‘দুরাত্মাকে মহাত্মা বানানোর এই চেষ্টা কেন?’

সুবিদ আলী ভূঁইয়াকে আমি ঘনিষ্ঠভাবে চিনি। তাঁর রাজনৈতিক সব মতামতের সঙ্গে সহমত পোষণ করি না। তিনি বিএনপি ছেড়েছেন বহু দিন হয়। এখন আওয়ামী লীগে আছেন। সুতরাং যখন জানলাম তিনি বলেছেন, ‘জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন,’ তখন বিস্মিত হয়েছি। বিএনপির রটানো এই ডাহা অসত্যটি তিনি কী করে বলেন? পরে জেনেছি তিনি এই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, এ কথা তিনি বলেননি।

আমার একটি ধারণা, বিএনপি রাজনীতিতে কোনো ইতিহাস সৃষ্টি করতে জানে না। ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করতে জানে। এই বিতর্ক সৃষ্টি করে জাতীয় রাজনীতির মূল ঐক্যের ভিত্তিটি ভাঙতে চায় এবং জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চায়। বিএনপির কর্তব্য আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করা। তাদের চেয়ে উন্নত রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়ে দেশের মানুষকে নিজেদের পক্ষে টানা। গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করা। তা না করে বিএনপি জন্মাবধি আঘাত করে চলেছে স্বাধীনতা অর্জনের মূল ভিত্তিগুলোয়। এটা কেবল আওয়ামী লীগের সঙ্গে শত্রুতা করা নয়। জাতির ও দেশের সঙ্গে শত্রুতা করা।
প্রতিটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের জাতীয় ঐকমত্যের একটি ভিত্তি আছে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রশ্নে পরস্পরের প্রচণ্ড বিরোধিতা করে, কিন্তু জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিগুলোকে আঘাত করে না বা তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে না। তারা জানে, তাতে দেশের ক্ষতি, জাতির ক্ষতি। ভারতে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, মহাত্মা গান্ধী জাতির পিতা, কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র জাতীয় আদর্শ। বিজেপির মতো একটি কট্টর সাম্প্রদায়িক দল ক্ষমতায় এসে এই জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি এখন পর্যন্ত ভাঙতে চায়নি। কংগ্রেসকে তারা ক্ষমতাছাড়া করেছে, এমনকি ভিটামাটিছাড়া করার চেষ্টা করছে। কিন্তু জাতির পিতাকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেনি। স্বাধীনতা অর্জনের মূল ভিত্তিটাকে আঘাত করেনি।
বাংলাদেশে বিএনপির আচার-আচরণ সম্পূর্ণ উল্টো। ক্ষমতায় এসেই শুধু আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার চেষ্টা নয়, আওয়ামী লীগের বিরোধিতার নামে স্বাধীনতার ও জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তার ওপর আঘাত হেনেছে। জাতির পিতা, স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান তো ক্ষমতা দখলের পর জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা বদলানোর চেষ্টা করেছিলেন। সৈয়দ আলী আহসান তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন, ‘জিয়াউর রহমান তাঁর সঙ্গে জাতীয় সংগীত বদলানো সম্পর্কে আলাপ করেছিলেন।’ কবি আল মাহমুদকে দিয়ে জাতীয় সংগীত লেখানো যায় কি না এমন কথাও তাঁর কোনো কোনো উপদেষ্টার কাছে তুলেছিলেন।
এই সামরিক শাসক কতটা মূর্খ ছিলেন, তার প্রমাণ, তাঁর উপদেষ্টা পরিষদের সভায় তিনি একবার বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তো হিন্দু ছিলেন, তাঁর গান কী করে আমাদের জাতীয় সংগীত হয়? তাঁর তখনকার এক উপদেষ্টা (দাউদ খান মজলিশ) তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না। ছিলেন ব্রাহ্ম এবং ব্রাহ্মরা একেশ্বরবাদী। আর তিনি যদি হিন্দুও হতেন, তাতে কী? হিন্দুরা কি বাংলাদেশের নাগরিক নয়? পাকিস্তানে কি করে ভারতের কবি হাফিজ জলন্ধরীর লেখা গান জাতীয় সংগীত হয়? জিয়াউর রহমানের এসব কথা জানা ছিল না। তাই তিনি চুপ করে গিয়েছিলেন।
এখন তো জানতে বাকি নেই, বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতার মর্মন্তুদ হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা চক্র প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা শুধু মুছে ফেলা নয়, জিয়াউর রহমানকেই বাংলাদেশের জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠাদানের চেষ্টা চালায়। এমনকি পাকিস্তানি মিডিয়ায় এমন কথাও বলা হয়, জিয়াউর রহমানই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকৃত স্থপতি। এ সময়ের একটি মজার ঘটনার কথা বলি। ঘটনাটির কথা বহু বছর আগে আমার একটি লেখায়ও উল্লেখ করেছি।
১৯৭৮ সালের ঘটনা। বিলেতেও তখন পাকিস্তানি মহল থেকে জোর প্রচারণা চালানো হচ্ছে, জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক এবং প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। এ সময় লন্ডনের এক মলে (বাকিংহাম প্যালেসের কাছে) ফরেন প্রেসের ক্লাবঘর ছিল। বিদেশি কাগজের সংবা“াতাদের জন্য এই ক্লাব। মাঝেমধ্যে আমিও যেতাম। একবার বেনজির ভুট্টো এই ক্লাবে সাংবাদিক সভা করেন।
সেই সভায় পাকিস্তানের ‘জং’ পত্রিকার তৎকালীন প্রতিনিধি তাঁর বক্তব্য দিতে গিয়ে হঠাৎ বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলেন, ‘জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের আসল স্থপতি। তিনি চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।’ আমি সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে বলি, ‘আমি এই ব্যাপারে একটি কথা বলতে চাই।’ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। কালুর ঘাট বেতারে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। তাতেই তিনি যদি বাংলাদেশের স্থপতি হন, তাহলে পাকিস্তানের আসল প্রতিষ্ঠাতা কে? শেরে বাংলা ফজলুল হক নন কি? তিনি ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর সম্মেলনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ঘোষণা করেন। তাহলে তাঁকেই কি পাকিস্তানের স্থপতি, এমনকি জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত নয়? মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে জাতির পিতা বলা হয় কী কারণে? সভায় হইচই পড়ে যায়। বেনজির ভুট্টোর হস্তক্ষেপে তা শান্ত হয়।
পাকিস্তানের গোয়েন্দা চক্রের নীলনকশা অনুযায়ী জেনারেল জিয়াউর রহমান মূলত বাংলাদেশের পাকিস্তানপন্থী কিছু নেতা ও তখনকার চীনপন্থী বামদের ভেতর থেকে কিছু বিভ্রান্ত ও সুবিধাবাদী ব্যক্তিকে জুটিয়ে তাঁর বিএনপি গড়ে তোলেন। পাকিস্তানের গোয়েন্দা চক্রের প্ররোচনাতেই জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক ও বঙ্গবন্ধুর চেয়েও বড় নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল। বিএনপির এই চেষ্টা ও এটা নিয়ে বিতর্ক জিইয়ে রাখার প্রয়াস সফল হয়নি। এখন নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি কে ছিলেন তা নিয়ে। আমি আগেই বলেছি, বিএনপি বিতর্ক সৃষ্টি ছাড়া বাঁচতে পারে না। এ ছাড়া রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য তার আর কোনো মূলধন নেই।
লন্ডনে বসে তারেক রহমান হঠাৎ ‘ইতিহাসবিদ’ সেজে পয়সা খরচ করে সভা ডেকে দাবি জানান, তাঁর পিতা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। আমার জানা মতে, লন্ডনে তারেক রহমান পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা চক্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। তাদের পরামর্শে ও প্ররোচনায় তিনি এই নতুন বিতর্কটি সৃষ্টির চেষ্টায় অবতীর্ণ হয়ে থাকলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। উদ্দেশ্য পূর্বাপর একই। বাংলাদেশে আবার ইতিহাস-বিকৃতি দ্বারা স্বাধীনতার যুদ্ধ ও তার নায়কের মর্যাদাহানি করা, দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করা ও দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত করা।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন এই হাস্যকর প্রলাপ নিয়ে আলোচনা করার কোনো দরকার আছে কি? কালুরঘাট বেতার-ট্রান্সমিশনে মাইক হাতে পেয়ে জিয়াউর রহমান নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান ঘোষণা করেছিলেন। তারপর এম আর সিদ্দিকীসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের ধমক খেয়ে বক্তব্য সংশোধন করে তিনি বলেন, মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে তিনি এই স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেছেন। ব্যস, এটুকুতেই তিনি দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হয়ে গেলেন?
রাষ্ট্রপতি তো কেবল ঘোষণা দিয়ে (তাও আবার নিজে) হওয়া যায় না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করতে হয়। জিয়াউর রহমান কি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন? কে তাঁকে শপথ গ্রহণ করিয়েছিলেন? এই শপথ গ্রহণ করা ছাড়াই তিনি স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি হয়ে গিয়েছিলেন। আর এই স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতির মন্ত্রিসভা কই? তিনি কি মন্ত্রিসভা ছাড়াই একা রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রী ছিলেন? সবচেয়ে বড় কথা, এই রাষ্ট্রপতি কী করে দুই দিন পরই মুজিবনগরে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রপতিত্বে গঠিত তাজউদ্দীন সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে একজন সাধারণ মেজর হিসেবে ফোর্স কমান্ডারের পদ নিয়ে যুদ্ধ করতে যান? মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করার দায়ে তাঁর কি কোর্ট মার্শাল হওয়ার ব্যবস্থা হয়নি? প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন কি তাঁকে রক্ষা করেননি? মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে অদক্ষতার জন্য তাঁর জেড ফোর্স কি ভেঙে দেওয়া হয়নি এবং তাঁকেও নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়নি?
তার পরও এত বড় মিথ্যাটি বারবার বলতে হবে যে জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি? বাংলাদেশে এই বিতর্কে জড়িত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ডেপুটি রেজিস্ট্রারও বিতর্কিত হয়েছেন। সুবিদ আলী ভূঁইয়াও বলেছেন, তিনি এই অসত্য কথাটি বলেননি। আমার প্রশ্ন, জাতীয় জীবনে যখন এত সমস্যা এবং তা নিরসনের জন্য জাতীয় ঐক্য দরকার, তখন বিএনপি একটার পর একটা অপ্রাসঙ্গিক বিতর্ক সৃষ্টি করে জাতীয় ঐক্য ধ্বংস, প্রতিষ্ঠিত সত্যগুলোর বিকৃতি ঘটানো ও জাতীয় রাজনীতি ঘোলা করার চেষ্টা চালাচ্ছে কী স্বার্থে অথবা কাদের স্বার্থে? এর পরও তারা জাতীয় ঐক্যের কথা মুখে আনে কিভাবে?
নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৫৭ সালের ৩ জুলাই। ইংরেজ-শাসনে বাঙালিরা এই দিবসটিকে পালন করা শুরু করেছিল এবং সিরাজউদ্দৌলাকে আখ্যা দিয়েছিল ‘বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব’। কিছু ইংরেজ ইতিহাসবিদ সিরাজউদ্দৌলাকে খাটো করার জন্য প্রচার শুরু করেছিলেন, ‘সিরাজকে হত্যা করে মীরজাফর বাংলার নবাব হন। তিনিই ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব।’ এই প্রচারণার জবাব দিতে গিয়ে বিখ্যাত বাঙালি ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় বলেছিলেন, ‘দুরাত্মাকে মহাত্মা বানানোর এই চেষ্টা কেন?’ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন—এই প্রচারণাটি সম্পর্কেও অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র এই কথাটি সর্বতোভাবে প্রযোজ্য।
লন্ডন, সোমবার, ২২ আগস্ট, ২০১৬

You Might Also Like