আইএস ঘাঁটি গাড়তে পারবে না বাংলাদেশে

আমীন আল রশীদ : আমীন আল রশীদবাংলাদেশে বেশ কিছু হত্যা ও হামলার দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস। তাদের অনলাইন ম্যাগাজিন ‘দাবিক’-এর সবশেষ (সংখ্যা ১৫, প্রকাশ ৩১ জুলাই, ২০১৬) সংখ্যায় তারা গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে হামলাসহ আরও কিছু ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। যেমন- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, টাঙ্গাইলে দর্জি, নাটোরের বনপাড়ায় সুনিল গোমেজ নামে এক খ্রিস্টান, ঝিনাইদহের সোনাখালি গ্রামের নলডাঙ্গা মন্দিরের পুরোহিত অনন্ত গোপাল গাঙ্গুলি হত্যাকাণ্ড।
এর আগে ১৪তম সংখ্যায় (প্রকাশ ১৩ এপ্রিল, ২০১৬) তারা পঞ্চগড়ে সন্ত গৌরীয় মঠের পরিচালক জোগেশ্বর রায়, হিন্দু ব্যবসায়ী তরুণ দত্ত, ঝিনাইদহের হোমিও চিকিৎসক এবং ইসলামী ঐক্য আন্দোলন নেতা শিয়া মতাবলম্বী হাফেজ আবদুর রাজ্জাক খানকে হত্যার দায় স্বীকার করে। ১৩তম সংখ্যায় (প্রকাশ ১৯ জানুয়ারি, ২০১৬)দাবি করা হয়, আইএস-এর নিরাপত্তা ইউনিট দিনাজপুরে ইতালির নাগরিক পিয়েরো পারোলারিকে হত্যাচেষ্টা করে। এছাড়া তারা রংপুরে বাহাই সেন্টারের পরিচালক রুহুল আমিন, রংপুরে আওয়ামী লীগ নেতা রহমত আলী এবং ইসলাম থেকে খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে ঝিনাইদহের হোমিও চিকিৎসক সামির আল দিনকে হত্যা করেছে। বগুড়ায় শিয়া মসজিদ এবং বাগমারায় কাদিয়ানি মসজিদে হামলার দায়ও তারা স্বীকার করে নেয়।
এর আগে ১২তম (প্রকাশ ১৮ নভেম্বর, ২০১৫) সংখ্যায় ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলা, জাপানী নাগরিক কুনিও হোশি হত্যা এবং হোসনি দালানে বোমা ও পুলিশ চেকপোস্টে হামলার দায় স্বীকার করে আইএস।
তবে অনেকেই সন্দেহ করেন যে, এসব ঘটনা সরাসরি আইএস -এর কর্মীরা না ঘটালেও, নিজেরাই এর দায় স্বীকার করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়তে চেয়েছে।
কারণ আইএসের সামরিক ফ্রন্টের বাইরে দ্বিতীয় বৃহত্তম যুদ্ধক্ষেত্র হচ্ছে তাদের প্রচার বা প্রোপাগান্ডা ফ্রন্ট। নিজেদের সৈনিকদের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য দাবিক সব সময়ই এমন সব কথাবার্তা লেখে যাতে সংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এটা মনে করে যে, তারা অনেক শক্তিশালী একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে রয়েছে এবং তাদের লক্ষ্যে তারা পৌঁছাতে সক্ষম। তারা যাদের শত্রু মনে করে, তারাও যাতে এসব প্রোপাগান্ডায় বিভ্রান্ত হয় এবং ভীত হয়- সেটিও তাদের লক্ষ্য। যে কারণে দাবিকের সব খবরই যে সঠিক, এটি ভাবার কোনও অবকাশ নেই।
ইরাক ও সিরিয়ায় কথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার পথে বড় ধরনের হোঁচট খাওয়ার পর আইএস এখন বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে। ফলে নিজেদের পক্ষের যোদ্ধা ও বিশ্বব্যাপী তাদের অনুসারীদের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য আইএস এখন দাবিকের মাধ্যমে এটি বলার চেষ্টা করছে যে, এখান থেকে পিছু হটলেও তারা আরও বড় মিশন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
যেহেতু বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ সুন্নি মুসলমান এবং যেহেতু এখানে তাদের মতাদর্শের জঙ্গি সংগঠন ও কট্টর ইসলামিস্ট রাজনৈতিক দল আছে, তাই বাংলাদেশকে ঘিরে বার্তাটি প্রচার করলে তা অপেক্ষাকৃত বেশি বিশ্বাসযোগ্য হবে বলে তারা হয়ত মনে করে।
তবে এটি দৃঢ়ভাবে বলা যায় যে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার ও ভারতে আইএস ঘাঁটি গাড়ার চেষ্টা করলেও বাংলাদেশে তাদের কথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সফল হবে না। এর কারণ বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান ও ভূমিবিন্যাস সশস্ত্র বিদ্রোহীদের জন্য অনুকূল নয়। বড় ধরনের সশস্ত্র তৎপরতা চালানোর জন্য বসতিহীন, জনমানবহীন বিশাল ভূমি এখানে নেই। কিছু পাহাড় ও জঙ্গল থাকলেও সেখানেও জনবসতি আছে। ফলে লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যে ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজন, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে তা কঠিন। যে কারণে পাহাড়ে, দুর্গম চরে বা জঙ্গল থেকে অনেক জঙ্গিতে আটক করা হয়েছে এবং প্রায়ই এসব জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলে।
কোনও বিদেশি নাগরিক যেমন আইএস বা এরকম জঙ্গি গোষ্ঠীর বিদেশি প্রশিক্ষকের বাংলাদেশে লুকিয়ে থাকা বা জনগণের সঙ্গে মিশে যাওয়া সম্ভব নয়। এত বেশি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে যেকোনও অপরিচিত লোকই দ্রুত চিহ্নিত হয়ে যাবে।
বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ সুন্নি মুসলমান হলেও তারা কোনও ধরনের কট্টরপন্থার সমর্থন করে না। একটা গোষ্ঠী ইসলামিক রাজনীতির পক্ষে বা ইসলামি অনুশাসনের পক্ষে সমর্থন দিলেও জঙ্গিগোষ্ঠী বা সশস্ত্র সংগঠনের পক্ষে দাঁড়াবে বা ন্যূনতম সমর্থন দেবে-এটি ভাবার কোনও অবকাশ নেই।
স্থানীয় রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থন ছাড়া এখানে আইএস তাদের মতাদর্শ বিস্তৃত করতে পারবে না। জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা এরকম আরও যত সংগঠনই থাকুক না কেন, তারা যেহেতু মূলধারার রাজনৈতিক শক্তি নয়- সুতরাং এখানে আইএস-এর সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এমনকি জাময়াতে ইসলামীও যদি আইএসকে সমর্থন দেয়, তাতেও সম্ভব নয়।
স্থানীয় সশস্ত্র বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মদদ ছাড়াও আইএস তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত দুয়েকজন কর্মকর্তা এই আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে সশস্ত্র সংগঠনে যোগ দিলেও তার সংখ্যা একেবারেই নগন্য। সুতরাং তাদের পক্ষে কোনও সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব নয়।
প্রতিবেশী কোনও দেশের সহায়তা ও সমর্থন ছাড়া সশস্ত্র সংগঠন শুধু নিজেদের ওপর ভরসা করে বড় ধরনের তৎপরতা চালাতে পারে না। বাংলাদেশে এখন যেভাবে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো দমিত ও কোনঠাসা হয়ে আছে, ভবিষ্যতেও নতুন-পুরনো যারাই হোক না কেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি একই রকম হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে ভারত এই ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলেই বারবার আশ্বস্ত করেছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক ঐক্যও বাড়ছে।
ঐক্য বেড়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মধ্যে। ঐক্য ইস্যুতে বড় দুটি দলের মধ্যে এখনও কিছু পার্থক্য থাকলেও আশার কথা হলো উভয় দলই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান ঘোষণা করেছে। তাদের এই অবস্থান যদি লোক দেখানো না হয়, তাহলে এটি খুবই আশার কথা। কেননা বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ বাড়তে থাকলে সেই শূন্যতা অনেক সময় জঙ্গিরা পূরণ করে।
ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় থাকা ইস্যুতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে অনৈক্য বা মতের অমিল কিংবা বিরোধ- তা মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার কোনও দেশের মতো এতটা ভয়াবহ নয়। দেশের মানুষ বিশ্বাস করতে চায়, বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে যত দূরত্বই থাকুক, তারা কখনও আইএস-এর মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনকে বাংলাদেশে ঘাঁটি গাড়ার সুযোগ করে দেবে না। কারণ তারা এটি খুব ভালো করেই জানে যে, এখানে আইএস যদি সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করে ফেলে, তাহলে বিএনপি-আওয়ামী লীগেরও অস্তিত্ব থাকবে না। সুতরাং তারা নিজেদের স্বার্থেই এই ইস্যুতে প্রকাশ্যে না হোক, গোপনে অন্তত ঐক্যবদ্ধ থাকবে।
আইএস-এর মতো সংগঠনের বিকাশের পেছনে রাষ্ট্রে যে ধরনের বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি বা যুদ্ধপরিস্থিতি বিরাজমান থাকার কথা, বাংলাদেশে তা অনুপস্থিত এবং শিগগির সেরকম পরিস্থিতি তৈরির কোনও লক্ষণও নেই। সুতরাং আইএস-এর পক্ষে এখানে সুবিধা করা কঠিন। দেখা যাবে, আইএস সেসব দেশেই শক্তিশালী, যেখানের রাজনৈতিক দল, জনসাধারণ এবং সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশ তাদের পক্ষে রয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। এখানে বিচ্ছিন্নভাবে দুয়েকটি হামলা চালানো সম্ভব হলেও তথাকথিত খেলাফত আন্দোলন বা জিহাদ এ দেশের জনগণ মেনে নেবে না।
দুয়েকটি কট্টরপন্থি রাজনৈতিক দল আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযাগ রাখছে বলে শোনা গেলেও তারা এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি আছে বলেই আমরা জানি। সুতরাং এই নজরদারি এবং জঙ্গিবিরোধী অভিযান আরও ব্যাপক হলে দেশি হোক বা বিদেশি হোক-কোনও জঙ্গি সংগঠনই এখানে বড় ধরনের তৎপরতা চালানোর সাহস দেখাবে না।
তাছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জেএমবি, হুজি বা আইএস নামে যারাই জঙ্গি তৎপরতা চালাক না কেন, তাদের দমন করার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে; যা এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশও এ প্রশংসা করেছে। তবে সমস্যা হয়তো অন্য জায়গায়। তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নীতি হলো, আইএস ও আল-কায়েদা যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু এবং আত্মরক্ষার্থে বিশ্বের যেকোনও জায়গায় শত্রুর ওপর আঘাত হানার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। এই নীতির ভয়ংকর রূপ এখন আমরা দেখছি আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, সোমালিয়াসহ অনেক দেশে। সে হিসেবে আইএস ইস্যুতে বাংলাদেশের সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আরও বেশি সতর্ক এবং একসঙ্গে আরও বেশি কৌশলী হওয়ার কোনও বিকল্প নেই।
লেখক: সাংবাদিক
(বাংলা ট্রিবিউন)

You Might Also Like