারে শুকরিয়া আদায় করেছিলাম যে, হে রাব্বুল আলামিন, এমনও দর্শক আমাদের আছেন, যারা এইভাবে প্রোগ্রামগুলো দেখেন।
আরেকজন দর্শকের কথা না বললেই নয়, যিনি সাতক্ষীরার অধিবাসী। তিনি ছিলেন লন্ডন প্রবাসী। আমরা একটা প্রোগ্রাম করেছিলাম সে-সময়ে ‘তিলাওয়াতুল কুরআন’ নামে। এই প্রোগ্রামে আমরা তিলাওয়াত প্রচার করতাম। অনুবাদ স্ক্রলে ভাসতো। আব্দুর রহমান আস-সুদাইসির সুললিত কণ্ঠে তিলাওয়াতটা হতো। ইসলামিক টিভি এটা দিয়ে সকাল 6 টায় তাদের অনইয়ার শুরু করতো। একসময় অর্থনৈতিক কারণে প্রোগ্রামটা চালাতে পারি নি। পরবর্তীতে সাতক্ষীরা থেকে সেই ভদ্রলোক আমার সাথে ঢাকায় এসে সাক্ষাৎ করেন। তিনি আমাকে বললেন— আমি যখন লন্ডন থেকে আসি, আমার জীবন অন্যরকম ছিলো। বিশ্বাস করুন, আমরা প্রতিদিন আমাদের দিনটা শুরু করতাম ‘তিলাওয়াতুল কুরআন’-এর মাধ্যমে। আমি, আমার স্ত্রী, আমার সন্তান সবাই একসাথে বসতাম। ‘তিলাওয়াতুল কুরআন’ প্রোগ্রামটা আমরা একসাথে দেখতাম, এরপর আমরা বাসা থেকে বের হতাম। আপনাদের প্রোগ্রামটা বন্ধ হওয়ার পরে মনে হচ্ছে যে, আমি বিরাট একটা কিছু হারিয়ে ফেলেছি। তিনি বলেছেন যে— আমাকে একটা সিডি সংগ্রহ করে দেন, যা টাকা লাগবে আমি দেবো। আমরা তাকে পুরো ভলিয়মের সিডিটা দিয়েছিলাম। তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন এবং ফোন করে বলেছিলেন যে, আপনাদের জন্যে এবং আপনাদের রাহবারের সবার জন্যে আমরা সবাই দুই রাকাত নামাজ পড়ে দোয়া করেছি। আমরা মনে করি, এটাই হলো আমাদের সফলতা এবং এটাই হলো আমাদের সর্বোচ্চ পাওনা। কারণ এর যোগ্য আমরা নই।
প্রিয়.কম : রাহবার মাল্টিমিডিয়া লিমিটেডের সবচে’ বড় অনুষ্ঠান ‘আলোকিত জ্ঞানী’। এই অনুষ্ঠান আয়োজনের নেপথ্য কথা এবং এর সূচনা ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কিছু বলুন।
মুফতি সাইফুল ইসলাম : আমার জানামতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম যে ইসলামিক রিয়েলিটি শো হয়, সেটা হয় ইসলামিক টিভিতে, সম্ভবত ২০০৮ সালে। নাম ছিলো ‘কুরআনিক চ্যালেঞ্জ’। ওই প্রোগ্রামটির উপস্থাপনা আল্লাহর মেহেরবানীতে আমিই করেছিলাম। এটা একটা মেগা রিয়েলিটি শো ছিলো। পরবর্তী সময়ে প্রোগ্রামটা আর নিয়মিত হয় নি। এরপরে আমরা দেখেছি যে, অনেক ভাইয়েরা এগিয়ে এসেছেন এবং তারা হাফেজদেরকে নিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রাম করছেন। আপনি দেখবেন বিভিন্ন চ্যানেলে প্রায় পাঁচ-ছয়টা একই ধরনের প্রোগ্রাম হচ্ছে। আমাদের কাছেও এমন প্রস্তাব ছিলো যে, আমরা যদি হাফেজদের নিয়ে প্রোগ্রাম করি, তবে স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত আছে, তারা সহযোগিতা করবেন। কিন্তু আমরা ভেবেছি ভিন্ন কথা। কারণ, একই প্রোগ্রাম বারবার করাটা দর্শকদের জন্যে বিরক্তির কারণ হতে পারে। সুতরাং আমরা এমন একটা প্রোগ্রাম করবো, যেটার মাধ্যমে দাওয়াহ হবে, বিনোদন হবে এবং যার মাধ্যমে আমরা কিছু শিখতে পারবো। যা একটু ভিন্নতর হবে। এই চিন্তা-ভাবনা থেকে আমরা প্রায় দুই বছর গবেষণা করে অবশেষে আমি এবং রাহবার মাল্টিমিডিয়া লিমিটিডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব ইকবাল ভাই, আমরা এই দুই ভাই মিলে এবং আরও কিছু ভাইদের নিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, আমরা এমন কিছু করবো, যা জ্ঞান ছড়াবে। আমরা এর জন্যে নাম নির্বাচন করি ‘আলোকিত জ্ঞানী’। পরবর্তীতে আপনারা দেখেছেন যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা বৃহৎ পরিসরে আমরা প্রোগ্রামটা সম্পন্ন করেছি। যে বিপুল সাড়া আমরা পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ। অনেক ইউনিভার্সিটির শিক্ষক আমাদেরকে ফোন দিয়ে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তারা বলেছেন যে, এই প্রোগ্রামটা যখন শুরু হয়, তখন তারা সবকিছু বাদ দিয়ে একমনে বসে অনুষ্ঠানটা দেখেছেন, জ্ঞান আহরণ করেছেন এবং উপভোগ করেছেন।
সেখান থেকেই আমাদের পথচলা শুরু হয়। এই প্রোগ্রামটা প্রথম বছর করতে গিয়ে অবশ্য আমাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে। দ্বিতীয় বছরও আলহামদুলিল্লাহ সমাপ্ত করেছি। বড় একটা কাজ করতে গিয়ে বহু ঝক্কি-ঝামেলা এবং অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি হয়। এরপরও আল্লাহর অশেষ করুণায় আমরা এগিয়ে যেতে পারছি। এজন্যে আল্লাহর শোকর আদায় করি। একই সাথে আমাদের স্পন্সরকারী প্রতিষ্ঠান যারা আছেন, তাদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। তারা সময়মতো এগিয়ে এসেছেন। নয়তো এতো বিশাল একটা কাজ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। মিডিয়াতে আমরা সুন্দরভাবে প্রচার করতে পেরেছি, সে-ক্ষেত্রে আপনারও এগিয়ে এসেছেন। প্রিয়.কম এই অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার ছিলো। আপনাদেরকেও আমাদের পক্ষ থেকে মোবারকবাদ জানাই।
প্রিয়.কম : সময়ের প্রেক্ষিতে মিডিয়ার পট পরিবর্তন হয়েছে। একসময় আমরা মিডিয়া বলতে ছোট একটা পরিমণ্ডলকে বুঝতাম, এখন সেটা অনেক বিশাল হয়ে গেছে। এই সময়ে আমরা দেখছি, পুরো মিডিয়া জগত ভার্চুয়াল পৃথিবীমুখী হচ্ছে। আপনাদের টোটাল কার্যক্রমগুলো তো ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকেন্দ্রিক। তো মিডিয়ার রূপ পরিবর্তনের সাথে আপনাদের প্রডাকশনের রূপ পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : আমি আগেই বলেছি যে, রাহবার মানে পথপ্রদর্শক। আমাদের কাজ হবে, সময়ের সাথে নয়, সময়ের আগে পথচলার চেষ্টা করা। কারণ আমরা মুসলিম। মুসলিমদের অভ্যাস, তারা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় নষ্ট করবে না; সময় দেখে ঘড়ি সৃষ্টি করবে। আমরা চেষ্টা করবো, দাওয়াহর যতগুলো পথ আছে, হয়তো আমরা নিজেরা সেই পথে চলবো। আর সেটা না পারলে অন্তত আমাদের আশেপাশে যে ভাইয়েরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছেন, তাদের জন্যে একটা প্লাটফর্ম তৈরি করে দেয়ার চেষ্টা করবো। যেনো একেকজন একেক পথে কাজ করলেও সবার সাথে আমাদের একটা সম্পর্ক থাকে। সবাই মিলে যেনো আমরা একটা পরিবারভুক্ত হতে পারি। যেহেতু কোনো বড় কাজ একা করা সম্ভব হয় না; সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে কাজটা সম্পাদন করতে হয়।
প্রিয়.কম : আমাদের বড়দের কেউ কেউ বলেন, নিজস্ব স্বতন্ত্র মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করে কাজ করা উচিত। কেননা, অন্যদের মধ্যে গিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে অনেক ধরনের সমস্যা পোহাতে হয়। আপনি কী বলেন, অন্য মিডিয়ায় গিয়ে কাজ করা ভালো, নাকি নিজেরা স্বতন্ত্র মিডিয়া নির্মাণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ভালো?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : আমাদের বড়রা যে কথাগুলো বলেন, অনেক চিন্তাপ্রসূত বিষয় থেকেই তারা বলেন। অবশ্য তারা যে কথাগুলো বলেন, সেটা যেমন সত্য, ঠিক এমনি করে এটাও দরকার যে, অপেক্ষা না করে কাজ শুরু করে দেয়া। আমরা বলবো, উভয় পক্ষের কথাটাই ঠিক। আমাদের স্বতন্ত্র একটা মিডিয়া জগত যেমন থাকা দরকার, পাশাপাশি অন্যান্য মিডিয়া লাইনেও আমাদের কাজ করা দরকার। কেনো? কারণ, আপনি যখন একটা মসজিদে কথা বলবেন, তখন কেবল মুসলিমরাই আপনার কথা শুনবে; যেহেতু অমুসলিমরা আপনার মসজিদে যাবেন না। কিন্তু আপনি যখন কোনো ময়দানে বা কোনো অমুসলিমদের প্রোগ্রামে কথা বলবেন, সেটা যদি দীনের কথা হয়, তবে সেখানে আপনি অমুসলিমদের মাঝেও দীনের কথাটা ছড়িয়ে দিতে পারলেন। আমাদের অনেক দর্শক আছেন, তারা হয়তো ইসলামিক চ্যানেল বা মিডিয়া শুনলে সেদিকে না-ও তাকাতে পারেন। কিন্তু তিনি যদি একটা জেনারেল চ্যানেল দেখেন, আর সেখানে আমি ইসলামের কথা বলতে পারি, তাহলে তো আমার দাওয়াতি কাজটা আরও ছড়িয়ে পড়লো। তাই দুটো দিকই ঠিক আছে।
প্রিয়.কম : ইসলামিক প্রোগ্রাম এবং অনৈসলামিক প্রোগ্রাম— এই দুটিকে কিভাবে আমরা চিহ্নিত করতে পারি ? যেমন শাইখ সিরাজ কৃষি নিয়ে প্রোগ্রাম করছেন। আপনি কী বলবেন, এটা অনৈসলামিক প্রোগ্রাম?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : আপনি খুব ভালো একটি প্রশ্ন করেছেন। ইসলাম মানে হলো এমন একটি জীবন বিধান, যা তার কথাই বলে, যা ভালো এবং কল্যাণকর। তাই আপনি কোরআনে কারিমের দিকে তাকালে দেখবেন, ঈমানের সাথে একটা শর্ত আল্লাহ তায়ালা বারবার জুড়ে দিয়েছেন, সেটা হলো ‘ভালো কাজ’। তিনি বলেছেন— তারাই ঈমানদার, যারা ভালো কাজ করে। সুতরাং যেই কাজটাই দেখবেন ভালো, যেই প্রোগ্রামটাই দেখবেন ভালো, সেটা আপনি অনৈসলামিক বলতে পারেন না।
প্রিয়.কম : সুদীর্ঘ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ?
মুফতি সাইফুল ইসলাম : ব্যতিক্রমধর্মী এমন একটি উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাচ্ছি এবং প্রিয়.কমকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
সৌজন্য : প্রিয়.কম

You Might Also Like