মোদি-সুষমার পররাষ্ট্রনীতি কেমন হতে পারে

এক জমকালো ও ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠানে ভারতের চতুর্দশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন নরেন্দ্র মোদি। এরপর ক্যাবিনেটের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে শপথ নেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত রমণী সুষমা স্বরাজ। তার আগে ছয় দশকের ইতিহাসে আরেকজন নারী ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, তার নাম হলো ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দিরার মতো প্রধানমন্ত্রীর ঔরসজাত না হলেও সুষমা এমন এক বিরল রাজনীতিবিদ, যিনি মাত্র ২৫ বছর বয়সে হরিয়ানার রাজ্য মন্ত্রিসভার শিক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যাবিনেট মন্ত্রী হন। এরপর একাধারে ৩০ বছর ধরে তিনি লোকসভা, রাজ্যসভা অথবা বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন চারটি ভিন্ন রাজ্য থেকে। রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্রী এবং আইন পেশার খ্যাতিমান এই ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন মেয়াদে বিভিন্ন অকংগ্রেসি সরকারের তথ্যমন্ত্রী, টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর এবার হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি একসময় মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন নয়াদিল্লির। সর্বশেষ ছিলেন লোকসভায় বিরোধী দলের নেতা। এবার বিজেপির বেশির ভাগ মন্ত্রীর আরএসএস ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলেও সুষমা স্বরাজ সেভাবে আরএসএসের সাথে যুক্ত ছিলেন না। যদিও তার বাবা ছিলেন আরএসএসের একজন খ্যাতিমান নেতা।

প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের আগেই নরেন্দ্র মোদির পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে, এ নিয়ে ছিল বিস্তর আলোচনা। তিনি নিজে অবশ্য এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট কিছু বলেননি। তবে শপথ অনুষ্ঠানে সার্ক নেতাদের আমন্ত্রণে বোঝা গেছে, তিনি যতই কম বলুন না কেন, পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে গভীর কিছু ভাবনা তার রয়েছে। দলের মধ্যে বরাবর প্রতিপক্ষ বলয়ে থাকলেও সুষমার মতো মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত নেতাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদান তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাই বহন করে। সুষমা স্বরাজ মোদি সরকারের আঞ্চলিক কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি ধারণা দিয়েছেন। বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে বলেই শপথ অনুষ্ঠানে সার্ক নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি।

ভারতের মতো একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো বিপ্লবোত্তর দেশের মতো রাতারাতি বদলে যাবে, এমনটি আশা করা যায় না। আবার কংগ্রেসের পররাষ্ট্রনীতিকে ধারণ করে পররাষ্ট্র সম্পর্কের বিন্যাস বিজেপি আমলে চলবে, এমনটি ভাবাও বাস্তবসম্মত নয়। ভারতের পররাষ্ট্র সম্পর্কে শত্রু-মিত্রের ঐতিহাসিক কিছু ভিত্তি ও কার্যকারণ রয়েছে, যা অতিক্রম করা কোনো সরকারের জন্য সহজ নয়। আবার একইভাবে গত তিন দশকে পররাষ্ট্র সম্পর্কে নানা বাঁক পরিবর্তনও ভারতে হয়েছে। এই বাঁক পরিবর্তনে পাশ্চাত্য থেকে রাশিয়া-নির্ভরতায় নতুনভাবে প্রবেশের বিষয়টি সোনিয়া-মনমোহন আমলেই ঘটেছে। সেটি আবারো পুরনো ধারায় ফিরতে পারে। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও অর্থনৈতিক কূটনীতি অনুসরণের যে কথা বিশ্লেষকেরা বলছেন, তাতে এ রকম একটি সম্ভাবনা নতুন সরকারের আমলে বাস্তবে রূপ নিতে পারে। যদিও দিল্লির পর্যবেক্ষক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বিশিষ্ট ফেলো সি রাজা মোহন ভারতের পররাষ্ট্র সম্পর্কের কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, নয়াদিল্লির পক্ষে নীতির ধারাবাহিকতা থেকে বের হয়ে বড় কোনো বিকল্প তৈরি করা কঠিন। আমেরিকান পররাষ্ট্র দফতরের কর্তারা মোদির িপররাষ্ট্রনীতিতে অভিন্ন স্বার্থে কাজ করা এবং বিশেষ কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়বে বলে আশা করলেও জেমস ট্রবের মতো পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, মোদির পররাষ্ট্রনীতি আমেরিকার পছন্দ নাও হতে পারে। পররাষ্ট্রনীতিতে কট্টর জাতীয়তাবোধের প্রভাব থাকার সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের আকাক্সার বিপরীত হতে পারে বলে তার ধারণা। আশাবাদের একটি বড় দিক হলো, অর্থনৈতিকভাবে যে বিকশিত কর্মসংস্থানময় ভারত মোদি গড়তে চান, তার জন্য ব্যাপক বিদেশী বিনিয়োগ এবং রফতানি বাজার প্রয়োজন। এই বিনিয়োগ বা রফতানি বাজারে চীনের বিকল্প কেবল জাপান ও পাশ্চাত্যেই রয়েছে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে মোদি জাপান, সিঙ্গাপুর ও চীন সফর করেছেন। তবে তার রাজ্যে প্রথম দুই দেশের বিনিয়োগই ছিল বেশি। রাশিয়া নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রের জোগান দিতে পারে, কিন্তু অর্থনীতি চাঙ্গা করতে তেমন কিছু করার ক্ষমতা মস্কোর নেই। আর কংগ্রেস জোটের শেষ ক’বছর রাশিয়ার দিকে বেশি ঝুঁকতে গিয়ে বিদেশী বিনিয়োগের গতি এবং অর্থনীতির বিকাশ একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়ে। কিছু কিছু অকংগ্রেসি রাজ্যের দুই অঙ্কের বিকাশ হার না থাকলে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটতে পারত।

এশিয়ায় ভারতের সাম্প্রতিক যে জটিল ক্ষমতার ভারসাম্যনীতি, তার প্রশংসা হয় না ইউরোপে। ক্রিমিয়াকে রাশিয়া নিজের অংশ করে নেয়ার ব্যাপারে ভারত আগে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও ভিয়েতনামের অদূরে দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত জলসীমার মধ্যে বেইজিং একটি তেল রিগ স্থাপনে যে ক’টি দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, ভারত তাদের মধ্যে অন্যতম। এতে পশ্চিমারা রাশিয়ার কর্মকাণ্ডে ভারতের প্রতিক্রিয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছে। এর আগে দীর্ঘ দিন ধরে এশিয়ায় চীনের প্রভাব সীমাবদ্ধ রাখার রাশিয়ান প্রচেষ্টার মূল কেন্দ্রে ছিল ভারত। এতেও ছিল তার ধারাবাহিকতা। কিন্তু রাশিয়া এখন চীনের সাথে গড়ে তুলছে কৌশলগত সম্পর্ক।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় ভারত ছিল একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ, যার সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব ছিল। সোভিয়েত রাশিয়া বেশির ভাগ সামরিক সরঞ্জাম ও কৌশলগত প্রযুক্তি ভারতকে সরবরাহ করত। এশীয় দেশগুলোর মধ্যে ভারত ছাড়া আর কারো সাথে মস্কোর এ ধরনের নিবিড় ও উষ্ণ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। কমিউনিস্ট-বিরোধী পাকিস্তানের সাথে আমেরিকান মৈত্রী এবং চীনের সাথে ভারতের বিরোধ দিল্লিকে মস্কোর সাথে এ ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠাতে উৎসাহিত করেছিল। এখনো সেই ধারাই রয়েছে, যদিও এশিয়ার সম্মিলিত নিরাপত্তা এবং পাশ্চাত্য ও এশিয়ার সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠাতে রুশ প্রস্তাবে সমর্থন জানানোর ক্ষেত্রে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছে ভারত।

ভারতের ১৯৯০ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং এশিয়ার একটি প্রধান শক্তি হিসেবে ভারতের সাথে উষ্ণ সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের সমন্বিত প্রচেষ্টা রাশিয়ার সাথে কৌশলগত সম্পর্ককে কিছুটা গৌণ করে ফেলে। একই সাথে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক ভারতের আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশে চলে আসে। দিল্লি চীনের বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষার উপায় হিসেবে দেখেছিল রাশিয়াকে। আর এখন মূলত ভারতের কাছে রাশিয়ার প্রাসঙ্গিকতা হলো, এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন অবয়ব নেয়ার ক্ষেত্রে মস্কোর সম্ভাব্য ভূমিকা। রাশিয়ার সাথে নতুন করে যে জোরালো সম্পর্কের পথে দিল্লি এগিয়ে যায়, তার পেছনে একটি কৌশলগত যুক্তি হলো, এশিয়ার ব্যাপারে আমেরিকান-নীতির বিদ্যমান অনিশ্চয়তা। এর পাশাপাশি রয়েছে, দিল্লির চোখে পাকিস্তানের সাথে আমেরিকার অনাকাক্সিত সম্পৃক্ততা। একই সাথে উদীয়মান চীন ও দুর্বল হতে থাকা আমেরিকার সাথে রাজনৈতিকভাবে মানিয়ে নেয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় এসেছে। আরেকটি বিষয় হলো, মধ্য এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত স্বার্থ ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়ার বাস্তবতায় মধ্য এশীয় অঞ্চলে রাশিয়ার সাথে ভারতের অংশীদারিত্ব বেশখানিকটা জটিল হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে তাজিকিস্তানে সামরিক উপস্থিতির তাৎপর্যের বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। রাশিয়া সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় ভারতকে পূর্ণ সদস্যপদ দেয়ার পক্ষে। কিন্তু চীন এটা চায় না, বরং পাকিস্তানকে নিয়ে আসতে চায় বেইজিং। রাশিয়ার সাথে একই বন্ধনে জড়ালে মধ্য এশিয়ার সরকারগুলোর সাথে মস্কোর দূরত্বের ফলে যে সীমাবদ্ধতা, তাতে ভারত আটকে যাবে। অথচ এখানে রয়েছে দিল্লির বিরাট স্বার্থ। কিন্তু সাম্প্রতিক ধারা অনুযায়ী মধ্য এশিয়ার মতো মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় ভারত রাশিয়ার একই বলয়ে অবস্থান করে আসছে।

উপসাগরীয় দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যে দিল্লির স্বার্থ অনেক বড়। এই অঞ্চলের সাথে দিল্লির সংশ্লিষ্টতা বেশ গভীরে প্রোথিত। এ সম্পর্কে সংস্কৃতিগত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক গতিময়তার নানা বিষয় রয়েছে। ভারত একই সাথে ইরান, সৌদি আরব ও ইসরাইলের সাথে নিজের সম্পৃক্ততা সৃষ্টি করেছে। এই অঞ্চলে আমেরিকা বা রাশিয়ার পেছনে ছোটার পরিবর্তে দিল্লির স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি কৌশল উদ্ভাবনই ছিল এর পেছনে মূল লক্ষ্য। তবে পূর্ব এশিয়ায় ভারত ও রাশিয়ার স্বার্থ সমান্তরালে এগিয়েছে। এ অঞ্চলে উভয় দেশের স্বার্থের মধ্যে সরাসরি কোনো সঙ্ঘাত নেই। এখানে স্বাধীন খেলোয়াড় হিসেবে ভিয়েতনামের উত্থান ঘটার মতো রাশিয়ার সাথে সামরিক সহযোগিতায় ভারতের স্বার্থও সুরক্ষিত থাকে। চীন মনে করে, ভিয়েতনামের নৌসীমায় ভারতের তেল অনুসন্ধানের আগ্রহ রাশিয়ার সাথে হ্যানয়ের গভীর নৌ-সহযোগিতার একটি অংশ। উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় ভারত তার স্বার্থেই অধিক সক্রিয় দেখতে চায় রাশিয়াকে। জাপানের সাথে রাশিয়ার দীর্ঘকালের অপেক্ষমাণ সমঝোতা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহী নয়াদিল্লি। রাশিয়া থেকে নিরাপত্তা আর জাপান থেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতাপ্রাপ্তির সুযোগ এটি সৃষ্টি করবে বলে ধারণা রয়েছে দিল্লির। যদিও পূর্ব এশিয়ায় ইউরোপ-আমেরিকাকে প্রতিহত করতে চীনের সাথে একসাথে কাজ করা হলো রাশিয়ার কৌশল।

শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার সাথে ভারতের অংশীদারিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হতে পারে পাকিস্তান ও চীনের গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিবিধির ওপর নির্ভর করে। স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে মস্কো ও ইসলামাবাদের সম্ভাব্য সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণের ব্যাপারে দিল্লির উদ্বেগ ছিল। দিল্লি আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে গিয়ে পাকিস্তান রাশিয়ার কাছাকাছি চলে যাক, তা চায়নি। আর পাকিস্তানের কাছে অস্ত্র বিক্রি থেকে মস্কোকে বিরত রাখতে পেরেছে ভারত। এক সময় রুশ প্রেসিডেন্টের ইসলামাবাদ সফরে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। দিল্লির চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত-পরবর্তী সময়ে কোনো রাশিয়ান প্রেসিডেন্টের পাকিস্তান সফরের ঘটনা ঘটেনি। ভারতের সাথে বিশেষ ও গভীর সম্পর্ক রক্ষার পাশাপাশি রাশিয়া চীনের সাথেও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাড়িয়েছে। তবে উভয়ের একের সাথে অন্যের সহযোগিতা আমেরিকার প্রভাবকে সীমিত রাখার ক্ষেত্রে বেশি মনোযোগী বলে মনে হয়েছে দিল্লির কাছে।

ভারত বিশ্বাস করতে চায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও রাশিয়া মধ্য ইউরোপে এমন এক স্থিতিশীল ভারসাম্য সৃষ্টি করবে; যা এই তিন পক্ষ এশিয়া ও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় উদীয়মান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারে। এশিয়ার অনেক অঞ্চলে এই উদ্বেগের সাথে অংশীদার হয় বিশ্বশক্তিগুলোর কৌশলগত নিষ্ক্রিয়তা, যা ভারতকে তাদের অভ্যন্তরীণ স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিতে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেয়।

দিল্লির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পূর্ব এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ নিয়ে ওয়াশিংটন মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছে। আর এশিয়ায় ভারসাম্য প্রতিস্থাপনের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়নি আমেরিকা। অন্য দিকে এশীয় অন্যান্য দেশের মতো দিল্লিও এশিয়ায় রাশিয়ার অঙ্গীকারের গভীরতা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনার ব্যাপারে আমেরিকার পাশাপাশি রাশিয়াকেও নিয়ে আসতে চায় আসিয়ান জোট। ফলে এই অঞ্চলের অনেকেই আসিয়ান নিরাপত্তা সংলাপে রাশিয়ার অংশগ্রহণে অনাগ্রহে হতাশ। রাশিয়া ইউরোপে নিজেকে অধিক সক্রিয় রাখতে চায় আর ঘুরে দাঁড়াতে চায় আমেরিকা ও ইউরোপের বিরুদ্ধে। অন্য দিকে বাস্তবতা হলো, ইউরোপ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার ব্যাপারে কথা বলতে কখনো নিবৃত্ত হয়নি, কিন্তু তারা নিজেদের আঙিনায় যে নিরাপত্তা সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কিছু করতে পারছে না। ইউরোপ নিজেরা যা করতে বলে, তা কাজে পরিণত করার ক্ষমতা তাদের আছে কি নাÑ এ নিয়ে সংশয়ে পড়েছে দিল্লি। আর রাশিয়ার সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে আঞ্চলিক লক্ষ্য অর্জিত হবে, সেই ভরসাও করতে পারছে না দিল্লি। এই দোদুল্যমান বাস্তবতা রয়েছে মোদি-সুষমার সামনে।

দিল্লির পর্যবেক্ষণ অনুসারে, ইউরেশীয় ভূখণ্ডের পশ্চিম অংশে পারস্পরিক সহাবস্থান খুঁজে পেতে ব্যর্থতা এই মহাদেশের পূর্বাংশে আমেরিকা, ইউরোপ ও রাশিয়াকে দুর্বল করবে। এ তিনের জন্য চীনের সাথে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব গুরুত্ব পাচ্ছে। আর তাদের মধ্যে সঙ্ঘাত রাশিয়া আর পশ্চিমের বিপরীতে বেইজিংয়ের সুবিধাকে বাড়াবে। এটি চীনের উদীয়মান শক্তির সাথে এশিয়ার মানিয়ে চলার সমস্যাকেও আরো বাড়াবে। দিল্লির চোখে এশিয়ার নিরাপত্তায় কার্যকর ভূমিকা পালনে রাশিয়ার অনাগ্রহই মূল সমস্যা। ইউরোপে রাশিয়া এবং পশ্চিমের দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাতে চীনের অনুকূলে আঞ্চলিক ক্ষমতা প্রভাবিত হলে, তা এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কটকে আরো গভীর করবে।

অতীতের মতো ভারত তার চার পাশে চীনের ক্ষমতাকে সীমিত রাখতে ক্রমবর্ধমান রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। বিগত দশকের মাঝামাঝি এ রকম একটি আশাবাদ সৃষ্টি হয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিবিড় কৌশলগত অংশীদারিত্ব চীনকে ভারসাম্যমূলক অবস্থানে নিতে সহায়তা করবে। আমেরিকান নীতি-কৌশল নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং জোটনিরপেক্ষতার অর্থ ও এর আওতার ব্যাপারে ভারতের বহুবর্ষব্যাপী মতাদর্শিক বিভ্রান্তির ফলে এটি বেশি দূর এগোয়নি। ভারতসহ এশিয়ার প্রধান শক্তিগুলোর ক্ষমতার সম্ভাব্য নববিন্যাস আর পাশ্চাত্য ও রাশিয়ানদের ইউরোপ নিয়ে ব্যস্ত থাকার বাস্তবতায় এই অঞ্চলের দেশগুলোকে নিজস্বভাবে সমাধান খোঁজার পথে এগোনোর ভাবনা থাকতে পারে মোদির সামনে।

চীনের দাপটশালী আঞ্চলিক নীতি এবং আমেরিকার কৌশলগত বিচ্ছিন্নতার কারণে আসিয়ানের সহযোগিতামূলক নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে দিল্লির বিশ্লেষকদের ধারণা। তারা মনে করেন, অনেক ছোট এশিয়ান দেশের পক্ষে চীনা আধিপত্যকে মেনে নেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নাও থাকতে পারে। বড় দেশগুলোর মধ্যে যাদের সাথে চীনের ভূখণ্ডগত বিরোধ রয়েছে, তাদের জোরদার আঞ্চলিক কোয়ালিশন গড়ে তুলতে হবে। রাশিয়ার ইউরোপ নিয়ে ব্যস্ত থাকা অথবা আমেরিকার স্পষ্ট ইউরেশীয় কৌশল না থাকলেও এ ধরনের কৌশল বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান সৃষ্টি করতে পারে। শুরুতে সার্কের মধ্যে মোদির আস্থার কৌশল এর একটি অংশ হতে পারে। এই কৌশলে বিশেষ দেশের বিশেষ দলের সাথে সম্পর্কের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে ঝুঁকিতে না ফেলে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে পারে দিল্লির নতুন সরকার। মোদির ভাবনা আর কংগেসের ভাবনার মৌলিক পার্থক্য হলো, বিজেপি নেতা যেখানে বিশ্ব নেতৃত্বের জন্য ভারতকে শক্তিশালী করতে আঞ্চলিক সঙ্কটের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসতে চান, সেখানে কংগ্রেস শক্তিমত্তার পরিচয় দিতে চেয়েছে আঞ্চলিক প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। কংগ্রেস নেতৃত্ব বাংলাদেশে আগ্রাসী নীতি নিয়ে সাময়িক সাফল্যকে বড় করে দেখে প্রবোধ পেতে চেয়েছে, বিজেপির সামনে এই নীতির ব্যাকফায়ার শ্রীলঙ্কা ও নেপালে যেভাবে ঘটেছে সেই বাস্তবতাও রয়েছে।

তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নরেন্দ্র-সুষমার পররাষ্ট্রনীতি কতটা নতুন বিন্যাস পাবে, সেটি এখনো হিসাব-নিকাশের মধ্যে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মূল নির্ণায়ক হতে পারে ভারত রুশনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ অব্যাহত রাখবে কি না। এটি করতে গিয়ে পাশ্চাত্যের সাথে আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোতে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, তা অব্যাহত রাখবে কি না, যার অর্থনৈতিক ঝুঁকি এ মুহূর্তে অনেক বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। সম্ভবত মোদির নতুন সরকার এ ক্ষেত্রে কংগ্রেসের প্রান্তিকতা ছেড়ে মাঝামাঝি একটি পথ নিতে পারে। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়কে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার যে প্রচেষ্টা কংগ্রেস আমলের পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্য ছিল, সেটি অব্যাহত থাকবে কি না। মোদির পররাষ্ট্রনীতি প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে তার দেশের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে পুরোমাত্রায় সক্রিয় থাকবে, কিন্তু রাডারে রেখে প্রতিবেশী দেশ নিয়ন্ত্রণের কংগ্রেস জোটের প্রচেষ্টা মোদি সরকার না নেয়ার আভাসই জোরালো হচ্ছে। এর প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে বিশেষভাবে।

You Might Also Like